বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ধর্মবিহীন জীবন অগোছালো আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের ফুলজুড়ি

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মে ৮, ২০২০, ৬:০৫ অপরাহ্ণ

বিপ্লব বড়ুয়া : জীবনের জন্য বেঁচে থাকা। নাকি বেঁচে থাকাটা জীবনের জন্য। কোনটা বলা যথোপযুক্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। নিজের অল্পবিদ্যার দৌড়ে যা বুঝি , তাহলো একটি অন্যটির সম্পূরক। জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার অঙ্গীকারে ; জানা-অজানা , কাছে বা দূরের, কিছু মেঘ-কিছু বৃষ্টি, আচানক প্রখর রোধ, খানিকটা বিশ্বাস-অবিশ্বাস, অনেকাংশে প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত, আদ্ধেক ভাগ্য-অভাগ্য , অবস্থাদৃষ্টে কৃতজ্ঞ-অকৃতজ্ঞ, স্বকীয় ধর্ম- ধর্ম , মাত্রাতিরিক্ত ধনী-গরিব, পূর্ণাঙ্গ কুশল-অকুশল আরো কতো কিছুরই সাথে আমাদের পরিচিতি ঘটে।

সবকিছুরই আদি ও অন্তের একটাই অভীষ্ট লক্ষ্য-নিজের জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। এখানে শান্তি-অশান্তি, স্নেহ – মমতা, মৈত্রী-অমৈত্রী, করুণা, প্রেম, ভালোবাসা, অন্যের বেঁচে থাকার আকুতি বা অধিকার কিছুই বিবেচনার আওতাভুক্ত নয়। তবে অনেক ক্ষেত্ৰেই সেভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো গৌরব আছে কিনা, সেটা প্রশ্নাতীত!

জীবনের তরে ধর্ম অন্যতম একটি অপরিমেয় উপাদান। ধর্মবিহীন জীবন চলে, চলে আসছে এবং আগামীতেও চলবে। একটি কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই, ধর্মের সুশীতল ছায়ায় জীবনের গতিপ্রকৃতি হয় সুষমামণ্ডিত, ক্ষান্তিময়, সহিষ্ণুপরায়ণ, চৈতন্যবোধে অবগাহন, মহানুভবতায় অগ্রগামিতা, শ্রদ্বাশীলতা, ভালো আর মন্দের বৈসাদৃশ্যের উপলব্ধি , পরার্থে আত্মনিয়োগ, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিতসহ আরো নানান বিবিধ কর্মকাণ্ডে সুপ্রসন্ন!

সেইসাথে সভ্যতা উন্নতির ধারাবাহিকতায় ও ধর্মের বিশেষ প্রভাব রয়েছে বৈকি। বলে রাখতে চাই-যারা ধর্মটা বেশি (গোয়ার্তুমি) বুঝেন কিংবা প্রকৃত অর্থে প্রাজ্ঞ নয় অথবা যুক্তিতর্কের মোড়কেই জীবনযাপনে অভ্যস্থ, তাদের জন্য আমার এই লিখাটা, উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর সমতুল্য!

আমার একান্ত উপলব্ধি, ধর্মবিহীন জীবন হয় অগোছালো আর দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ফুলজুড়ী। ফলপ্রসূ জীবন গঠনে অধ্যবসায়, পর্যাপ্ত অধ্যয়ন, সর্বদা অনুশীলন তথা রুটিন maintain করে চলা ব্যতীত বিকল্প আর কোনো পথ নেই। এ পর্যায়ে, ধর্মের রসবোধ আর অকৃত্ৰিম প্রেম নিয়ামক হয়ে একমাত্র উপাদেয় হিসাবে কাজে করে। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় , সেটা কীভাবে সম্ভব? তার সহজ উত্তর-নিজের আত্মপোলব্ধি!

ধর্ম, একান্তই নিজস্ব একটি লালন ও পালনের বিষয়। কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেশা বা প্রতিদানের জন্য ধর্মচর্চা করাকে ধর্মভীরু ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। যেটা কল্যাণকর, সর্বজনের মঙ্গল, বাস্তবতার সাথে মানানসই, যেটা পরশ্রীকাতরতা শেখায় না, যেটা মানবমুক্তির পথ দেখায়, যেটা মনের উৎকর্ষ সাধন করে, যেটা বর্ণবৈষম্য পরিহার করে, যেটা জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটাই ধর্ম আর সেটাই আপনার-আমার সকলের পালন ও অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।

শুধু ধর্ম কথার অবহিত হওয়া অথবা মুখস্থ করার মধ্যে কোনো সার্থকতা নিহিত নাই। ব্যাপারটা ঠিক এ রকম, অনেক জ্ঞানী-গুণীর জীবনালেখ্য সম্বলিত চাকচিক্য মলাটে পুস্তকটি decorative piece হিসাবে ক্যাবিনেটে শোভা পাবার জন্যই শুধু রাখা ছাড়া আর কী, যদি বইগুলো না পড়ি! প্রদর্শিত বইটি চোখের খোড়াকই মেটাবে, মনের তৃষ্ণা কখনো মেটাবে না। সদ্ধর্মের শিক্ষা এবং চর্চাও ঠিক একইরকমের!

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে ধর্মের প্রভাব গৌণ মনে হয়। একথা অনিস্বীকার্য, জীবনের জন্য যেমন প্রযুক্তির দরকার, ঠিক তেমনি জীবনের জন্যও ধর্মের প্ৰয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বর্তমান প্রজন্মটাই যেহেতু একটা trend সেখানে চোখ বন্ধ রেখেই বলা যায়-এ কথার সাথে কেউ সহমত নয়। কেননা, ধর্মের বীজ বপন করতে হয় নিজের ভিতর। ধর্মটা হচ্ছে পরিপূর্ণরূপে শেখার, জানার, উপলব্ধির আর অনুভবের বিঁধিলিপি। যেটা চলমান চর্চা আর অনুশীলনের মাধ্যমে ডেভেলপ করে।

ছোট্ট একটা গল্পাকারে উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন , কোনো একটি লেকে আপনি সপরিবারে ঘুরতে গেছেন, যেখানে রঙ-বেরঙের মাছের সমাহার রয়েছে। গিয়ে দেখলেন, অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাছদের খাবার দিচ্ছে। আপনার অতি প্রিয় ছোট্ট সোনামনি ও মাছকে খাওয়ানোর জন্য নাছোড়বান্দা। যাই হোক, আপনি এক ব্যাগ মাছের খাবার জোগাড় করে ছেলেকে দিলেন আর আপনি পাশে থেকে ছেলের মাছ খাওয়ানোর দৃশ্য উপভোগ করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তগুলো আপনার মনে হবে- পনার অতি আদরের ছেলেটি বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে সময়টা পার করছে।

এই সময়টাতে আপনার ভিতরে যে আনন্দের হিল্লোল বইছে, তারই আরেক অভিস্নাত অনুভূতির নাম ধর্ম। আর এভাবেই ধর্মটা সবার জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। যেটা না বললেই নয়, তাহলো-ধর্মশিক্ষা ও তার যথার্থ উপলব্ধি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ওতপ্রোতভাবে সবখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

আজকে সমাজের নানান ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারণ, নামধারী অধার্মিকরা ধর্মকে বলি দিচ্ছেন সর্বত্র ! সহজ কথায় , ধর্ম হচ্ছে সুস্থ আর সবল মন-মানসিকতাপূর্ণ কার্যক্রম। ধর্ম সবাইকে আলোকিত করে সমভাবে। কেউ ঘোর অন্ধকারে থেকে যদি বলে যে, আমি তো ধর্ম নিয়েই আছি; সেক্ষেত্রে তার জন্য আলোর সন্ধান পাওয়া বড়ই দুরূহ! ধর্ম কখনো আমাদের জীবনে আসে না অযাচিতভাবে, আমাদের প্রয়োজনে আমরাই জীবনের খানিকটা প্রশান্তি, খানিকটা শীতলতা পাওয়ার তৃষ্ণায় ধর্মের ছায়াতল খুঁজি!

অতএব , সৎধর্ম করুন নীরবে, নিভৃতে আর জীবনের যাবতীয় লেনদেন পর্যালোচনা করতে শিখুন ধর্মের আলোকে! গেলো শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা সবাইকে।

গ্লানিকর ‘করোনা’ আজো আমাদের চারিদিকে যমদূতের বার্তা নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে। তাই, সচেতনতায় আরো বেশ কিছু সময় আমাদের পাড়ি দিতে হবে। জেগে থেকেই দুঃসময়ের অসহায়ত্ব থেকে নিজেদের রক্ষা করুন। নিরাপদ আর সুস্থতায় কাটুক সবার আসন্ন আগামি।

লেখক কানাডা প্রবাসী