শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬

চবির পাহাড়ি প্রকৃতির ওপর নজিরবিহীন অত্যাচার

১১ দিনে ৫ বার আগুন দেয়া হল পাহাড়ে

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ২২, ২০২০, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ


রাতের আঁধারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ে আগুন দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা।

ইফতেখার সৈকত, চবি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসের আশপাশে নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটা হচ্ছে। এসব কাজ নির্বিঘ্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের পাহাড়ে দেয়া হচ্ছে একের পর এক আগুন। গত ১১ দিনে ৫ বার ক্যাম্পাসের পাহাড়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।

পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। পাহাড় কাটার দায়ে গত ৯ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে জরিমানাও করেছে। এভাবেই চবির ২১শ’ একরের পাহাড়ি প্রকৃতির ওপর নজিরবিহীন অত্যাচার হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার জীববৈচিত্র্য। বিলুপ্তির পথে চবির পাহাড়ে থাকা বিভিন্ন জীবজন্তু ও বন্যপ্রাণী।

গত ১১ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু হলের পেছনের পাহাড়ে প্রথম আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর দু’দিন পর ১৩ মার্চ দিনের একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদের মধ্যবর্তী পাহাড়ে ফের আগুন দেখা যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগের দিনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে পরদিন ১৪ মার্চ ফের আগুন দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ে। এরপর ১৭ মার্চ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ফের বঙ্গবন্ধু হলের পাশে একটি পাহাড়ে আগুন দেয়া হয়। এ সময় পাহাড়ে ধাওয়া দিয়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় জড়িত ৪ জনকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি। তারা সকলেই পাবনার বাসিন্দা। পরে আটকৃতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর থানায় হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে গত ১৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করলেও থেমে নেই পাহাড়ে আগুন লাগার ঘটনা। আজ শনিবার (২১ মার্চ) ফের বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ সংলগ্ন একটি পাহাড় ও ঝর্ণার পাশের আরেকটি পাহাড়ে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই নিয়ে গত ১১ দিনে পাঁচবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।

একের পর এক পাহাড়ে লাগায় পুড়েছে পাহাড়ি গাছ, লতা-গুল্ম। আর বনজঙ্গলের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হওয়ায় বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল হারানোরও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া বড় গাছগুলোও আগুনের তাপে আধপোড়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, পাহাড় কাটা, বৃক্ষনিধন, আগুন দেয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন নষ্ট করা হচ্ছে তেমনি হুমকির মুখে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য।

কিসের মোহে পাহাড়ে ছোবল?

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পাহাড়ে দফায় দফায় আগুন লাগার পেছনে স্থানীয়দেরকে দায়ি করা হচ্ছে। প্রত্যেক বছর স্থানীয়রা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাহাড়গুলোতে আগুন দিয়ে ছোট ছোট বন-জঙ্গল পুড়িয়ে সেখানে চাষ করে আসছিলেন। বছরের এই সময়টা আসলেই আগুন লাগিয়ে পাহাড় দখলের চেষ্টায় মেতে উঠে স্থানীয় অসাধু কিছু লোক।

এভাবে আগুন লাগানোকে অভিনব কায়দায় গাছ কাটার উপায়ও বলছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ে আগুন দেয়ার ফলে নিচের ছোট গাছগুলো পুড়ে যায়। কিন্তু বড় গাছ এ রকম আগুনে পুড়ে না। তবে আগুনের তাপে গাছের পাতা পুড়ে যায়। পাতা ঝরে গাছ মরে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন কাঠুরিয়া কিংবা বনখেকোদের জন্য গাছগুলো কাটতে সুবিধা হয়। তাই তারা এভাবে পাহাড়ে আগুন দিচ্ছে।

হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

একটা সময় ছিলো যখন ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে জীবজন্তু ঘুরে বেড়াতো। একটু রাত হলেই নিরব ক্যাম্পাসে অবাধে ঘুরে বেড়াতো তারা। শীত হলেই আসতো অতিথি পাখি। এই ক্যাম্পাসের মায়া হরিণ শিক্ষার্থীদের বাড়তি ভালোবাসার জায়গা। তাছাড়া ক্যাম্পাসের গহীন জঙ্গলে ছিলো নানান প্রজাতির সাপ। এখনও ক্যাম্পাসে এ ধরনের বণ্যপ্রাণী রয়েছে। তবে তা আগের মতো নয়। নির্বিচারে পাহাড় ও গাছ কাটার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতির উপর।

পাহাড়ে আগুনের ফলে বণ্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে অভয়ারণ্য। যে স্থানে বন্যপ্রাণীরা নিরাপদে চষে বেড়াতো সেখানে আগুন লাগা কিংবা জনমানুষের আনাঘোনায় অনিরাপদ হয়ে উঠেছে প্রাণীদের জন্য। তাইতো হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর কিছু প্রজাতি। গবেষকদের মতে, ৭০ এর দশকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বানর, চিতা বাঘ, গোরখুদিনী, বন্য কুকুর, উল্লুক, হনুমান ছিল। তবে জনবসতি বাড়ার কারণে এসব প্রাণী ক্যাম্পাস থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। এছাড়া হরিণের সংখ্যাও কমেছে। বিপন্ন হয়েছে তিন প্রজাতির বানর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এস এম মনিরুল হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, আগুন দেয়ার ঘটনায় আমরা চারজনকে ধরে থানায় হস্তান্তর করেছি। আমরা এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছি।

বনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কারা জড়িত এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে যাছাই-বাছাই করছি।

নির্বিচারে পাহাড়ে আগুন দেয়া বন্ধে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে- জানতে চাইলে প্রক্টর এস এম মনিরুল হাসান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমরা পাহাড়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারি না। এসব বন্ধ করতে হলে সকলকে সতর্ক হতে হবে। যেসব জায়গায় আগুন লাগার শঙ্কা রয়েছে সেখানে নিরাপত্তা কর্মী রাখার কথাও জানান তিনি।