২৩ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬, সোমবার

লুঙ্গি পরেই অস্ট্রেলিয়া যাবেন চট্টগ্রামের আবুল বাবুর্চি

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ১১, ২০১৮, ১২:১৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এবার অস্ট্রেলিয়ায় ডাক পড়লো চট্টগ্রামের আবুল বাবুর্চির। আগামী ২৮ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠেয় মেজবানে রান্না করবেন তিনি। বাঙালির শাশ্বত উৎসব বৈশাখ উপলক্ষে ৪ হাজার মানুষের মেজবানের আয়োজন করেছে সিডনিস্থ বাংলাদেশ সমিতি।

এ উপলক্ষে ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম ছাড়ার কথা রয়েছে তাঁর। সংগঠনের পক্ষ থেকে আবুল বাবুর্চির অস্ট্রেলিয়া গমনের আনুষ্ঠানিকতা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে জানাতে নগর-ভবনে উপস্থিত হয়েছিলেন আবুল বাবুর্চি। মেয়র সাধুবাদ জানান, অভিনন্দিত করেন আবুলকে।

বলেন, খুব ভালো খবর। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের সুখ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই আবুল বাবুর্চিরাই মূলত ঘাম ঝরিয়েছেন। তাদের বিশেষ রন্ধনশৈলীর কারণে বিশ্বজুড়ে ‘চট্টগ্রামের মেজবান’ আজ বিশেষ স্বকীয়তা লাভ করেছে। এটা আবুল বাবুর্চির প্রাপ্য।

এসময় আবুল বাবুর্চির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে গিয়ে কিছুটা রসবোধেরও জন্ম দেন মেয়র। বলেন, আবুল এখন অনেক ব্যস্ত বাবুর্চি। আমার মতো মেয়রকে কিনে নেওয়ার ক্ষমতা আছে তার। শুনে মেয়র-কক্ষে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মাঝে হাসির রোল পড়লেও লাজুকতা পেয়ে বসে আবুলের।

স্মিত হেসে আবুল বলেন, মাননীয় মেয়র- আপনাকে আমি কেন, পৃথিবীর কেউ কিনতে পারবে না। এটা আপনার উদারতা, ভালোবাসা। আমাদের ভালোবাসেন বলে এভাবে বলছেন।

আবুল বাবুর্চির প্রিয় পোশাক লুঙ্গি। লুঙ্গি পরে রান্নার কাজে সারাদেশ ঘুরে বেড়ান তিনি। সে প্রসঙ্গ টেনে মেয়র তাকে লুঙ্গি পরে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, চট্টগ্রামের মেজবানের যেমন ঐতিহ্য, তেমনি লুঙ্গিও আদিকাল থেকে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ঐতিহ্যের পোশাক। আপনার মধ্যদিয়ে একসঙ্গে চট্টগ্রামের দুটি ঐতিহ্যই বিশ্বদরবারে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠুক।

আবুল বাবুর্চিও দেরি করেননি। লুঙ্গি পরে অস্ট্রেলিয়া যাবার ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের কথা সঙ্গে সঙ্গে মেয়রকে জানিয়ে দেন।

১৯৮০ সাল থেকে বাবুর্চি পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন শহরের কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল বাবুর্চি। প্রয়াত বাবা খলিলুর রহমান নামকরা বাবুর্চি ছিলেন। বাবার কাছেই হাতেখড়ি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পেশাকে কেবল জীবন-জীবিকার মাঝে সীমাবদ্ধ থাক তা চাননি, যোগ করেন অন্যরকম এক মাদকতা।

বলাবাহুল্য, মেজবানের মাংস অনেকেই রান্না করেন। কিন্তু আবুল বাবুর্চির মেজবানের মাংস মানে বাড়তি কিছু, জিভে জল আসা কিংবা অনেকক্ষণ ধরে লেপ্টে থাকা ‘স্বাদ’।

বলা যায়, চট্টগ্রামের রান্নার জগতে একচ্ছত্র শাসন, বিচরণ তাঁর। বিয়ে-মেজবান, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান প্রায় সব অনুষ্ঠানে নিয়মিত তার ডাক পড়ে। প্রায় সবধরনের রান্নাই করেন। তবে আলাদা বিশেষত্ব আছে মেজবানি মাংস ও কাচ্ছি রান্নায়। যে কোনো অনুষ্ঠানে তিনি অর্ডার নেন না। পছন্দ না হলে অর্ডার ফিরিয়ে দেন। ৩০ দিনে বেছে বেছে ২০টির মধ্যে অনুষ্ঠান করেন। এরমধ্যে মেজবানের সংখ্যাই বেশি।

আবুল বাবুর্চি জানান, ৩ থেকে ৫ মন মাংসের একটি গরুর মাংস রান্নায় ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নেন তিনি। ২ থেকে সর্বোচ্চ একশ’ গরুর মেজবানেও তিনি রান্না করেছেন। এধরনের প্রতি গরুর মাংস রান্নায় তাঁর সহকারি হিসেবে কাজ করে ৫ থেকে ৬ জন। ১০ গরুর রান্নায় অন্তত ৫০ জন সহকারি আবুল বাবুর্চির ফুট-ফরমায়েশ খাটে।

অস্ট্রেলিয়ায় ৪ হাজার মানুষের রান্নার জন্য সহকারি কোথায় পাবেন, আপনি তো একা যাচ্ছেন? আয়োজদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকেই সার্বক্ষণিক ২০ জন রান্নার কাজে আমার পাশে থাকবে, সমর্থন জোগাবে। বলেন আবুল বাবুর্চি।

অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিসা প্রসেসিং, বিমান টিকেট, অস্ট্রেলিয়া ৭দিন থাকা-খাওয়া সব মিলিয়ে আমার পেছনে একটা বড় অংকের টাকা খরচ করছে আয়োজকরা।তাই পারিশ্রমিক বা সম্মানির বিষয়টি এখানে সে অর্থে আসবে না।

কত মানুষের রান্নায় উপাদান কী হবে, কেমন হবে- এসবের উপর রান্নার স্বাদ নির্ভর করে। এক্ষেত্রে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করি না। তাই যাবার সময় দেশ থেকেই ৪ হাজার মানুষ-উপযোগী মেজবানের রান্নার ‘রসদ’ সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।–বলেন আবুল বাবুর্চি।

আবুল বাবুর্চির মতে, পৃথিবীতে কোনো কাজ কিংবা পেশাই ছোট নয়। আমরা যে যেই কাজই করি না কেন, তাতে যদি সাধনা থাকে, আন্তরিকতা থাকে তাহলে অবশ্যই সাফল্য আসবে, সমাজে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে ওঠবেই। জীবনে কল্পনা করিনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমি আমন্ত্রণ পাবো, সেখানে গিয়ে রান্না করতে হবে। বাস্তবে আজ তাই ঘটছে। বলেন আবুল বাবুর্চি।

এটি/একুশে