১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, শনিবার

নগরীতে প্রসাধনী বিক্রির নামে সক্রিয় মহিলা রুমালপার্টি

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ৬, ২০১৮, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ

উজ্জ্বল দত্ত : ১১ মার্চ, সময় দুপুর ১২টা। পাহাড়তলী সরাইপাড়া আবাসিক এলাকার গৃহিণী জোবাইরা খাতুন। স্বামী আর দুই ছেলে তখন চাকরিতে। জোবাইরা খাতুন প্রতিদিনের মত নানা গৃহস্থালি কাজ নিয়ে বাসায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এমন সময় এক মহিলা প্রসাধনী বিক্রেতা হাঁকতে হাঁকতে তার ঘরের দরজায় এসে হাজির। আপা কসমেটিকস লইবেননি? ভাল শ্যাম্পু, ফেয়ার এন্ড লাভলী, ফেস ওয়াস, নেইল পালিস লাগবনি আপা? অনিচ্ছা সত্ত্বেও মহিলার নানা সাজানো কথায় মজে জোবাইরা তাকে বসতে দেন। তারপর বিক্রেতা তার কাছ থেকে একটু পানি খেতে চাইলেন।

পানি খেতে খেতে ঐ বিক্রেতা মহিলা জোবাইরার সাথে নানা আলাপ জুড়ে দেয়। সহজসরল জোবাইরা খাতুনকে বিক্রেতা নানা প্রসাধনী সামগ্রী দেখানোর ফাঁকে সুযোগ বুঝে তার নাকে রাসায়নিক দ্রব্য মাখানো রুমাল শুঁকিয়ে দেয়। কিছু বুঝে উঠার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে জোবাইরা খাতুন। তারপর যা ঘটার তাই ঘটে। অজ্ঞান জোবাইরার আঁচল থেকে চাবি নিয়ে ঐ মহিলা আলমারি খুলে সোনার অলংকার, টাকা-পয়সা সব নিয়ে চম্পট দেয়।

ঘটনা-২
২৭ মার্চ আন্দরকিল্লা সাব এরিয়া এলাকা। বিকেল ৩টার সময় জয়নাব কলোনির ইউ বিল্ডিংয়ের ৫ম তলায় ঘটে একই ঘটনা।প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রেতা সেজে জনৈক শ্রাবণী ঘোষের টাকাপয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, প্রসাধনী সামগ্রী, শাড়ি, কাপড়চোপড় চুরি করে নিয়ে পালায় মহিলা রুমাল পার্টির আরেক সদস্য। এক্ষেত্রেও ঐ বিক্রেতা মহিলা সিংগেল ফ্যামিলির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভিকটিমের নাকে রুমাল চেপে তাকে অজ্ঞান করে ফেলে। তারপর সর্বস্ব লুটে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মহিলা রুমাল পার্টির খপ্পরে পড়ে অনেক গৃহিণী সর্বস্ব হারাচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের বিবরণ অনুযায়ী, নগরীর পাহাড়তলী, সরাইপাড়া, মৌসুমি আবাসিক এলাকা, লেকভিউ, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, চান্দগাঁও, হিলভিউ, সুগন্ধা আবাসিক এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই মহিলা রুমালপার্টির সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। মূলত সিংগেল ফ্যামিলিকে টার্গেট করে রুমালপার্টির সদস্যরা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারপর সুযোগ বুঝে বাসাবাড়িতে একা থাকা গৃহকর্ত্রীর নাকে রাসায়নিক দ্রব্য মাখানো রুমাল চেপে অজ্ঞান করে জিনিসপত্র লুটে পালিয়ে যায়। গৃহকর্ত্রীদের সহজ সরলতা এবং সচেতনতার অভাবেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে এখন একটা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। একদিকে সরকার নারীর ক্ষমতায়নে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছেন। যে কোনো মানদন্ডে বিচার করলেই এদেশে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আবার অপরদিকে যোগ্য মহিলাদেরকে যোগ্যতর স্থানে নিয়োজিত না করে সেখানে অযোগ্য মহিলাকে পদায়ন করা হচ্ছে অর্থলিপ্সা, ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ বা কাছাকাছি যাওয়ার জন্য অনেকেই অনেকভাবে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এতে করে আমাদের সামাজিক পরিবেশে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি বলেন, মনীষি কার্ল মার্কস’র “ফলস কনসাসনেস”-এ বলা হয়েছে- আমরা ভুল সচেতনতায় জড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজেদেরকে সচেতন দাবী করলেও আসলে কতটুকু সচেতন, কেমন সচেতন তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। যেমন ধরুন- ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব।’ কিন্তু আপনার মূল্যবান ভোটটি আপনার পছন্দসহ ব্যক্তিকে প্রদান করা যেমন আপনার নাগরিক দায়িত্ব, তেমনি আপনার পছন্দসই ব্যক্তি আপনার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে আপনার জন্য, দেশের জন্য কতটুকু নিবেদিত হবেন, কতটুকু কাজ করবেন-তাও আপনাকে চিন্তা করতে হবে।

তিনি আবার প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলেন, যে কথাটি বলছিলাম; এ সংকটময় মুহুর্তে আবার কোনো একটি চক্র কিছু কথিত শিক্ষিত, সুন্দরী, স্মার্ট মহিলাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে গ্রুপ গঠন করে অপরাধ কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন সাফল্যকে ম্লান করার জন্য কিন্তু কথিত মহিলা গ্রুপগুলোর এ ধরনের কার্যক্রম যথেষ্ট নেতিবাচক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আমাদেরকে এগুলো ট্রেস (চিহ্নিত) করতে হবে।

এ বিষয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো. শহীদুল্লাহ বলেন, এখনো মহিলা রুমালপার্টির সদস্যদের ব্যাপারে আমাদের কাছে অভিযোগ আসেনি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। এ ধরনের প্রতারণামূলক নানা অপকর্ম নগরে চলছে। তবে আমাদের নিজেদেরকে নিরাপদ রাখা আমাদেরই দায়িত্ব। আমাদেরকে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।’