মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

হালদার রূপ পরিবর্তন, ফিরতে পারে ডিমের সোনালি দিন

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২০, ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : দেশব্যাপী চলা প্রায় তিন সপ্তাহের লকডাউনে পরিবর্তিত হচ্ছে হালদার গতিপ্রকৃতি। প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে হালদায় কমেছে মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ।

এছাড়া হালদা নদী দূষণের প্রধান দুই উৎস ছিল হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল। বছর খানেক আগে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়েছে পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পেপার মিলটি।

সবমিলিয়ে হালদা যেন ফিরে পেয়েছে পুরোনো রূপ, ভরা যৌবনা। এসব কারণে এবার আশা করা হচ্ছে হালদায় ডিমের উৎপাদন বাড়বে।

একই আশা, হালদাতীরের মানুষ মোহাম্মদ ইলিয়াছের। তার আশাবাদ, যদি প্রকৃতি অনুকূলে থাকে, তাহলে এবার মা মাছের ডিম সংগ্রহে সোনালী দিন ফিরে আসবে। তিনি বলেন, আমি নদীর স্বাস্থ্য দেখে বুঝতে পারছি দূষণ কমে আসছে। হয়তো লকডাউনের একটা প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয়দের মতে, মুষলধারে বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর তুমুল বজ্রপাত একসাথে হলে মা মাছের ডিম দেয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। তিনি আশা করছেন, এবার তেমনই পরিবেশ তৈরি হবে। পাওয়া যেতে পারে অন্যান্য বারের চেয়ে বেশি পরিমাণে মাছের ডিম।

তবে দেশের লকডাউন পরিস্থিতিতে ডিম কেনার জন্য ক্রেতারা যাতে আসতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান স্থানীয়রা।

হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে সার্বিক বিচেনায় ভালো অবস্থান ও অনেক নিরাপদ আছে হালদা। দূষণের বড় কারণ হাটহাজারি পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট, এশিয়া পেপার মিল বন্ধ রয়েছে। একই সাথে মা মাছ রক্ষায় হাটহাজারীর ইউএনও’র ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো, আইডিএফ নামের একটি এনজিও’র ভালো ভূমিকা ছিল। অবৈধ বালু উত্তোলনের ড্রেজারগুলোও ছিল নিয়ন্ত্রণে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক লকডাউনের ইতিবাচক প্রভাব।

সার্বিকভাবে পরিবেশ ঠিক থাকলে, পর্যাপ্ত বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল নামলে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি ডিম আশা করা যায়। বলেন অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া।

জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, গত দেড় বছরে এ পর্যন্ত হালদা নদী থেকে এক লাখ ১৩ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করেছি। জব্দ করেছি সমপরিমাণ বালি ও ড্রেজার। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে হালদা নদীর মা মাছের সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া হালদা দূষণের জন্য দায়ী দুুটি প্রতিষ্ঠান (পিকিং প্ল্যান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল) বন্ধ আছে। সবমিলিয়ে এবার হালদার মা মাছ পর্যাপ্ত ডিম দিতে প্রস্তুত। আবহাওয়া পরিস্থিতি যদি হালদার মেজাজ উপযোগী হয় তাহলে এবার ডিমের ব্যাপক উৎপাদন আশা করা যায়। – যোগ করেন ইউএনও রুহুল আমিন।

প্রসঙ্গত, এশিয়ার অন্যতম প্রধান মৎস্য প্রজণনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদীতে একটি বিশেষ মুহূর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস ও কার্প জাতীয় মাতৃমাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার বিশেষ সময়কে “তিথি” বলা হয়ে থাকে। মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবশ্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা “জো” বলে। জো এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হল নদীর জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করা। পূর্ণ জোয়ারের শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা ডিম ছাড়ার আগে পরীক্ষামূলক ভাবে অল্প ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ না পেলে মা মাছ ডিম নিজের দেহের মধ্যে নষ্ট করে দেয়। ডিম সংগ্রহ করে জেলেরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক হ্যাচারিতে উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন।