বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

জেলখানায় শুনছিলাম জাতীয় চার নেতা হত্যার নির্মম বর্ণনা

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৮, ২০২০, ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

খ ম হারূন : ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে নির্মিত এই অনুষ্ঠানের একটি ছবি দেখে মনে পড়লো বেশ কিছু কথা। ঘটনার আড়ালে’র মাধ্যমে জয়া আহসান সহকারী উপস্থাপক হিসেবে টিভিতে কাজ করা শুরু করে। তখনো সে অভিনয় শুরু করেনি। সুপন রায় অনুষ্ঠানের ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট তৈরি করতেন। ক্যামেরায় ছিলেন কাওসার চৌধুরী। আর আমাকে সহযোগিতা করতেন ফাইজুল ইসলাম।

সেদিন সকাল থেকে কারাগারের বিভিন্ন এলাকার দৃশ্য ধারণ করে চলেছি। বঙ্গবন্ধু যে সেলে থাকতেন সেটি দেখি। অনেক বছর তিনি কারাগারের এই ছোট ভবনে ছিলেন। মুগ্ধ হয়ে দেখি বেশ কিছু সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ যা বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। ভাসানী, মনি সিংহ এইসব রাজনৈতিক নেতাদের স্মৃতিসহ অনেক ঐতিহাসিক স্থান দেখি। জেল সুপার মোশাররফ হোসেন সে সবের ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেন।

দেখি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সেই ফাঁসির মঞ্চ, যেখানে একরাতে শত সৈনিকের ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে এই বাংলাদেশে। একজন আইজি প্রিজন তাঁর নিজ সন্তানের (সামরিক অভ্যুন্থানের জন্য অভিযুক্ত) ফাঁসিও এখানে কার্যকর হতে দেখেছেন। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিলো সেদিন যেখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো জাতীয় চার নেতাকে ১৯৭৫ এর ৩ নভেম্বর রাতে। যাদের হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিলো ক্যাপ্টেন মাজেদ, রিসালদার মেসলেহউদ্দিন। যে সেলে এনে তাঁদেরকে হত্যা করা হয় সেই সেলে তখনো আছে শত শত বুলেটের চিহ্ন। কী নির্মমভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিলো তা শুনেছিলাম প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়।

সেদিন সেই সব ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেখতে দেখতে কখন যে গোধূলিলগ্ন হয়ে গেছে টের পাইনি। কাওসার, সুপন বারবার চোখ মুছে চলেছে। সামনাসামনি এদেরকে দেখলে বোঝা যায়না যে এরা কতোটা আবেগপ্রবণ। আমরা তখন জেলগেটের কাছাকাছি। এর মাঝে আমরা দেখতে পাই আমাদের সাথে জয়া নেই। কোথায় সে? জেল সুপার মোশাররফ ভাইকে বললাম। তিনি বললেন, সর্বনাশ, চলেন আমার সাথে। কয়েকজন জেল পুলিশ নিয়ে আমরা আবার কিছুটা ভিতরে ঢুকলাম। দেখি শতশত কয়েদী জয়া আহসানকে ঘিরে ধরেছে। হাততালি দিচ্ছে। জয়া একটুও না রেগে, ভয় চেপে রেখে তাদেরকে অনুরোধ করছে যেতে দিতে। কিন্তু কে কার কথা শোন। এতো সুন্দর মেয়ে। কেউ তাকে বলছে মা। কেউ বলছে আপা। কেউ কেউ সিনেমার গান ধরেছে। এমন সময় মোশাররফ সাহেব জেল পুলিশ নিয়ে কয়েদীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এর মাঝে জয়া কোনো রকমে বের হয়ে এসে আবেদ খানের হাত চেপে ধরলো। সে যথেষ্ট ভয় পেয়েছে কিন্তু তা এক মুহূর্তের জন্যও কয়েদীদের বুঝতে দেয়নি।

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি প্রডাকশন সেন্টার। বিটিভির জন্য তারা “ঘটনার আড়ালে” প্রযোজনা করেছে প্রায় ৪ বছর ধরে। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন আবেদ খান। আর আমি পরিচালনায়।

খ ম হারূন : মুক্তিযোদ্ধা প্রযোজক ও সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।