১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫, বুধবার

তৃণমূল থেকে তথ্যমন্ত্রী

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ রবিবার, জানুয়ারি ৬, ২০১৯, ১১:১৮ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : খ্যাতিমান পরিবেশবিদ হিসেবে সুপরিচিত ড. হাছান মাহমুদ এমপি এবার সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাচ্ছেন। সরকারের নতুন মন্ত্রীসভায় পেয়েছেন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব।

স্কুল জীবনেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া তৃণমূলের এই নেতা সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তথা দেশ এবং বিদেশেও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে প্রশংসিত হচ্ছেন। উত্তাল ছাত্ররাজনীতির পাঠ চুকিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ১৯৯২ সালেই বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে যান মেধাবী এই রাজনীতিক। সেখানে ভর্তি হন ইউরোপের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসে।

শিক্ষা জীবনে ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক পাশ করা এই রাজনীতিক দেশে-বিদেশে মোট তিন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী ও পরিবেশ রসায়নে পিএইচডি ইন সায়েন্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনঅর্গানিক কেমিষ্ট্রি (রসায়ন) বিষয়ে প্রথম মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করা হাছান মাহমুদ ১৯৯৬ সালে বেলজিয়ামের ভ্রীজে ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাসেলস থেকে হিউম্যান ইকোলজি (পরিবেশ বিজ্ঞান) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। একই সালে বেলজিয়ামের আরেক নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্টান ইউনিভার্সিটি অব লিবহা দু ব্রাসেলস থেকে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স বিষয়ে মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।

২০০১ সালে বেলজিয়ামের লিম্বুর্গ ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাম থেকে পরিবেশ রসায়ন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন দেশের বর্তমান সময়ের মেধাবী রাজনীতিক ড. হাছান মাহমুদ। ১৯৯৩ সালে ব্রিজে ইউনিভার্সিটির সমস্ত বিদেশী ছাত্রদের স্টুডেন্ট ফোরাম “International Student’s Association of VUB”-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পাশাপশি বেলজিয়াম আ.লীগকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। নির্বাচিত হন বেলজিয়াম আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক। এসময় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।

ছাত্র জীবনে তিনি প্রথমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের জামালখাঁন ওয়ার্ড ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৮ সালের শেষার্ধে চট্টগ্রাম সরকারী ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৮১ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন। পরে ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তুখোর বক্তা হাছান মাহমুদ। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে নব্বই দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য বিপুল বিজয় লাভ করেন।

সেই নির্বাচনের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে নিবার্চনে প্রার্থী হতে না পারলেও তিনিই ছিলেন সেই নিবার্চনে সমস্ত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও ছাত্রদলের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। আশির দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন মেধাবী এই নেতা। ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মনোনীত হন হাছান মাহমুদ।

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী জরুরি অবস্থায় যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে সামরিক সমর্থিত সরকার গ্রেফতার করেন তখন ড. হাছান মাহমুদ দলীয় সভাপতির মূখপাত্র হিসেবে অকুতোভয়ে কাজ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীর পক্ষে গণমাধ্যমে সরব ভূমিকা পালন করায় দেশ জুড়ে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রাজনীতিক হিসিবে পরিচিতি পান। তখন থেকেই তাঁর সাহসী ভুমিকা দলের সকল কর্মী ও সমর্থকদের দ্বারা অত্যন্ত প্রশংসিত হয়ে আসছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রশংসিত ড. হাছান মাহমুদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করছেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে। এর আগে পরিবেশ বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ স্টাডিস বিষয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন তিনি। ইউরোপীয়ান ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রেটেজিক স্টাডিস, ব্রাসেলস, বেলজিয়ামে ভিজিটিং ফেলো এবং একাডেমিক বোর্ড মেম্বার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন বরেণ্য এই শিক্ষাবিদ।

চট্টগ্রামের খ্যাতিমান আইনজীবী প্রয়াত নুরুচ্ছফা তালুকদারের জ্যৈষ্ঠ সন্তান ড. হাছান মাহমুদের জন্ম ১৯৬৩ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামে। তার বাবা চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং দুই মেয়াদে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাবলিক প্রচিকিউটর ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ড. হাছান মাহমুদ দুই কন্যা ও এক ছেলের জনক। রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছেন তিনি।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার মৌলবাদী অপশক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি কয়েকবার তার প্রাণনাশেরও চেষ্টা চালিয়েছিল মৌলবাদি গোষ্ঠি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। ২১শে আগষ্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এখনো ৪০টির মতো স্পিলন্টার তার শরীরে সে হামলার দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলছে। কিন্তু কোন রক্তচক্ষু হাছান মাহমুদকে তার সংগ্রামের পথ থেকে পিছু হটাতে পারেনি। ড. হাছান মাহমুদের মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার এমন সমন্বয় বর্তমান সময়ে খুব কম সংখ্যক রাজনীতিবিদের মধ্যেই দেখা যায়।

স্কুল জীবন থেকেই একজন সুবক্তা হিসেবে পরিচিত প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক ড. হাছান মাহমুদ চট্টগ্রামের সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বিতর্ক টিমের ক্যাপ্টেনের দায়িত্বও পালন করেন। স্কুলে পড়াকালীন তিনি বয় স্কাউটের দলনেতা এবং জুনিয়র রেডক্রস টিমেরও সদস্য ছিলেন। ১৯৮৭ সালে জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল বিতর্ক দলের দলনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ আসনে বিএনপির তৎকালীন হেভিওয়েট নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন হাছান মাহমুদ। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন এই আসন থেকে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্টিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী আংশিক) সংসদীয় আসনে পুনরায় হ্যাট্রিক বিজয় অর্জন করেন হাছান মাহমুদ। প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীকে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৩৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সৎ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এ রাজনীতিক।

এরপর আবারও পূর্ণমন্ত্রী হলেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। এবার চট্টগ্রাম-৭ আসনের এ সংসদ সদস্য একাদশ জাতীয় সংসদে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশে ফিরে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরে যোগ দেন আওয়ামীলীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে। অল্পদিনের মধ্যেই ২০০২ সালে আওয়ামীলীগের সম্মেলনে তিনি দলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সে দায়িত্ব পালন করেন ড. হাছান মাহমুদ। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামীলীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বস্ততার সাথে। এরপর ড. হাছান মাহমুদ পরপর দুই কমিটিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সাথে। বর্তমানে প্রচার সম্পাদকের পাশাপাশি দলের অন্যতম মূখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একজন খ্যাতিমান পরিবেশবিদ হিসেবে সুপরিচিত ড. হাছান মাহমুদকে ২০১৫ সালের ৫ই অক্টোবর, “গ্রীন ক্রস ইন্টারন্যাশনাল” তাদের সাধারণ অধিবেশনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় তাঁর শক্ত ও জোরালো ভূমিকার জন্য “সার্টিফিকেট অব অনারেবল মেনশনে” ভূষিত করেন (এটি গ্রীন স্টার পুরস্কারেরই একটি অংশ)।

২০০৯ সালের মহাজোট সরকারের প্রথম ছয় মাস পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দক্ষতার সাথে। দশম সংসদে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয় হয়েছে এবং হচ্ছে।

এরইমধ্যে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে একজন খ্যাতিমান পরিবেশবিদ হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠেন তিনি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন গুলোতে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিজনিত বিষয়াবলী বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে জলবায়ু মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি ধনী রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হাছান মাহমুদ। পরিবেশে অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক গ্রিন স্টার পদকেও ভূষিত হন এই আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞানী।

একুশে/এসআর/এটি