বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনাকালে খুনি হবেন নাকি সুখী হবেন?

প্রকাশিতঃ সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২০, ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ


ওয়াসিম আহমেদ : সংক্রামণ ব্যাধি কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কারণে ভালো নেই আজকের পৃথিবী। ভালো নেই সোনার বাংলাও। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সচেতনতা ছাড়া আর কোনো অস্ত্রই বাঁচাতে পারবে না পৃথিবীটাকে। বিশ্ব আঁতকে উঠে বলছে, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

আপনি তরুণ? চাইলে এ সময়টায় খুনি হতে পারেন। ফাঁসি হবে না, তবে বিবেক একবার জাগ্রত হলে আজীবন মুক্তিও মিলবে না। শহর বা গ্রামের অলিগলির রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানোই আপনার নিত্যদিনের অভ্যাস। তাই ঘরে থাকতে পারছেন না, বিরক্ত লাগছে। পুলিশ-সেনাকে ফাঁকি দিয়ে আড্ডায় মেতেছেন? তাহলে আপনি খুনি। সোজাসাপ্টা ভাষায় বললাম, আপনি একজন খুনি।

কিভাবে? ধরুন, আপনি করোনায় আক্রান্ত হলেন, তারুণ্যের শরীরটা ‘ভাইরাসটির এন্টিবডি’ তৈরি করায় সুস্থ আছে। কিন্তু আপনার স্বভাবসুলভ বাইরে যাওয়ার কারণে, আপনার সংস্পর্শে আসতে পারে কোনো বৃদ্ধা বা শিশু, যারা আপনার পরিবারেরই কেউ। যাদের শরীরে আপনার মত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। ফলে মৃত্যুই তাদের পরিণতি। তাহলে ভাবুন, আপনিই তাদের খুনের কারণ হচ্ছেন না তো? কোনো সন্তানকে এতিম করছেন না তো? কোনো মায়ের কোল খালি করছেন না তো? এবার পছন্দটা আপনার, খুনি হবেন নাকি বাসায় থাকবেন।

করোনাকালে খুনি না হয়ে সুখীও হতে পারেন। কয়েকটি কৌশলও দিচ্ছি। তার আগে একটা বাস্তব গল্প শোনাতে চাই। ১৯৯৯ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে মারাত্মক জখম হন এক আমেরিকান। ভেঙে গিয়েছিল তার শরীরের ১১টি হাড়। ডাক্তার মৃত ঘোষণা করার সাত মিনিটের মাথায় তার হৃৎপিণ্ড আবার সচল হয়।

বেঁচে উঠার পর ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন যে, বেঁচে থাকলেও তিনি জীবনে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে বা নিজের পায়ে চলতে পারবেন না। এর পরেরটা ইতিহাস। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি শুধু উঠেই দাঁড়ালেন না। হয়ে উঠেন আল্ট্রা ম্যারাথন দৌড়বিদ, আজকের বিখ্যাত লেখক, মোটিভেশনাল স্পিকার, বেস্ট সেলার বই ‘দ্য মিরাকল মর্নিং’-এর লেখক হাল এলরড।

কীভাবে সম্ভব হলো এতকিছু? হাল এলরড বলেছেন, ইতিবাচক চিন্তা এবং সকালের ৬টি অভ্যাসের জোরে বদলে দিয়েছেন নিজেকে। তাক লাগিয়েছেন পৃথিবীকে। তার বইটিতে সকাল ৮টার আগে ৬টি অভ্যাস চর্চার কথা বলা হয়েছে। যেগুলো চর্চা করে আপনি বদলে যেতে পারেন। কেননা এখন যে সময়টা বাসায় থাকার জন্য পেয়েছেন, সেটা হয়ত জীবনে আর কখনো পাবেন না। তাই এখন তৈরি হওয়া অভ্যাসগুলো আপনাকে বাকী জীবন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবুল কালাম বলেছিলেন, ‘তুমি চাইলেই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে ছোট ছোট অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে পারবে। আর এই পরিবর্তিত অভ্যাসগুলো তোমার ভাগ্য পরিবর্তন করে দিবে।’ তাহলে আপনিও বদলে যেতে পারেন। স্বপ্ন দেখুন, আপনার বদলে যাওয়ার দিনগুলি কেমন হবে, আপনাকে অনুসরণ করবে আগামীর প্রজন্ম। হয়তো আপনার নাম স্থান পাবে বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের পাতায়।

এবার বলি ৬টি অভ্যাসগুলি কী কী? হাল এলরড এগুলো মনে রাখার জন্য একটি আদ্যক্ষর তৈরি করেছেন, তা হলো SAVERS। এ ৬টি অক্ষরের অর্থ হলো: S = SILENCE, A= AFFIRMATION, V= VISUALIZATION, E= EXERCISE, R= READING, S= SCRIBING। এই ৬টি অভ্যাস আত্মস্থ করলে হলে ভোরে উঠতে হবে। প্রথমটি হলো নীরবতা বা ধ্যান করা। এজন্য ভোরে উঠে ফযরের নামাজ আদায় করলেন বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় প্রার্থনা করতে পারেন। না হয়, ইয়োগা বা যোগ ব্যায়াম করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, Affirmation বলতে হাল বুঝিয়েছেন নিজের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলা। একটি নির্জন স্থানে বা ঘরে নিজের সঙ্গে তিনি কথা বলতে বলেছেন বইটিতে। বিষয়টি সহজ করে বলা যায় সকালে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করুন যে নিজেকে কেমন স্থানে দেখতে চান। এবং সেটা কেন চান। আর সেইসঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করুন যে, ওই স্থানে পৌঁছতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে। বা তার জন্যে আপনি কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারবেন। নিজের কথা বলার এই অভ্যাসটিই বদলে দেবে আপনার সমস্ত চিন্তা-ধারা, কর্মক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতি।

আবার ভিজুয়ালাইজেশন হল, আপনি যা হতে বা করতে চাইছেন কল্পনায় সেটা দেখার চেষ্টা করা। আপনি ভালো বেহালাবাদক হতে চান। তবে কল্পনা করুন বেহালা ছুঁয়ে দেখছেন বা বাজাচ্ছেন কিংবা অনেক ভালো পারফর্ম করছেন। যে লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছেন তাকে কল্পনার চোখে রোজ সকালেই দেখার চেষ্টা করুন। এটাই আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সিঁড়ি হতে পারে। সফল ব্যক্তিদের সকালের অভ্যাসগুলি পর্যবেক্ষণ করে হাল এলরড প্রমাণ করেন, সকালে কিছুক্ষণ শরীর চর্চা করা হলে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সক্ষমতা যেমন বাড়ে তেমনি মস্তিষ্কে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহের ফলে ক্লান্তিহীন ও সুন্দরভাবে কাজ করার জন্য মস্তিষ্ককে তৈরি করে দেয়। যা বাকি সারাদিনটাকেই বদলে দেয়। হাল কিন্তু শরীরচর্চার জন্য কোন জিমে যেতে বলেননি। খালি হাতেই সেসব ব্যায়াম করা যায়, সেগুলি করলেই হবে। গুগল প্লে স্টোরে এরকম অনেক এ্যাপস রয়েছে। যা দিয়ে সহজেই ব্যায়াম সারতে পারবেন।

হাল আরেকটি সুন্দর অভ্যাসের কথা বলেছেন, তা হল বই পড়া। প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ পৃষ্ঠা বই পড়ার কথা তিনি বলেছেন। আর তা সকালেই পড়তে হবে। ভেবে দেখুন প্রতিদিন ১০ পৃষ্ঠা করে পড়লে এক বছরে সাড়ে তিন হাজার পৃষ্ঠা পড়া হবে- যা প্রায় ১৮-২০টি বইয়ের সমান। সবার শেষে হাল যে অভ্যাসটির কথা লিখেছেন তা হলো Scribing বা লেখা। কথা হচ্ছে, কী লিখবো? কেন লিখবো? হাল এই বিষয়েও একটু ব্যাখ্যা দিয়ে বইটিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলছেন, লেখার জন্য দুটো পর্যায় ভাগ করে নেয়া যায়। যেমন, প্রথম পর্যায়ে লিখবেন আপনি গতকাল কী কী শিখেছেন, কী কী করেছেন, কী অর্জন করেছেন, আর আপনার মধ্যে কী কী বিশেষ ক্ষমতা আছে ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে লিখবেন কী কী করতে চান। আর লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে কী কী করতে হবে। তার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই অভ্যাসগুলো চর্চা করতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না। এক্ষেত্রে সকাল ৬টা থেকে ৮টা উত্তম সময়। হালও তাই বলেছেন। পৃথিবীর সবাই যখন ঘুমাবে, তখন আপনি প্রস্তুত হবেন। তো, আপনি এগিয়ে না থেকে কি ঘুমন্ত মানুষগুলো এগিয়ে থাকবে? নিজেকে বদলে দেওয়ার এমন সুযোগ আর কখনও আসবে না। পড়াশোনা শেষে চাকুরি খোঁজা- এমন অনিশ্চয়তায় নিজেকে রাখার চেয়ে দক্ষ হয়ে উঠুন। সবার থেকে আপনি এগিয়ে থাকবেন। যখন আপনার বন্ধুরা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরবে, তখন হয়তো দেখবেন আপনি নিশ্চিন্ত জীবন-যাপন করছেন।

উদাহরণ দিয়ে বলি, সারাদিন কতক্ষণ ফেসবুক বা ইউটিউবে সময় দেন? ভিডিও দেখতে ভালো লাগে? ঠিক এই ভালো লাগাকে দক্ষতায় পরিণত করুন। যে মোবাইলটি দিয়ে ভিডিও দেখছেন, ঠিক সেটি দিয়েই ভিডিও বানান। একটি ভালো মানের ইউটিউব চ্যানেল দাঁড় করাতে পারেন। আজকের জন্য হয়তো ছোট কিছু। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হতে হতে আপনার চ্যানেলে লাখের উপর সাবস্ক্রাইবার হতে পারে। সেখান থেকে যদি বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা আয় আসে, তবে মন্দ কি? সবার পাশাপাশি আপনিও চাকরি খুঁজবেন। পার্থক্য কোথায় জানেন? আপনার তখন একটি আয় থাকবে, সাথে আপনার অতিরিক্ত যোগ্যতা, দক্ষতা আছে। তাহলে চাকরিতে কাকে নেবে? আপনাকে নাকি ‘অজুহাত কোম্পানি লিমিটেডের সিইও’কে? শুধু এটি নয়, চারপাশে হাজারো পথ আছে নিজেকে দক্ষ করার। দেখুন, বৃষ্টি সবার জন্য পড়ে, কিন্তু সবাই ভিজতে পারে না। তাই সবার জন্য সফলতার গল্পও রচিত হয় না। এবার সিদ্ধান্তটা আপনার, বদলানোর সুযোগটা নিবেন, নাকি খুনি হবেন।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বদেশ।
[email protected]