বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

চিকিৎসা-অবহেলা, পুলিশ-ভীতির মাঝেই অনন্য মানবিক গল্প!

প্রকাশিতঃ রবিবার, এপ্রিল ৫, ২০২০, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম : কালামিয়া বাজারের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের পায়ুপথে ফোড়ার মতো দেখা দেয় কয়েকদিন আগে। শনিবার সকাল থেকেই ফোড়াটি অগ্নিশর্মা হয়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিচ্ছিল। যন্ত্রণায় কাতর জাহাঙ্গীর বুঝে উঠতে পারছিলেন না দেশের এই দুর্যোগ মুহূর্তে কী করবেন, কোথায় যাবেন?

একদিকে চিকিৎসকদের চিকিৎসা দিতে অনীহা, অন্যদিকে ঘর থেকে বের হলেই সেনাবাহিনীর কান ধরে উঠবস করানোর ভয়। পরিবহন-সঙ্কট, করোনা-ঝুঁকি তো আছেই।

এর মধ্যেই টেলিমেডিসিন সেবার জন্য বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সরবরাহ করা চিকিৎসকদের মোবাইল নম্বর ধরে জাহাঙ্গীর ফোন দিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. নুর হোসেন ভূঁইয়া শাহীনের কাছে। ততক্ষণে শাহীনের রোগী দেখা প্রায় শেষ, তিনি বের হতে চাচ্ছিলেন। রোগীর আকুতিতে ডা. শাহীন ৭টা পর্যন্ত চেম্বারে থাকতে রাজি হলেন। যখন এই কথোপকথন হচ্ছিল তখন ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা ৬টার ঘর পার হয়ে গেছে। রোগীর নিজস্ব কোনো যানবাহন নেই, নেই গণপরিবহন।

তাছাড়া শনিবার সকাল থেকে সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজন ঘর থেকে বের হলেই কান ধরে উঠবস করানোসহ নানা শাস্তি প্রদানের কথা কানে এসেছে জাহাঙ্গীরের। চিকিৎসক-অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলেও ঘর থেকে বের হয়ে চেম্বার পর্যন্ত যাওয়ার সাহস করছিলেন না তিনি। খুঁজে পাচ্ছেন না কোনো উপায়ও।

তখনই পুলিশের সহযোগিতায় হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কয়েকদিনের গল্পগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্ত্রী পারভীন পরামর্শ দিলেন থানায় ফোন করে বিষয়টি জানাতে। স্ত্রীর ধারণা, এক্ষেত্রে পুলিশ হয়তো এগিয়ে আসতে পারে।

আর বিলম্ব না করে স্ত্রীর কথামতো বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেজাম উদ্দীনকে ফোন দেন ওই রোগী। বিষয়টি উত্থাপন করতেই ওসি আপনি বাসায় থাকুন বলেই ফোন রাখলেন। এরপর রাজপথ হাঁকিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে ৩ পুলিশ সদস্য গাড়ি নিয়ে জাহাঙ্গীরের বাড়ির সামনে হাজির।

ছোটকাল থেকেই পুলিশ-ভীতির মানুষ জাহাঙ্গীরের বাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি, পুলিশের বাঁশি। যে গাড়িতে করে পুলিশ মানুষকে তুলে নিয়ে যায়, সেই গাড়িই যত্নআত্তি করে জাহাঙ্গীরকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, সেই পুলিশই এই মানবিক সঙ্কটে চিকিৎসা পেতে সহযোগিতা করবে – বিষয়টিই বার বার ফিল্মী মনে হচ্ছিল জাহাঙ্গীরের।

সকল ভীতি উৎকণ্ঠা এবং অ্যাডভেঞ্চার সঙ্গী করে পুলিশের গাড়ি যখন মেডিকেল সেন্টারে পৌঁছে তখন ৭টার কাছাকাছি। চেম্বারে ঢুকতেই ডা. নূর হোসেন ভূঁইয়া বললেন, ‘আসুন আসুন, আপনার জন্যই অপেক্ষা।’

এরপর খুব যত্ন করে, সম্মানের সাথে জাহাঙ্গীরের সমস্যাটি দেখলেন ডা. নূর হোসেন ভূঁইয়া শাহীন। দিলেন ব্যবস্থাপত্র। বললেন, আশা করি সেরে ওঠবেন। এরপরও কোনো সমস্যা হলে আমি আছি, দেখে দেবো।’

পাঠক, বাকলিয়া থানার ওসি নেজাম উদ্দীন কিংবা ডা. শাহীন কেউই কভারেজের আশায় একুশে পত্রিকা কিংবা অন্য কোনো গণমাধ্যমকে ফোন করেননি। মানবিক কাজ কিংবা বিশাল কিছু করে ফেলেছেন বলেও কোথাও জাহির করেননি।

পুলিশ-চিকিৎসকের যুগপৎ মানবিক আচরণে বিস্মিত, অভিভূত জাহাঙ্গীর আলমই শনিবার রাত ৯টার দিকে একুশে পত্রিকাকে ফোন করে জানিয়েছেন এমন মানবিক গল্প।

তিনি বললেন, শরীরের সাথে মানসিক প্রশান্তির যে যোগসূত্র, সেটা আমি আজ বুঝতে পারছি। ওষুধ কিনে এনে এখনো খাইনি। ওসি এবং ডাক্তারের অকল্পনীয় মানবিক আচরণে আমার মাঝে যে ভালোলাগা, মানসিক প্রফুল্লতা তৈরি হয়েছে তাতেই আমি ৯০ ভাগ সুস্থ হয়ে ওঠেছি। ফোড়ার অসহনীয় ব্যথা, যন্ত্রণা কোথায় যেন চলে গেলো।

জানতে চাইলে ডা. নূর হোসেন ভূঁইয়া শাহীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে আমি প্রতিদিন চেম্বার করি, রোগী দেখি। আজ যে ক’জন রোগী ছিল তাদেরকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই দেখা শেষ। ওই সময় জাহাঙ্গীর আলম নামে এক রোগী ফোন দিয়ে জানালেন – ‌’তার অবস্থা খুব খারাপ, তিনি আসতে চান। কিন্তু তার চেম্বারে পৌঁছাতে ৭ টা নাগাদ হতে পারে।’

রোগীর আকুতি দেখে বললাম, ‘ঠিক আছে আসুন, আপনার জন্য ৭টা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।’ ৭টার কিছু আগে রোগী আসলেন। দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র দিয়েছি। ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে থাকার পর প্রয়োজন হলে অপারেশন করতে হবে। রোগীকে সেটি জানানো হয়েছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত।- বলেন ডা. নূর হোসেন ভূঁইয়া শাহীন।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে একুশে পত্রিকাকে তিনি জানান, ‘জাহাঙ্গীর সাহেবকে যে সেবা দিয়েছি সেটি আমাদের নিয়মিত এবং কমন ঘটনা। আমরা ঘোষণা দিয়েছি, শুধু বাকলিয়া থানা এলাকার বাসিন্দা নয়, যে এলাকারই হোক না কেন চিকিৎসার প্রয়োজনে আমাদের সহযোগিতা, সেবা চাইলে সাধ্যমতো সেবার ডালা নিয়ে আমরা দুয়ারে হাজির হবো। মানবিক সমাজ, মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে আমরা সদা জাগ্রত, সদা প্রস্তুত।’