বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬

বাতাসে ইয়াবার গন্ধ, মানবপাচারের হাতছানি ছাপিয়ে যুবলীগ নেতার চাষাবাদ!

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ১৫, ২০২০, ৮:৪৬ অপরাহ্ণ

পিকলু দত্ত, টেকনাফ : টেকনাফের আকাশে ইয়াবার গন্ধ। হাত বাড়ালেই মরণনেশা ইয়াবা। শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক – নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবার হাতেই ইয়াবার ছড়াছড়ি। রাতারাতি বড় লোক হওয়ার অসম এক বাসনা, প্রতিযোগিতায় ঘরে ঘরে ঘটেছে ইয়াবার বিস্তার, বিকিকিনি। সাথে সাগরপথে মানবপাচার। এমনই যখন টেকনাফের সার্বিক চিত্র, তখনই স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা যুক্ত হলেন কৃষিকাজে। করছেন পানবরজ ও মরিচ চাষ।

যুবলীগ নেতা মানেই দখলদারিত্ব, গাছ-বাশ, বালু থেকে টেন্ডারবাজির উন্মুক্ত দরজা। সেই দরজায় প্রবেশ করে কী শহর, কী গ্রাম- সর্বত্রই যুবলীগ নেতাদের পোয়াবারো অবস্থা। যুবলীগ নেতার দাপট দেখিয়ে সে পথেও যাননি, স্রোতে গা ভাসাননি যুবকটি। এজন্য তাকে বলা হচ্ছে নতুন দিনের আইডল, অনুকরণীয় চরিত্র।

আলোচিত যুবলীগ নেতার নাম আজিজুল হক। টেকনাফ সদর ইউনিয়ন যুবলীগের বর্তমান সহ সভাপতি তিনি। বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই নেমে পড়েছেন মরিচ ক্ষেত ও পান উৎপাদনে। টেকনাফ সদর ইউপি ভবনের পার্শ্ববর্তী নিজস্ব খালি জমিতে কোনোরকম জড়তা না রেখে নেমে পড়েছেন মরিচ উৎপাদনে। মরিচের সাফল্য ধরে হাত দিয়েছেন পানের বরজে। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে মরিচ গাছ, বড় হচ্ছে পানের সাইজ। যার লাল-সবুজাভ বেড়ে উঠা দৃষ্টি কাড়ছে এলাকাবাসীর। এই কাজে তাকে সবরকমের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিউল আলম ও সদর ইউপি সচিব সরওয়ার কামাল। সমর্থন দিচ্ছেন এলাকার ময়মুরুব্বিরাও।

তার বক্তব্য – একটাই জীবন। সংক্ষিপ্ত সময়। জীবনটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। যেখানে থাকবে না কোনো অন্যায়, অনৈতিকতার আশ্রয়। রাতারাতি বড় লোক হওয়ার বাসনায় ইয়াবা ব্যবসায় যুক্ত হতে চাই না। ইয়াবা-উপার্জিত এক কোটি টাকার চেয়ে কষ্টার্জিত এক লাখ টাকার শক্তি অনেক বেশি। তাই অবারিত সুযোগ, হাতছানি থাকা সত্ত্বেও আমি বিপথে যাইনি। আমার লক্ষ্য-টেকনাফের দুর্নাম ঘুচিয়ে নতুন প্রজন্মকে সুস্থ, সুন্দর পথে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলা।

আজিজুল হক বলেন, বর্তমানে টেকনাফের কোথাও গিয়ে বসার মতো জায়গা নেই। যে দিকে যাই-একটা আতংকের মধ্যে থাকতে হয়। জীবনে কখনও মাদক, ইয়াবার সাথে জড়িত ছিলাম না, ভবিষ্যতেও থাকতে চাই না। একটা সময় টেকনাফের মানুষ পানের বরজ, মরিচ, তরমুজ, শসা উৎপাদন ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। এক দশক আগে ইয়াবা ও মানবপাচার শুরু হওয়ার পর টেকনাফ তার সেই ঐতিহ্য হারিয়েছে।

মাটের ফসল ফলানোর চাইতে লাভজনক ইয়াবা ও মানবপাচারে জড়িত হয়ে দিনমজুরের পারিশ্রমিকের চাইতে কয়েকশগুণ বেশি আয় ও লাভজনক হওয়ায় কৃষকের সঙ্কট তৈরি হয় টেকনাফে। কৃষকের অভাবে আমাদের পৈত্রিক অনেক ফসলি জমি অনাবাদী হয়ে পড়ে, একই অবস্থা এলাকার অন্যান্য কৃষি জমিতেও। এ অবস্থায় আগ-পিছ না ভেবে নিজেদের জমিতে নিজেই ক্ষেত-খামারে নেমে পড়েছি কোনো রকম জড়তা, লজ্জা না রেখে। – বলেন আজিজুল হক।

এদিকে, মরিচ ক্ষেতে আশাতীত সফলতার পর আজিজুল এবার শুরু করলেন নিজস্ব জমিতে ১০ হাজার গাছের পান বরজ। সেই পানপাতা বড় হচ্ছে ক্রমশ। পানের বাড়বাড়ন্ত দেখে আনন্দ উদ্বেলিত আজিজ। তাই নিজের ফেইসবুক ওয়ালে পানক্ষেতের ছবি দিয়ে তিনি লিখেন- আলহামদুলিল্লাহ্ নিজের হাতে গড়া পানের বরজ।

আজিজুলের এই কর্ম এখন টেকনাফ সদর এলাকার মানুষের মুখে মুখে। যুবসমাজের প্রিয় মুখ হওয়ায় অনেক যুবক ইতিমধ্যে তার অনুপ্রেরণায় কৃষিকাজে নিয়োজিত হচ্ছে। টেকনাফের দুর্ণাম ঘুচিয়ে পুরোনো ঐতিহ্য পান-সুপারি, তরমুজ ও শসা উৎপাদনের পাশাপাশি সাগরে জেলেদের মাছধরার উৎসবে টেকনাফ ফিরে পাবে তারা হারানো গৌরব, চিরচেনা ঐতিহ্য-এটাই হোক যুবসমাজের পণ- আশা আজিজুল হকের।