রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বিদ্যুত বড়ুয়াকে দেখেই কেঁদে ফেললেন মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া সিদ্দিক!

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ২০, ২০২০, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

আজাদ তালুকদার : ‘কেমন আছেন’- জিজ্ঞেস করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন ৬০ বছর বয়সী সিদ্দিক আহমেদ। হ্যাঁ, এই কান্না কষ্টের নয়, বরং আনন্দের, বেঁচে ফেরার। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘উনি, উনি না হলে আমি বাঁচতাম না। এতদিন হয়তো আমার কবর হয়ে যেতো।’ উনি মানে ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া; চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের সিইও।

আজ থেকে ১৫ দিন আগে দক্ষিণ হালিশহর থেকে রাতের আধারে চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল গেইটে একটি কালো অ্যাম্বুলেন্স এসে ফেলে দিয়ে যায় সিদ্দিক আহমেদকে। কুড়িয়ে পাওয়া করোনা-শনাক্ত সেই রোগীকে স্বাস্থ্যকর্মীরা ভর্তি করান ফিল্ড হাসপতালে। প্রচণ্ড কাশি, শ্বাসকষ্টের নিরবচ্ছিন্ন সেবায় সিদ্দিক আহমেদ এখন অনেকটাই সুস্থ। কাশি নেই। নেই শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের ব্যথাটি।

সিদ্দিক আহমেদ জানালেন, পরম মমতায় শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, নিয়মিত খাবার সরবরাহ, সার্বক্ষণিক নজরদারি, মানসিক শক্তি জোগানো-এসবের কারণেই আমার মতো মানুষের মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া। তখনও ইঙ্গিত-ইশারাটা ফের বিদ্যুত বড়ুয়ার দিকে।

হ্যাঁ ডা. বিদ্যুত বড়ুয়ার তত্ত্বাবধানে একঝাঁক চিকিৎসা-স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক যোদ্ধাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফল সিদ্দিক আহমেদের এমন কান্নাভেজা হাসি। কেবল সিদ্দিক নয়, ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সবার মুখে একই কথা, এক হাসি। চিকিৎসাধীন সকলেই সমস্বরে বললেন, ’মানবিক বিপর্য়য়ের এমন খড়ায় সত্যিই অনন্য, অসাধারণ এক মানবিক প্রতিষ্ঠান।’

বলাবাহুল্য, করোনা হওয়ার পর অচ্ছ্যুৎ ভেবে যারা সরে গিয়েছিলেন, সিদ্দিক আহমেদের আপাতরক্ষা, বেঁচে যাওয়ায় সেই স্বজন-শুভার্থীরা এখন তার খোঁজ নেন। ফলমূল পাঠান হাসপাতালে।

বুধবার (২০ মে) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আইসোলেশনের দুটি ওয়ার্ডে করোনা-শনাক্ত ২৫ জন, করোনা-সন্দেহে সাধারণ ওয়ার্ডে ৪ জনসহ মোট ২৯ জন রোগী ফিল্ড হাসপাতালের সেবা নিচ্ছেন। আইসোলেশন ওয়ার্ডে আছেন চার গণমাধ্যমকর্মী এবং এক গণমাধ্যমকর্মীর ব্যাংকার স্ত্রী।

এমন বিদঘুটে, অন্ধকার সময়ে একু্শে পত্রিকা সম্পাদককে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসের ঝাঁপি খোলেন তারা। অবাকও হলেন। বললেন, আপনি এলেন আমাদের দেখতে, এত ঝুঁকি নিলেন!

পাঠকডট নিউজের সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শাহনুর সুলতানা লুনা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিরবচ্ছিন্ন সেবায়। সাইফুল বললেন, ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া দেবতাতূল্য মানুষ। দেশের প্রতিটি জেলায় একজন করে ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া থাকলে মানবতার ঘূর্ণায়মান সঙ্কটে আরো কিছু মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারতো।

গণমাধ্যমকর্মী জোবায়ের, হারুন, আলমগীর বললেন, ‘আমরা ভাগ্যবান। আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই সেবার চমৎকার একটা ফরমেটে পড়ে গেলাম। আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমরা ভালো আছি। সবাইকে বলবেন, আমাদের জন্যে বেশি করে দোয়া করতে।’

ফিল্ড হাসপাতালের সিই্ও ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া বললেন, ‘এখানে যারা ভর্তি হয়েছেন, তারাই আমার ধ্যান-জ্ঞান, আমার সংসার। সেবায়-চিন্তায়, সাহসে- সবদিক দিয়ে যেন তাদের ভালো রাখা যায়, সেটাই আমাদের নিরন্তর চেষ্টা। দোয়া করবেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেবার জন্য যেন লড়ে যেতে পারি।

অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মুহূ্র্তে সার্বক্ষণিক এসি, অক্সিজেন সাপোর্ট আছে আমাদের হাসপাতালে। অন্তত ৫টা হলেও আইসিই বেড করার আপ্রাণ চেষ্টায় আছি। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে তা করা সম্ভব হবে। সেন্ট্রাল অক্সিজেনের কথাও ভাবছি আমরা। চেষ্টা করছি চাকচিক্য কিংবা শোডাউন নয়, প্রকৃত সেবাটাই দিকহারা করোনা-আক্রান্তদের জন্য উৎসর্গ করতে। যতক্ষণ দেহে বল থাকবে, কণ্ঠে প্রাণ থাকবে, হাসপাতালে বেড থাকবে ততক্ষণ ছোটবড়, ধনী-দরিদ্র সবাই সেবা পাবেন। এখানে সেবাপ্রাপ্তির জন্য কোনো তদবিরের প্রয়োজন নেই- যোগ করেন ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া।