বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা নেই, হাত গুটিয়ে চবি

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ৩০, ২০২০, ৫:১৪ অপরাহ্ণ


ইফতেখার সৈকত, চবি : দেশে যে করোনাভাইরাস এসেছে, তার স্বরূপ কী? প্রকৃতি কী? উৎপত্তিস্থল কোথায়? কোন ধরনের প্রোটিন বা বিষক্রিয়া তারা তৈরি করে? কী কী জিন তার মধ্যে আছে?- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকলে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি বের করা সহজ হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমন অবস্থায় করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। এখানে সমৃদ্ধ ল্যাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জিনবিজ্ঞানী, জীবপ্রযুক্তিবিদ, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট। তবুও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হাত গুটিয়ে বসে আছে। গবেষণা নিয়ে জানতে চাওয়ায় একজন শিক্ষক উল্টো উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট তিনজন গবেষক ও শিক্ষক আদনান মান্নান, মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক, এ এম এ এম জুনায়েদ ছিদ্দিকীর একটি লেখা সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে।

এতে তারা উল্লেখ করেন, “এখনই কোভিড রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণা কার্যক্রমকে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশ তাদের রোগীর নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ফেলেছে। যার ফলে জানা যাচ্ছে কী ধরনের জিন সেই দেশে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসে আছে, এই জিনগুলো আর কোন ভাইরাসে আছে, অতীতে এ রকম জিন বহনকারী অণুজীবের বিরুদ্ধে কেমন ওষুধ কার্যকর হয়েছে, কোন কোন দেশে এ রকম জিন বহনকারী একই প্রকারের করোনাভাইরাস আছে। এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যাবে ভাইরাসটির তীব্রতা, আমাদের দেশে তা কোন পর্যায়ে যাবে, কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে আমাদের আক্রান্তদের দেহে পাওয়া ভাইরাসের শারীরবৃত্তীয় মিল আছে। চিকিৎসকদের তা অবহিত করতে হবে। তাহলে নির্ণয় করা যাবে প্রতিরোধের বিভিন্ন পর্যায়। এই তথ্যগুলোই চীনের সরকারকে সাহায্য করেছে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে।”

এদিকে করোনাভাইরাসের কার্যকর ভ্যাকসিন অথবা ওষুধ তৈরি নিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে গবেষণা। ইতিমধ্যে গবেষকরা ভাইরাসটির নকশা, উৎপত্তির উৎস, সংক্রমণ ও প্রতিরোধের উপায় বের করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই নিয়ে তৎপর হলেও বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ে গবেষণা করছেন বলে খবর পাওয়া যায় নি। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষকদেরও কোন কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। চবির গবেষণা খাতে ৪ কোটিরও অধিক পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত এই বাজেট যদি দেশের দুর্যোগকালীন সময়ে কোন ভূমিকা না রাখে তাহলে এত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু সেসব নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

গত ১৬ মার্চ সরকার দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়। সেদিন চবির জরুরি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তক্রমে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ নিয়ে প্রশাসনের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সময় মেডিকেল সেন্টার ও করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণাকারীরা ছুটির আওতামুক্ত থাকবেন। এমন বক্তব্যে করোনাভাইরাস নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণা করবেন বা কোন কার্যকর ভূমিকা পালনের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে তার কিছুই হচ্ছে না। গবেষক-শিক্ষকরা পার করছেন অবসর সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ অনুষদগুলোর মতো বন্ধ হয়ে আছে গবেষণাগারও। যদিও কিছু হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়েছিল রসায়ন বিভাগ কর্তৃপক্ষ, এতেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে তারা।

করোনাভাইরাস নিয়ে চবিতে কোন গবেষণা না হওয়ার পেছনে সময়ের অভাব ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধকে দায়ী করে রসায়ন বিভাগের সভাপতি ড. শাহানারা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো সুযোগই আমরা পাইনি। করোনার বিষয়টি শুরু হয়েছে ৭ মার্চ থেকে এরপরে হঠাৎ করে বলা হলো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ দিলেও যারা গবেষণার কাজে নিয়োজিত থাকবেন তারা ছুটির আওতামুক্ত থাকবেন, বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি বলেন, ছুটির নির্দেশনার পর তাড়াহুড়ো করে আমাদের কাছে আবার চিঠি এসে গেলো যে আমরা কিছুই করতে পারবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ কি করে করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো ঢুকতেই দিচ্ছে না। এখনতো সম্পূর্ণ লকডাউন। গবেষণাগারসহ সবকিছু আমরা সিলগালা করে দিয়েছি।

করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা সংক্রান্ত কোন পরিকল্পনা ছিলো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো শুরুই করতে পারিনি। আমরা ভেবেছি যে আমরা কাজকর্ম করবো। আমাদের একজন গবেষক ছিলেন। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সঙ্গে যৌথ উদ্যেগে আমরা কাজ করার চিন্তা-ভাবনা করেছিলাম। সেটার তো সুযোগ হয়নি।

চবির রসায়ন বিভাগের সভাপতি ড. শাহানারা বেগম বলেন, আমাদের দেশে করোনা নিয়ে প্রথমে কোন আওয়াজই উঠেনি। সরকার তো বলছেই না যে এখানে কোন করোনা আছে। হঠাৎ করে যখন চবির আব্দুর রব হলে একজন বিদেশ ফেরত পাওয়া গেলো তখন বিশ্ববিদ্যালয় নড়ে উঠলো। এরপরে রাষ্ট্রও নড়ে উঠলো। তারপর হঠাৎ করে আমাদের কাছে চিঠি আসলো। আমাদের কতগুলো অনুষ্ঠান না করার বিষয়েও নির্দেশনা আসে। একেবারেই কিছু করা যাবে না।

ড. শাহানারা এভাবে খোঁড়া যুক্তি দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে লকডাউন কিংবা গবেষকদের আসতে না দেয়া, সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বরং করোনা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে ও ২৯ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসসমূহ খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়টি তুলে ধরা হলে ড. শাহানারা বেগম উত্তেজিত হয়ে বলেন, তুমি এত কথা বলতেছ কেন? তুমি উপাচার্যকে জিজ্ঞেস করো। এতো পেঁচাচ্ছো কেন?

এদিকে এখনও পর্যন্ত করোনাভাইরাস নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন গবেষণা না হলেও ভবিষ্যতে হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসিম হাসান। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, বিজ্ঞান অনুষদের কোন বিভাগে করোনা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে না। আর কোথাও হচ্ছে কি না তা আমার জানা নেই৷

করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কিছু করা উচিত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস একদম যে নতুন কিছু তা নয়। ২০০২ সালে এটি প্রথম চিহ্নিত হয়। করোনা নিয়ে কিছু গবেষণা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এটি নিয়ে কাজ করা উচিত। আর তার সুযোগও আছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ায় গবেষণাগারগুলো বন্ধ। এছাড়া এখন গবেষণা করার মতো জনবলেরও সংকট রয়েছে। ফার্মেসি বিভাগ, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগসহ আরেকটি বিভাগ গবেষণার কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় লোকবলের অভাবে এখন তা হচ্ছে না। তবে এই তিন বিভাগ ৪ এপ্রিলের পরে অফিসিয়াল অনুমতি নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করবে।