শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলে রুট ৮ থেকে বাড়িয়ে ১০ করা হচ্ছে

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ২০, ২০২০, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ


ঢাকা: ইন্দো-বাংলাদেশ নৌ প্রটোকলে (আইবিপি) রুটের সংখ্যা ৮ থেকে বাড়িয়ে ১০ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদ্যমান রুটে নতুন স্থানও যুক্ত করা হয়েছে। বুধবার (২০ মে) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দু’দেশের প্রটোকলটিতে দ্বিতীয় সংযোজন স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এতে ভারতের পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ এবং বাংলাদেশের পক্ষে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী স্বাক্ষর করেন।

ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, দু’দেশের বৈঠকে আইবিপি রুটের দ্বিতীয় সংযোজন স্বাক্ষরের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানায়, দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান ছয়টি করে ১২টি ‘পোর্টস অব কল’ রয়েছে। সেগুলো হলো- বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, মোংলা, সিরাজগঞ্জ, আশুগঞ্জ ও পানগাঁও এবং ভারতের কলকাতা, হলদিয়া, করিমগঞ্জ, পান্ডু, শিলঘাট ও ধুবরী। এরসঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজশাহী, সুলতানগঞ্জ, চিলমারী, দাউদকান্দি ও বাহাদুরাবাদ এবং ভারতের ধুলিয়ান, ময়া, কোলাঘাট, সোনামুড়া ও জগিগোপা।

দু’টি করে ‘এক্সটেন্ডেড পোর্টস অব কল’ হলো- বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ পোর্টস অব কলের আওতায় ঘোড়াশাল ও পানগাঁও পোর্টস অব কলের আওতায় মুক্তারপুর এবং ভারতের কলকাতা পোর্টস অব কলের আওতায় ত্রিবেণী (ব্যান্ডেল) ও করিমগঞ্জ পোর্টস অব কলের আওতায় বদরপুর।

গোমতী নদীর সোনামুড়া-দাউদকান্দি (৯৩ কিমি) আইবিপির নবম ও দশম রুট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ত্রিপুরা এবং সংলগ্ন রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ বাড়াবে এবং উভয় দেশের নদী-দূরবর্তী অঞ্চলেও সহায়তা করবে। এ রুটটি ১ থেকে ৮ পর্যন্ত বিদ্যমান অকল আইবিপি রুটকে সংযুক্ত করবে।

রাজশাহী-ধুলিয়ান-রাজশাহী রুটগুলো পরিচালনা এবং আরিচা (২৭০ কিমি) পর্যন্ত সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অবকাঠামো বাড়াতে সহায়তা করবে। কারণ এ পথ দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পাথর পরিবহনসহ সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। এছাড়া এটি উভয় দেশের স্থল বন্দরগুলোর ওপর চাপ কমাবে।

কলকাতা-শিলঘাট-কলকাতা রুটের পাশাপাশি কলকাতা-করিমগঞ্জ-কলকাতা রুটে ভারতের কোলাঘাট যুক্ত করা হয়েছে। কলকাতা-করিমগঞ্জ-কলকাতা এবং করিমগঞ্জ-শিলঘাট-করিমগঞ্জ রুট ভারতের বদরপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এ রুটে বাংলাদেশের ঘোড়াশালও যুক্ত হয়েছে।

ভারতের কলকাতা, হলদিয়া, করিমগঞ্জ, পান্ডু, শিলঘাট এবং ধুবড়ি এবং বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, মোংলা, সিরাজগঞ্জ, আশুগঞ্জ ও পানগাঁও। ভারতের পক্ষ থেকে নতুন যুক্ত হওয়া পাঁচটি বন্দর হলো: ধুলিয়ান, মাইয়া, কোলাঘাট, সোনামুড়া এবং জগিগোপা এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলো হলো: রাজশাহী, সুলতানগঞ্জ, চিলমারী, দাউদকান্দি এবং বাহাদুরাবাদ। এছাড়া এ সংযোজনের মাধ্যমে ভারতের ত্রিবেণী (ব্যান্ডেল) ও বদরপুর এবং বাংলাদেশের ঘোড়াশাল ও মুক্তারপুর এ দু’টি বন্দর সম্প্রসারণের ফলে দু’দেশের পোর্টস অব কল ও সম্প্রসারিত পোর্টস অব কলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১০টি ও দু’টিতে।

নতুন পোর্টস অব কল হিসেবে জগিগোপা (ভারত) এবং বাহাদুরাবাদের (বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্তি মেঘালয়, আসাম এবং ভুটানকে সংযুক্ত করবে। জগিগোপাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ সেখানে একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক পার্ক স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। নতুন কল অব পোর্টসগুলো ইন্দো-বাংলাদেশ প্রটোকল রুটে পরিবহন করা কার্গো লোডিং এবং আনলোডিং করতে সক্ষম হবে যা দু’দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে গতি সঞ্চার করবে।

উভয়পক্ষই চিলমারী (বাংলাদেশ) এবং ধুবরির (ভারত) মধ্যে অগভীর নৌযান ব্যবহারের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রবর্তন করতে সম্মত হয়েছে। তবে প্রটোকলের ১.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নৌযানগুলো অভ্যন্তরীণ বাংলাদেশের নৌ চলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬ বা ভারতের ইনল্যান্ড ভ্যাসেলস অ্যাক্ট, ১৯১৭ এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে এবং সুরক্ষার শর্ত পূরণ করতে হবে। এ উদ্যোগের ফলে পাথর এবং অন্যান্য ভুটানিজ ও উত্তর-পূর্ব কার্গো বাংলাদেশে রপ্তানি হবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যবসায়ীদের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতি এবং আসামের নিম্নাঞ্চলে উন্নতি ঘটাবে।

এ প্রটোকলের আওতায় উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ নৌযানগুলো নির্ধারিত প্রটোকল রুটে চলাচল এবং দু’দেশের পোর্টস অব কলে নোঙর করে পণ্য উঠা-নামা করতে পারে। প্রটোকল রুটে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ট্রানজিট কার্গো এবং বাংলাদেশে রপ্তানি কার্গো চলাচলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ভারতীয় ট্রানজিট কার্গোর পণ্যগুরো হলো মূলত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কয়লা, ফ্লাই-অ্যাশ, পিওএল এবং ওডিসি। চলাচলের অন্যান্য সম্ভাব্য কার্গো পণ্য হলো সার, সিমেন্ট, খাদ্যশস্য, কৃষিপণ্য, কন্টেইনার কার্গো ইত্যাদি। ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি কার্গো মূলত ফ্লাই-অ্যাশ যা প্রতি বছর ৩০ লাখ মেট্রিক টন। প্রায় ৬৩৮টি অভ্যন্তরীণ নৌযান (৬০০ বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজসহ) বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার যাত্রা সম্পন্ন করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে ট্রানজিট এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কালোত্তীর্ণ প্রটোকল রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত এ প্রটোকল দু’দেশের মধ্যকার অভিন্ন ইতিহাস, বন্ধুত্ব, আস্থা এবং পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্বের প্রতিফলন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে পাঁচ বছরের জন্য এ প্রটোকলটি নবায়ন করা হয়েছিল, যাতে আরও পাঁচ বছর মেয়াদে এটির স্বয়ংক্রিয় পুনর্নবীকরণের বিধান রাখা হয় বিভিন্ন অংশীদারদের দীর্ঘমেয়াদি আশ্বাস দেওয়ার জন্য।

প্রটোকল সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং নৌসচিব পর্যায়ের আলোচনা হলো প্রটোকলটিকে আরও কার্যকর করার জন্য দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ২০১৮ সালের অক্টোবরে নয়াদিল্লিতে এবং ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার বৈঠকে আলোচনার সময় দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজতর করা, প্রটোকল রুট সম্প্রসারণ, নতুন রুটের অন্তর্ভুক্তি এবং কল অব পোর্টস ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এবার আরও নতুন কয়েকটি রুট সংযোজন করা হলো।

প্রটোকলে এ সংযোজনগুলো ব্যবসায়ীদের এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি ও এবং ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে বলে আশা করছে উভয়পক্ষ।

বিদ্যমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এবং সদ্য সংযুক্ত প্রটোকল রুটের মাধ্যমে যোগাযোগ উভয় দেশের বাণিজ্য ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য অর্থনৈতিক, দ্রুত, নিরাপদ এবং দূষণমুক্ত পরিবহন ব্যবস্থায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে এবং এ অঞ্চলের পরিবেশগত সুবিধাও পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন।

নৌ-প্রটোকল রুটে ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশি জাহাজের মাধ্যমে ২ হাজার ৬৮৫টি ট্রিপে ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫২ মেট্রিক টন এবং ভারতীয় জাহাজের মাধ্যমে ৫৯টি ট্রিপে ৭৮ হাজার ৭৯৪ মেট্রিক টন মালামাল পরিবহন করা হয়েছে। মার্চ ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশি জাহাজে ২ হাজার ৫৯১টি ট্রিপের মাধ্যমে ২২ লাখ ২৩ হাজার ৪৬১ মেট্রিক টন এবং ভারতীয় জাহাজে মাধ্যমে ৫৪টি ট্রিপের মাধ্যমে ৮৮ হাকার ৫৬৬ মেট্রিক টন মালামাল পরিবহন করা হয়েছে।