মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

‘জেলার’ পরিচয়ে কাউন্সিলর, কারাপরিদর্শকদের সাথে প্রতারণার ফাঁদ!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মে ২৯, ২০২০, ৬:৪২ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মুজিবুর রহমান পরিচয় দিয়ে সম্প্রতি এক ব্যক্তি ফোন করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানুর কাছে। বর্তমান কারা পরিদর্শক ছাড়াও ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত টানা ৬ বছর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বেসরকারি পরিদর্শক ছিলেন রেহানা বেগম রানু।

সেই সময়টাতে চট্টগ্রাম কারাগারে ডেপুটি জেলারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেখলেই চিনবেন দাবি করে রানুর কাছে দুর্ঘটনায় আহত ভাতিজার চিকিৎসায় সহায়তা চান ওই লোক। বিষয়টি সত্য মনে করে সহায়তা করতে এগিয়েও যান রানু। কিন্তু পরক্ষণে একটি অভিনব প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছিলেন বুঝতে পেরে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।

পাঠক, কী ছিল সে প্রতারণার কৌশলটি, কিংবা কোন চরিত্রগুলো এতে জড়িত, সে বিষয়ে জানা যাক রেহানা বেগম রানু এবং তার পরিবারের আরেক সদস্যের সাথে প্রতারক চক্রের ফোনালাপ থেকে।

: আসসালামু আলাইকুম। আমি মুজিবুর রহমান। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার। ২০১১ সালে চট্টগ্রাম কারাগারে ডেপুুটি জেলার ছিলাম। আপনি তখন জেল ভিজিটর ছিলেন।

: জ্বি, কেমন আছেন? বলুন!

: না বলছিলাম, আমার এক ভাতিজা বন্ধুসহ চট্টগ্রাম বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে একসময় অনেকেরই ফোন নাম্বার ছিল আমার কাছে। এখন নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আপনার নাম্বারটি পেয়েছি। বিপদে পড়ে ফোনটা দিলাম। দয়া করে কিছু মনে করবেন না।

: না, না ঠিক আছে। কী বিপদ, কী সাহায্য করতে পারি বলুন!

: চকবাজার এলাকায় আমার ভাতিজা মোটর সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা রিক্সার সাথে ধাক্কা লাগে। রিক্সাটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, চালকও ব্যথা পায়। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হয় একটি সিএনজি। এ কারণে উত্তেজিত লোকজন আমার ভাতিজা এবং তার মোটর সাইকেল আরোহী বন্ধুকে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।একজনের পা ভেঙে গেছে। তাদের মানিব্যাগ, মোবাইল সব ছিনিয়ে নিয়ে স্থানীয়রা একটি দোকানে মোটর সাইকেলটি আটকে রেখেছে। বলেছে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মোটর সাইকেলটি ছাড়িয়ে নিতে। ভাতিজা ও তার বন্ধু এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আছে। তারা চট্টগ্রাম শহরে নতুন্। কিছুই চিনে না, জানে না। যদি সম্ভব হয় কাউকে একটু মেডিকেলে পাঠান। তারা যেন একটু চিকিৎসা পায়, সেই ব্যবস্থা করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

: ঠিক আছে, দেখি কী করা যায়! আপনার ভাতিজার নাম্বার দিন। অথবা উনাকে বলুন আমার নাম্বারে ফোন দিতে।

যথারীতি ভাতিজার নাম্বার দিলেন জেলার সাহেব। এবার রেহানা বেগম রানু নিজেই ফোন দিলেন জেলারের ভাতিজাকে।

: সিলেট কারাগারের জেলার মুজিবুর রহমানকে চিনেন? উনি আপনার কী হন?

: হ্যাঁ, উনি আমার কাকা।

: কী সমস্যা আপনার?

কয়েকদিন আগে প্রাইভেট কার নিযে রাঙ্গুনিয়ায় বন্ধুর বাড়িতে সিলেটের মৌলভীবাজার থেকে বেড়াতে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে পড়ার কথা জানিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য চান ভাতিজা।

: ঠিক্ আছে। মেডিকেলে আপনার বন্ধুকে ভর্তি করিয়ে দেন। চিকিৎসা চলতে থাকুক। আপনি চকবাজার থানায় যান, আমি ওসি সাহেবকে অনুরোধ করছি মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে আপনাকে যেন প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা দেন।

: না, মোটর সাইকেল এখন থাক। আগে বন্ধুর চিকিৎসাটা করি। আপনি পারলে চিকিৎসায় সহায়তা করুন।

এর মধ্যে রেহানা বেগম রানু ফোনটা তার পরিবারের এক সদস্যের হাতে দিয়ে বললেন, দেখ তো জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত কোনো মেডিকেল পুলিশকে বলে সাহায্য করা যায় কিনা।

– ঠিক আছে দাও। ফোনটা ধরেই তিনি শানেনুযুল বোঝার চেষ্টা করলেন ভাতিজার কাছ থেকে। ভাতিজাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, করোনায় থাবায় সারাবিশ্ব এখন স্তব্ধ। পুরো দেশ লকডাউন। করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ গৃহবন্দী। আর আপনারা এলেন প্রাইভেট কার নিয়ে ঘুরতে বন্ধুর বাড়িতে। ব্যাপারটা কেমন বেখাপ্পা না! মৌলভীবাজার থেকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আসতে আপনাদের কেউ আটকায়নি?

: আঙ্কেল কী করবো, ভুল করে যখন চলে এসেছি, এখন কী করা! বিপদ যেহেতু হয়ে গেছে এখন আমাদেরকে সম্ভব হলে উদ্ধার করুন।

: জরুরি বিভাগে কোনো পুলিশ দেখতে পাচ্ছেন?

: জ্বি, আঙ্কেল

: তাকে ফোনটা দিন

: আপনি কি মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত?

: জ্বি

: কী নাম আপনার?

: আবদুর রহিম

: মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়িতে এমন নাম তো আগে শুনিনি! যাই হোক, ইন্সপেক্টর জহির সাহেব আমাদের খুব আপনজন। যদি পারেন বিপদগ্রস্থ মানুষগুলোকে একটু সাহায্য করুন। আহত লোকটি যেন ওষুধ এবং চিকিৎসাসেবা পায়, একটু হেল্প করুন প্লিজ। নিশ্চয়ই এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবেন।

এরপর কথিত পুলিশ কনস্টেবল আবদুর রহিম জানালেন, ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে লোকটির চিকিৎসা চলছে। এখন কেবল দরকার ওষুধ। যে ওষধু বাইরে থেকে কিনতে হবে।

ইত্যবসরে রানুর কাছে কথিত জেলারের আবার ফোন। আপা, সঙ্কোচ লাগছে খুব, এই মুহূর্তে কাউকে দিয়ে কি মেডিকেলের জরুরি বিভাগে ভাতিজার হাতে ২০ হাজার টাকা পৌঁছানো যায়?

: ইফতারের বাকি আছে আর মাত্র ১৫ মিনিটি। এই মুহূর্তে আমি কাকে পাঠাই। তাছাড়া এত টাকা এই মুহূর্তে ঘরে আছে কিনা সেটাও একটা ব্যাপার।

: ১০ হাজার টাকা হলেও যদি অন্তত পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন! ইফতারের পর আপনাকে ২০ হাজার টাকা বিকাশ করছি আমি।

খটকা লাগলে তিনি ফোনটা ফের পরিবারের ও্ই সদস্যের হাতে তুলে দেন। এবার শুরু হলো তার সাথে জেলারের কথোপকথন।

: ভাই, টাকাটা আপনার আপার কাছে বিকাশ না করে সরাসরি আপনার ভাতিজার কাছে পাঠালে তো হয়!

: ভাই, ভাতিজা কিংবা তার বন্ধু কারো নাম্বারে বিকাশ অ্যাকাউন্ট নেই। একারণেই সমস্যা!

: মেডিকেলের পূর্ব গে্ইটে অসংখ্য বিকাশের দোকান, ভাতিজা একটি বিকাশ দোকানে গিয়ে নাম্বার পাঠালে তো হয়ে যায়।

: ভাই তাও দেখা হেয় গেছে। লকডাউনের কারণে বিকাশ থেকে শুরু করে সব দোকানপাট বন্ধ। পরিচয় আছে বলে অনন্যোপায় হয়ে আপাকে ফোন দিয়েছি। কাউকে যদি একটু পাঠান অথবা কষ্ট করে আপনি যদি যান তারা একটু সাহস পাবে। সে কারণেই বিরক্ত করছি বারবার।

এরপর আবার ফোন দিয়ে কথিত মুজিবুর রহমান জানতে চান এই নাম্বারটি বিকাশ কিনা। বিকাশ নাম্বার জেনে বললেন, ঠিক আছে আমি ২০ হাজার টাকা পাঠাচ্ছি। জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ কেনার জন্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দিন। এরপর ভাতিজা সাব্বির ফোন দিয়ে জানান, তারা এখন ফার্মেসিতে, ৪ হাজার ৭শ’ টাকা ওষুধের মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন না। কাকা বলেছেন বিষয়টা আপনাকে জানাতে।

ভাতিজাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কোন ফার্মেসিতে আছেন। বললেন আজাদ ফার্মেসী। দেন ফার্মেসির কাউকে। এরপর ফোনটা নিয়ে একজন চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, ভাই আমি আজাদ ফার্মেসীর মালিক আজাদ বলছি। বাড়ি আতুরার ডিপো। ওষুধের দাম কতো জানতে চাইলে বললেন, ৩ হাজার ৬শ’ টাকা। বিপদে পড়েছে, পরিচয় নেই, তবুও এর আগে ১৮ শ’ টাকার ওষুধ দিয়েছি বাকিতে, একজন ম্যানেজার হয়ে আর কতো বাকি দিতে পারে বলুন! একটু আগে মালিক, এখন ম্যানেজার। সবকিছুই আওলাঝাওলা, অগোছালো।

এরপর আজাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় তার নাম্বারটি বিকাশ কিনা। ‘হ্যাঁ সুচক’ জবাবের পর ফোনটা ভাতিজা সাব্বিরকে দিতে বলা হয়। জ্বি আঙ্কেল বলতেই তাকে বলা হলো, ফার্মেসি ম্যানেজারের নাম্বারটিতে বিকাশ অ্যাকাউন্ট আছে। আপনার জেলার কাকাকে বলুন সেই নাম্বারে আপনার চাহিদা মতো টাকা পাঠাতে। এর মধ্যেই পরিস্কার হয়ে যায় বিষয়টি নয়-ছয়ে ভরা, প্রতারণার নতুন ফাঁদ।

এরপর সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও একাত্তর টেলিভিশনের সিলেট ব্যুরো প্রধান ইকবাল মাহমুদের শরণাপন্ন হলে তিনি জানান, মুজিবুর রহমান নামে সিলেটে একজন জেলার আছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি এভাবে প্রতারণার ফাঁদ পাতার কথা নয়।

এরপর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রকৃত জেলার মুজিবুর রহমান জানালেন, তার নাম এবং পদবী ব্যবহার করে এক লোক প্রতারণা করছেন বলে এর আগেও অভিযোগ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু যখনই ফোন করা হয় ফোনটি হয় বন্ধ থাকে, অথবা রিং পড়ে, কিন্তু রিসিভ করে না।

পরদিন জেলার মুজিবুর রহমান পরিচয় দেওয়া নাম্বারে (০১৭১৫৮৯৩৭৮৪) ফোন করা হলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। একইভাবে ভাতিজা পরিচয় দেওয়া নাম্বারটি (০১৮৯০ ৪৩৫২৫৮) রিসিভ হলেও কথা বলেন আরেকজন অথবা সুর বদলিয়ে একই ব্যক্তি । আগেরদিনের কাহিনীর কথা তুললে ফোনের ওই প্রান্তের লোকটি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। এক পর্যায়ে বলেন, তার সিমটি হারিয়ে গিয়েছিলো। আজ রিপ্লেস করেছেন, তাই এই সিম দিয়ে কে কথা বলেছে তার জানা নেই।

এরপর আগ বাড়িয়ে চট্টগ্রামের ভাষায় বলেন, আমি সজিব, হাসেম মাস্টারের ছেলে। বাড়ি আতুরার ডিপো। কাউন্সিলর মোবারকের এলাকায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অনার্স পড়েন্, ফার্স্ট ইয়ার। কোন সাবজেক্ট্ জানতে চাইলে বলেন, ফার্স্ট ইয়ার।

আবার জানতে চাওয়া হয়, কোন সাবজেক্ট? এবার বলেন, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার। মুহূর্তের মধ্যে দুইরকম কথা কেন? আমি চোর নাকি ডাকাত, না অপরাধী- বলেই উল্টো ঝারি মারার চেষ্টা। বলেন, আমি যেহেতু কোনো অপরাধ করিনি, আমার কোনো ভয় নেই। আপনি বলুন আমি কোথায় আসবো, সামনাসামনি বসে কথা বলি। এরপর আগ্রাবাদে অবস্থান জানিয়ে একঘণ্টার মধ্যে ২ নং গেইট এলাকায় আসার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, সেই ফোনটিই বন্ধ।

এধরনের কোনো প্রতারক চক্রের কোনো সন্ধান আছে কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ঠিক একই রকম কেস স্টাডি নয়, আরেকটু ভিন্ন প্যাটার্নের প্রতারক চক্রের ব্যাপারে সম্প্রতি কয়েকটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। এই প্রতারক চক্রের বিষয়টিও পাঠান। দেখি তাদেরকে ধরা যায় কিনা।

এদিকে, এ প্রতিবেদন তৈরির শেষপর্যায়ে শুক্রবার সকালে ভুক্তভোগী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানুর কাছে আকস্মিক ফোন করেন ডবলমুরিং থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলাম। তিনি জানতে চান, সিলেট কারাগারের জেলার মুজিবুর রহমান পরিচয়ে কেউ তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল কিনা, কিংবা প্রতারিত হয়েছেন কিনা।

কেন হঠাৎ এই প্রশ্ন, কে জানিয়েছে আপনাকে? রানুর এমন জিজ্ঞাসায় এসআই জহির জানান, চট্টগ্রামের আরো কয়েকজন কারাপরিদর্শক, সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের সাথে আহত ভাতিজার চিকিৎসার কথা বলে প্রতারণা করতে চেয়েছিল চক্রটি। একজন কারাপরিদর্শক থেকে তো ৩০ হাজার টাকা হাতিয়েও নিয়েছে তারা। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুসন্ধানে নেমে দেখি কললিস্টে আপনার মোবাইল ফোন নাম্বার। অর্থাৎ আপনাকেও চক্রটি ফোন দিয়েছিল। এরপর রানু বিষয়টি তাকে শেয়ার করেন।