২৭ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, মঙ্গলবার

চট্টগ্রামে খুনের ঘটনা বাড়ছে কেন

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩, ২০১৯, ১১:২১ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বিভাগে খুনের ঘটনা বেড়েছে। পুলিশের হিসাবে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৫৪টি; ২০১৮ সালে খুনের ঘটনায় মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৮টিতে। সে হিসেবে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে খুনের মামলা বেড়েছে ৯৪টি।

পুলিশ বলছে, কোন কারণে বছরে ঠিক কতগুলো হত্যার ঘটনা ঘটে, এ ধরনের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা হয় না। তবে গত এক বছরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও অন্তর্কলহের কারণে উল্লেখযোগ্য খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এর বাইরে স্বজনের হাতে আরেক স্বজনের খুনের ঘটনা বাড়ছে; কোথাও স্বামী হত্যা করছেন স্ত্রীকে, কোথাও স্ত্রীর হাতে খুন হয়ে যাচ্ছেন স্বামী। ছেলের হাতে বাবা অথবা মা, একইভাবে বাবা কিংবা মায়ের হাতে সন্তান, ভাইয়ের হাতে ভাই হত্যার মতো অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের হিসাবে চট্টগ্রাম বিভাগে ২০১৮ সালে খুনের মামলা হয়েছে ৭৪৮টি। এর মধ্যে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অধীন ১১টি জেলায় খুনের মামলা হয়েছে ৬৭৮টি। এ ছাড়া গত বছর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের আওতাধীন ১৬ থানা এলাকায় ৭০টি হত্যা মামলা হয়েছে।

এর আগে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরে ৬৬টি খুনের মামলা দায়ের হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অধীন ১১ জেলায় একই বছর ৫৮৮টি হত্যা মামলা হয়েছিল। সে হিসেবে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ৯৪টি খুনের মামলা বেশি দায়ের হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে।

খুনের ঘটনা বাড়ছে কেন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার, অসচ্ছলতা, সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, সহনশীলতার অভাব, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা- ইত্যাদি কারণে ঘটছে খুনের ঘটনা।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা-দক্ষিণ) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দরিদ্রতা হলো অপরাধের প্রধান কারণ। দরিদ্রতার কারণে যে চাহিদা বা ইচ্ছে থাকে সেগুলো পূরণ হয় না। এজন্য মানুষ হতাশ হয়ে যায় এবং অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে।’

অপরাধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ‘সঙ্গদোষ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের সঙ্গে চলাফেরা করি তাদের একটা প্রভাব সবসময় আমাদের মধ্যে থাকে। এখন কেউ যখন খারাপ মানুষের সঙ্গে মিশে তখন সঙ্গদোষের কারণে সে অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। ওই খারাপ ব্যক্তি তাকে আরো খারাপ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেও উৎসাহিত করতে পারে।’

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে পাল্টাপাল্টি খুনের ঘটনা। গত বছর খুনের শিকার হয়েছেন রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা এবং ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ৫ পাহাড়ি।

এ নিয়ে থমথমে পাহাড়ের পরিস্থিতি। জনমনে ভর করেছে নানা শঙ্কা, ভয় ও আতঙ্ক। আঞ্চলিক রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক খুনোখুনি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

জানা গেছে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে চারটি। এগুলো হলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। এসব দলের নেতাকর্মীরা মরিয়া পাহাড়ে আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে। এ নিয়ে চলছে খুনের বদলা খুন। গত দুই দশকে প্রাণ হারিয়েছে এসব দলের প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক।

রাঙামাটি জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, মূলত চাঁদার লোভেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনের আড়ালে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের সবকটি সংগঠন। হানাহানি, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে তারা। নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতও থেমে নেই। তবে সন্ত্রাস দমনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তৎপর রয়েছে।

এদিকে চুরি-ছিনতাই বা ঘর পালানোর মতো অপরাধ পেছনে ফেলে কিশোরদের খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি, ১৭ জুন, ১৮ জুন, ২১ মে ও ২৭ মে চট্টগ্রাম নগরে অন্তত পাঁচটি খুনের ঘটনায় কিশোরদের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা-বন্দর) আসিফ মহিউদ্দীন বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই কিশোরদের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতার অভাব আছে। তারা যে অপরাধ করছে, এই অপরাধের ফলে কী হবে সেটা তারা চিন্তা করছে না। কথিত ‘বড় ভাইদের’ কথায় অসংখ্য কিশোর অপরাধে জড়িয়ে নিজেদের জীবন নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলছে।’

বর্তমান প্রজন্মের কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করতে বাবা-মায়েরা ব্যর্থ হচ্ছেন মন্তব্য করে আসিফ মহিউদ্দীন বলেন, পারিবারিক বন্ধনটা ভালো না হলে একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক কিশোর অপরাধী ধরার পর তাদের বাবা-মায়েরা আমাকে বলেছেন, তাদের দোষের কারণে সন্তান অপরাধে পা বাড়িয়েছে। তারা সন্তানের খোঁজ-খবর রাখতেন না।’

মোবাইল ও ইন্টারনেট- কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখছে বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তা আসিফ মহিউদ্দীন; তিনি বলেন, ‘হাতে হাতে এখন ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। কিন্তু ইন্টারনেট দিয়ে ভালো ও গঠনমূলক কাজ অনেক সময় করছে না কিশোররা। ইন্টারনেটের অপব্যবহারজনিত কারণে কিশোরদের অপরাধ হচ্ছে অনেক বেশি।’

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘নানা কারণে খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুনের ঘটনায় পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এতে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হয় না। জড়িতদের বেশিরভাগই ইতোমধ্যে আইনের আওতায় এসেছে।’

একুশে/এসআর/এটি