রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাঈদীপুত্রের সঙ্গে বাবুনগরীর বৈঠক, হেফাজতকে কবজায় নিতে চায় জামায়াত?

প্রকাশিতঃ রবিবার, মে ১৭, ২০২০, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম : হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অসুস্থতার সুযোগে ধর্মভিত্তিক সংগঠনটির নেতৃত্ব কবজায় নিতে তৎপরতা চালাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। হেফাজতের আমীর পদে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী অথবা তার মামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে বসাতে চাচ্ছে জামায়াত। একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।

জানা যায়, হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণে নিতে বছরখানেক আগে থেকে নানা পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হচ্ছিল জামায়াত। পরিকল্পনা অনুযায়ী আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম বা হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদেও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে বসাতে চায় তারা। কারণ এই মাদ্রাসার প্রধান হওয়া মানেই হেফাজতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পাওয়া।

হেফাজতের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে পরিকল্পনা করার জন্য গত বছরের ২১ আগস্ট ফটিকছড়িতে জুনায়েদ বাবুনগরীর মাদ্রাসায় গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কক্সবাজার-২ আসনের জামায়াত দলীয় সাবেক এমপি ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জুনায়েদ বাবুনগরীর মামা হেফাজতের নায়েবে আমীর আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে হেফাজতের আমীর বানানোর প্রস্তাব রাখেন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ।

এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে সাতকানিয়ায় একটি বাড়িতে সাঈদীপুত্র মাসুদ সাঈদী ও সরকারবিরোধী উগ্র বক্তা হিসেবে পরিচিত তারেক মনোয়ারের সাথে হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর গোপন বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে গত ২ ফেব্রুয়ারি গোপন প্রতিবেদন দেয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

এতে উল্লেখ করা হয়, সাতকানিয়ায় সাঈদীপুত্র মাসুদ সাঈদী ও তারেক মনোয়ার এবং ফটিকছড়িতে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রমূলক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ও জামায়াতের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা গ্রহণ করেছেন জুনায়েদ বাবুনগরী। ফলে জুনাইদ বাবুনগরী সরকারবিরোধী উসকানি, মদদ দিতে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চালাবেন বলে প্রতিয়মান হয়। আল্লামা শাহ আহমদ শফী অসুস্থ থাকায় জুনায়েদ বাবুনগরী নানা ধরনের কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনায়েদ বাবুনগরীর জামায়াত-কানেকশনের বিষয়টি যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর সাথে ছবি ভাইরাল হলে তা স্পষ্ট হয়। যদিও বাবুনগরী জামায়াত-কানেকশনের বিষয়টি অস্বীকার করে দশ লক্ষ টাকার চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন।

এদিকে, সর্বশেষ নীল-নকশা বাস্তবায়ন অনেক দূর এগিয়ে গেছে জামায়াত। শনিবার (১৬) মে দুপুর থেকে খবর রটে যায় হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী। তবে শনিবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন মাদ্রাসাটির মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

ভিডিও বার্তায় শাহ আহমদ শফী বলেন, দায়িত্বে আসার পর থেকে এই মাদ্রাসার জন্য কী করেছি না করেছি সব মানুষের জানা আছে। এমন কিছু অপবাদ দেয়া হচ্ছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সারাটা জীবন মাদ্রাসার জন্য নিজের জীবনকে কোরবান করে দিয়েছি। কাউকে নায়েবে মোহতামিম অথবা জিম্মাদার করে দিইনি। যা কিছু করার মাদ্রাসার জন্য সব মজলিসে শূরা করবে।

এর আগে শনিবার (১৬ মে) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাটহাজারী ওলামা পরিষদের নেতৃবৃন্দ আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিএনপি নেতা মীর নাছিরের চাচাতো ভাই মীর ইদ্রিস, মাওলানা জাফর, মাওলানা সাইফুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সূচনা বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, সরকার তার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে মাদ্রাসার বর্তমান মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর অসুস্থতার সুযোগে এবং তার ছেলে আনাস মাদানীর উসকানিতে একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া হতে পারে। ওলামা পরিষদের উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বাবুনগরীর পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন বৈঠকে। এ সময় মীর ইদ্রিস বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক নিয়োগে একক সিদ্ধান্ত আসলে আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে হবে।

দুপুর ১টা ২০ মিনিট থেকে ২ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত যোহরের নামায আদায় শেষে মীর ইদ্রিস মসজিদের ইমামের কাছ থেকে মাইক নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, আপনারা বসুন, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। এরপর মীর ইদ্রিস বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসায় মজলিশে শূরার মাধ্যমে মহাপরিচালক নিয়োগ প্রদান করতে হবে। তা না হলে তৌহিদী জনতা দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে। তার এই বক্তব্যের পর অন্যান্য সদস্যরাও একই বক্তব্য প্রদান করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ধারণা করছেন তাকে হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক নিয়োগ না দিয়ে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তার এ ধারণা থেকে তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই মিটিং করছেন। পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য স্থানীয় হাটহাজারী ওলামা পরিষদের দ্বারস্থ হয়েছেন। এবং মাদ্রাসায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিকল্পনা করছেন।

তিনি বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমেদ শফি বেঁচে আছেন এবং সুস্থ আছেন। এমন অবস্থায় মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী বহিরাগত ওলামা পরিষদের জামায়াত-বিএনপি’র সদস্যদের নিয়ে শনিবার দিনভর যা করেছেন তা মাদ্রাসার আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার বহির্ভূত।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।