শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭

‘করোনা নেগেটিভ’ বাবাকে নিয়ে মধ্যরাতে ঘুরছে ছেলেরা, কোথাও মিলছে না চিকিৎসা!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মে ২৫, ২০২০, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ৫৪ বছর বয়সী শ্রীবাজ চৌধুরী গত বৃহ্স্পতিবার (২১ মে) কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের করোনা-সন্দেহ ওয়ার্ডে। শুক্রবার সকালে ফিল্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার নমুনা সংগ্রহ করে বিআইটিআইডি ল্যাবে পাঠান।

শনিবার রাতে রিপোর্ট হাতে এলে দেখা যায় শ্রীবাজ চৌধুরীর করোনা-নেগেটিভ। এর মধ্যে অক্সিজেন সাপোর্ট, নানা সেবাসুশ্রুষায় কাশি-শ্বাসকষ্ট কমে এলেও নিউমোনিয়ার ভাব থেকে যায় কিছুটা। নতুন করে হার্টের সমস্যাও লক্ষনীয়। এ অবস্থায় নেগেটিভ আসা একজন রোগীকে করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে রাখা সমীচিন মনে করেনি ফিল্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোববার (২৪) দুপুরের দিকে হার্টের চিকিৎসার জন্য শ্রীবাজ চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগ বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ছাড়পত্র প্রদান করে।

চারপাশে করোনাকাল, পজিটিভ রিপোর্টের ছড়াছড়ি। এই অবস্থায় শ্রীবাজ চৌধুরীর ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট পরিবারের সদস্যদের কাছে যেন আকাশের চাঁদ। অন্তত বাঁচা গেলো সামাজিক অবহেলা আর নিষ্ঠুর পীড়ন থেকে! নেগেটিভ রিপোর্ট যেহেতু হাতে, তাই চিকিৎসা পেতেও আর সমস্যা হবে না, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে না সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসক।

কিন্তু তাদের এই আনন্দ, আত্মবিশ্বাস বিষাদে পরিণত হতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। দুপুর দুইটায় ডিসচার্জ নিয়ে আড়াইটার দিকে নিয়ে যাওয়া হলো একুশে হাসপাতালে। সেখানে একজন কার্ডিওলজিস্ট দেখলেন বটে, দেখার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালো এই রোগীর চিকিৎসা তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

এর রোগীকে নিয়ে স্বজনরা ছুটলেন ন্যাশনাল হাসপাতালে। করোনা-নেগেটিভ রিপোর্ট হাতে থাকার পরও ন্যাশনাল হাসপাতাল ওই রোগীকে গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। বহু আকুলি-বিকুলির পর তারা রাজি হয়ে বুকের এক্সরে করতে দিলো। রিপোর্ট হাতে আসার পর বললো, রোগীর সমস্যা পাওয়া গেছে, অর্থাৎ তার করোনা-পজিটিভের সম্ভাবনা বেশি। হয় রিপোর্ট ভুল হযেছে, অথবা নেগেটিভ হওয়ার পর পজিটিভের সংস্পর্শে এসে আবার নেগেটিভ হয়েছে। তাই এই রোগী তারা রাখবে না। এমনই তথ্য দেয় ন্যাশনাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ছেলে শুভ্র (২৩) ও সজিব (২৫) হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে আরও বেশি কাহিল, বিধ্বস্ত হয়ে ওঠা মুমূর্ষু বাবাকে নিয়ে ছুটলেন এবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও একই আচরণ। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর মেডিকেলে সংশ্লিষ্টরা রোগীকে ভর্তি করাতে রাজি হলো ঠিকই। কিন্তু তাদের এক কথা, ভর্তি হতে হলে করোনা ওয়ার্ডেই হতে হবে। কিন্তু রোগীর ছেলেরা চাইছেন, অন্য কোনো ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করতে। একই মত রোগীরও। করোনা-ওয়ার্ডে ভর্তির কথা তো রোগী লাফ দিচ্ছেন, চিৎকার করে ওঠছেন। এরপরও করোনা ওয়ার্ড ছাড়া অন্য কোনো ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে রাজি নয় মেডিকেল সংশিষ্টরা। এক্সরে রিপোর্ট দেখে চমেকের ডাক্তারদেরও মত, রোগীর করোনা-পজিটিভের সম্ভাবনাটাই বেশি।

এ পরিস্থিতিতে রাত ১২ টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্য়ন্ত মুমূর্ষু শ্রীবাজ চৌধুরীকে নিয়ে তার দুই সন্তান শুভ্র আর সজিব চমেক হাসপাতালের পূর্ব গেইটের কাছে একটি সিএনজিতে বসে আছেন। তাদের দুচোখে ঘন অন্ধকার- এই মধ্যরাতে কোথায় যাবে বাবাকে নিয়ে, কোথায় মিলবে বাবার চিকিৎসা-কিছুই জানে না তারা।

শুভ্র ও সজিব চৌধুরীর সাথে টেলিফোনে কথা হয় একুশে পত্রিকার। শুভ্র জানান, ভাড়া করা অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে বাবাকে তারা সিএনজিতে বসিয়ে রেখেছেন সেই সন্ধ্যা থেকে। কিছুক্ষণ পর পর বাবা চিৎকার করে ওঠছেন। একটানা সাপোর্টে সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা চলবে অক্সিজেন। এরপর কী হবে? কোথায় অক্সিজেন, কোথায় চিকিৎসা! এই দীর্ঘ কালো রাতের শেষ কোথায়? আদৌ ভোর হবে কিনা জানে না তারা।

বাবাকে বাসায় নিয়ে যাবেন সে সুযোগও নেই। যত ভয় বাড়ির দারোয়ানকে।এই অবস্থা দেখলে বাড়ির দারোয়ান নিশ্চিত আটকে দেবে, কিছুতেই ঢুকতে দেবে না বাসায়। বলেই ফুফিয়ে কেদে ওঠেন সজীব।