২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫, রবিবার

এক গ্রামের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধার গল্প

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১০, ২০১৯, ৮:০২ অপরাহ্ণ


মামুনুল হক চৌধুরী : এডভোকেট মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)। ছোটবেলা থেকে নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল তাঁর মধ্যে। স্কুলে পড়ার সময় ভোটে নির্বাচিত হন ছাত্র প্রতিনিধি। পরে নিজামপুর কলেজ ছাত্রলীগের নির্বাচিত প্রথম সাধারণ সম্পাদক। মাত্র ১৯ বছর বয়সে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী; সীতাকুণ্ডের কুমিরা কাজীপাড়া গ্রাম থেকে তিনিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা।

একাত্তরে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয়া মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী নতুন আদালত ভবনের নিজের কার্যালয়ে খোলেন যুদ্ধদিনের স্মৃতির ঝাঁপি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের প্রেক্ষাপট, প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাওয়া, নিজের বেড়ে উঠা- এসব কথাই উঠে এলো মুক্তিযোদ্ধা মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতিচারণায়।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা দুই ভাই। বড় ভাই লেবার অফিসার ছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবা সৈয়দ আহমেদ চৌধুরীকে হারান ফখরুদ্দিন চৌধুরী। জন্মস্থান সীতাকুণ্ডের কাজীপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ভর্তি হন জেল স্কুল হিসেবে পরিচিত মছজিদ্দা উচ্চ বিদ্যালয়ে।

ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দুরন্ত, দুষ্ট প্রকৃতির ছাত্রদেরকে আবাসিক স্কুলটিতে ভর্তি করিয়ে দিতেন অভিভাবকরা। সেখানে ছাত্রদের পায়ে শিকল লাগিয়ে ক্লাস করানো হত। ওই স্কুলে একবার ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের আয়োজন করেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক এম.এ মামুন। তখন নবম শ্রেণীতে পড়ছিলাম আমি; উক্ত নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। আবু নাসের তখন সভাপতি হন; তিনি পরে জাতীয় পার্টির আমলে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান হন।’

১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে নিজামপুর কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে। ওই এলাকার প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি ছিল। তবে ছাত্রলীগের কোন শাখা বা কমিটি ছিল না। ছাত্র ইউনিয়নের ইউনিট ছিল, তারা সক্রিয় ছিল। একই বছর প্রথমবারের মত নিজামপুর কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। এতে আবুল হোসেন সভাপতি ও ফখরুদ্দিন চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরের বছর ৬ দফা আন্দোলনের সাথে ১১ দফা যুক্ত হয়ে শুধু মিরসরাই নয়, পুরো বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে।

১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে ১১টি ছাত্র সংগঠন ছিল। মিরসরাইয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কমিটি হলে নিজামপুর কলেজ ছাত্রলীগের সম্পাদক হওয়ায় পদাধিকার বলে সেখানে নির্বাহী সদস্যের দায়িত্ব পান ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তখন থানা ছাত্রলীগের কার্যক্রম অতটা ব্যাপক ছিল না।

একজন ছাত্রনেতার চোখে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে অনেক সচেতন ছিলাম তখন। যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই আমাদের মনে বৈষম্যগুলো দাগ কাটত। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই আমরা মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম।’

পাকবাহিনী আমাদের নিরীহ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল পঁচিশে মার্চের কালো রাতে। অসংখ্য মানুষকে সেদিন তারা হত্যা করেছিল নারকীয় কায়দায়। তখন সারাদেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় শুরু হলো। স্বাধীনতার ডাক পড়ে গেলো, সবাই যে যার মতো করে মুক্তিসংগ্রামে যোগ দিলো। ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা এবং তার পরের গণহত্যা দেখে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আমরা ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। সঙ্গী হন কলেজ ছাত্রলীগের সহ সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র সাহা। এপ্রিলের দিকে শুভপুর ব্রীজের উত্তরে ছাগলনাইয়ার দিক দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের শ্রীনগর গেলাম।’

শ্রীনগর বাজারের পাশে তখন যুবকদের একটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল। সেখানে দুজন পরিচালক ছিলেন। একজন হচ্ছেন- ওবায়দুল হক, আরেকজন ব্যারিস্টার নুরুল আবছার। ১৯৭৯ সাধারন নির্বাচনে ওবায়দুল হক মীরসরাই আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য হন। ফখরুদ্দিন বলেন, ‘আমরা সে ক্যাম্পে প্রথম ট্রেনিং নিয়েছি। ক্যাম্পটি টিনের ছাউনী বেড়ার ঘর ছিল। সেখানে ৭ দিন প্রশিক্ষণের পর প্রতিজনকে দুটি করে ভারতীয় গ্রেনেড দেয়া হয়। আর সাতজনকে নিয়ে একটি স্কট তৈরী করে প্রতিজনকে একটি ভারতীয় স্টেনগান দেয়া হয়। সাতজনকে ১৪টা গ্রেনেড আর একটা স্টেন গান। এসব দিয়ে বলা হল, তোমরা এলাকায় চলে যাও, ওখানে যুদ্ধ কর।’

প্রশিক্ষক ওবায়দুল হক ভাসানীপন্থি ন্যাপের রাজনীতি করতেন। তিনি চরমপন্থী রাজনীতিতেও বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই এলাকায় গিয়ে সন্ত্রাসী কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন, তৎ মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঝুলনপুর এলাকার কাসেম, এসে এতো বেশী অত্যাচারী করেছে যে, তাকে বলা হতো কাশেম রাজা জানান ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেওয়া, ধরে এনে জিম্মি করা- এ সমস্ত কর্মকাণ্ড ওই গেরিলা বাহিনীর লোকরা করেছে। তখন শ্রীনগরে একটা দাতব্য হাসপাতাল ছিল। সেখানে তখন জাফর আহমদ (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি) থাকতেন। ওনার সাথে জাহিদী নামের আরেকজন ছিল। সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের এজিএস ইউসুফ- এই তিনজন ওই হাসপাতালে থাকতেন। পরে তারা প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে দেশে চলে আসেন।

ফখরুদ্দিন বলেন, ‘সাতদিনের ট্রেনিংয়ের পর জাফর ভাইয়ের কাছে আমরা গেলে, তিনি বললেন, এসব অস্ত্র-শস্ত্র রাখ। তোরা আরো উন্নততর ট্রেনিংয়ের জন্য চলে যা। নিজামপুর কলেজ ছাত্রলীগের পরবর্তী সভাপতি মহিউদ্দিন, জাফর (মিরসরাইয়ের ৯ নং ইউপি’র বর্তমান চেয়ারম্যান) ও আমি- আমাদের তিনজনকে পাঠিয়ে দেন উন্নততর ট্রেনিং এর জন্য। যাওয়ার ব্যবস্থাটা তিনি করে দিলেন। আমরা তিনজনের বাইরে আরো ১৭-১৮ জন ছিল। তখন ভারতীয় সেনা বাহিনী শক্তি নামের ট্রাকে করে পাহাড়ী পথে আগারতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। গোটা দিন পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যায় উদয়পুর একটি পেয়ারা বাগানে নিয়ে নামানো হলে। উদয়পুরের ক্যাম্প ছিল বি.এল.এফ প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প।সে ক্যাম্পে সবাইকে নিয়ে রাখা হতো।’

ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পে অনেকগুলো পেয়ারা গাছ ছিল। সেখানে ১০-১১ দিন আমরা ছিলাম। সেখানে আমাদের কোন ট্রেনিং দেওয়া হয়নি। সেখান থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় আগরতলার একটা গ্লাস ফ্যাক্টরিতে। সেখানে আমরা অনেকে বেশ কিছু দিন থাকলাম। সেখান থেকে নিয়ে গেল কলকাতার ধর্মনগর রেল স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে আসাম। আসামে হাফলং নামের একটা পাহাড়ী জায়গা আছে। সেটি আর্মিদের একটা ট্রেনিং ক্যাম্প। যারা তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা ছিল শুধু তাদেরকেই সেখানে ট্রেনিং করানো হয়। সেই ট্রেনিং প্রাপ্তরাই বি.এল.এফ বাহীনি হিসেবে দেশে আসে। আমিও বি.এল.এফ বাহিনীর প্রথম দলের সদস্য হয়ে দেশে আসি।’

তিনি বলেন, তখন অনেক বাঙালি ছেলে হাফলংয়ে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিল। তাদেরকে বলা হত মুজিব বাহিনী। আমরা সেখানে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিলাম। ৪৫ দিন প্রশিক্ষণ নেয়ার পর আরো কিছুদিন ক্যাম্পে ছিলাম। এরপর ধর্মনগর দিয়ে আগরতলা গ্লাস ফ্যাক্টরী এনে আমাদের বেশ কিছু দিন রাখা হয়। সেখান থেকে আবার আগরতলা হয়ে উদয়পুর। সেখান থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে দেশে ফিরে আসি। মিরসরাই এলাকা ছিল আমার যুদ্ধক্ষেত্র। ইঞ্জিনিয়ার এরফানুল হক ছিল আমাদের প্লাটুন কমান্ডার। ছোট-বড় অনেক অপারেশনে অংশ নিলাম।’

মুক্তিযুদ্ধ শেষে নিজের গ্রাম সীতাকু-ের কুমিরা কাজীপাড়া গ্রামে মায়ের কাছে ফিরেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তখন এলাকার নারী-পুরুষ সবাই দলবেধে দেখতে আসেন তাকে; স্মৃতিচারণ করে ফখরুদ্দিন বলেন, ‘আমার গ্রামে আমিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা। দ্বিতীয় কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই। মুক্তিযোদ্ধা কেমন তা দেখতে ও সরাসরি যুদ্ধের ঘটনা জানতে- সবার আগ্রহ ছিল তখন। মরণপণ তেজোদীপ্ত লড়াইয়ের গল্প যেমন তাদের শিহরণ জাগিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ মৃত্যু ব্যথিত করে তুলে তাদের।’

এদিকে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে প্রথম চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ ছাত্রলীগের যে কমিটি হয়, সেখানে সভাপতি হন জাফর আহমদ, সাধারণ সম্পাদক হন রবিউল হোসেন। সেই কমিটিতে সহ সভাপতি হন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তারপর নিজামপুর কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে পড়েন। ১৯৭৯ সালে মিরসরাই কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তখন নির্বাচন শুরু হয়। সীতাকু- থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এম আর সিদ্দিকী নির্বাচন করেন। তিনি তখন বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন। সে নির্বাচনে কাজ করার জন্য মিরসরাই কলেজ থেকে পদত্যাগ করে চলে যান ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তখন এম আর সিদ্দিকীর সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন এল কে সিদ্দিকী। সে নির্বাচনে এম আর সিদ্দিকী পরাজিত হন।

ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, যখন এল কে সিদ্দিকী জয়ী হন, আর আমার চাকরিও নেই। তখন চট্টগ্রামে চলে আসি। দারুল ফজল মার্কেটের সাথে একটা গ্লোব প্রিন্টিং প্রেস ছিল। ওই প্রেসটা আমি চালাতাম। সে সময় ইসলামিয়া কলেজে আমি শিক্ষকতার সুযোগ পাই। পাশাপাশি গ্লোব প্রিন্টিং প্রেসটাও চালাতাম।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলার’ আসামি হয়ে ১৯৭৫ এরপর মহিউদ্দিন চৌধুরী, মৌলভী সৈয়দসহ বড় একটা দল ভারতে চলে গিয়েছিলেন। ফখরুদ্দিন বলেন, সেখান থেকে তারা কিছু করার চিন্তা করছিলেন, দেশে ফিরে কোন অ্যাকশন নেয়া যায় কিনা। একটা পর্যায়ে ভারত থেকে সবাই দেশে চলে আসেন। তখন মহিউদ্দিন চৌধুরীর উপর হুলিয়া ছিল। তখন তিনি রাতে এসে আমার প্রেসে বসতেন। ওনার অনুসারীরা প্রেসে আসতেন, দেখা করতেন। আ জ ম নাছির, সফর আলী, নঈমুদ্দিন, আবুল হাশেম, শ্রমিক নেতা সিরাজসহ সব ছাত্রনেতা তখন আমার প্রেসে আসতো। তার সাথে রয়েল হোটেল, ডায়ম- রেস্টুরেন্ট, আমীন জুট মিলের শ্রমিক নেতারাও এসে মহিউদ্দিন ভাইয়ের সাথে দেখা করতেন।’

তিনি বলেন, ‘কোতোয়ালী থানার ওসি ছিলেন তখন আব্দুল কুদ্দুস। তিনি মেজর জেনারেল মঞ্জুকে ফটিকছড়ি থেকে গ্রেফতার করেছিলেন, পরে তাকে হত্যা করা হয়। ওসি কুদ্দুস কিভাবে যেন জেনে গেলেন, আমার প্রেসে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে দেখা করার জন্য আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতারা আসতেন। একদিন বিকেলে তিনি আমার প্রেসে অভিযান চালালেন, তখন আমি প্রেসে ছিলাম না। ওসি কুদ্দুসের অভিযানের খবরটি পেয়ে আমি আর প্রেসে যাইনি। চট্টগ্রাম ছেড়ে সোজা ঢাকায় গিয়ে উঠলাম।’

ফখরুদ্দিন বলেন, ‘এরপর এম আর সিদ্দিকী সাহেবের কাছে গেলাম। আমার অসুবিধার কথা তাঁকে বললাম। আমার কথা শুনি তিনি বললেন, অসুবিধা নেই, তুমি আমার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করো। চাকরি শুরু করার পর আমি ধানমন্ডি আইন কলেজে এলএলবিতে ভর্তি হয়ে যাই। ১৯৮২ সালে এলএলবি শেষ করি। এরপর আমি চট্টগ্রামে চলে এসে প্র্যাকটিস শুরু করি। তখন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে আমাকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আমি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগে আছি। প্রথমে সদস্য, এরপর পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। এখন সহ সভাপতি পদে আছি।’

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফখরুদ্দিন চৌধুরীকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পিপি করা হয়। ২০০০ সালে পদোন্নতি দিয়ে পিপি করা হয়। এরই মধ্যে ১৯৯৭ সালে মায়ের মৃত্যু হয়। পারিবারিক জীবনে তিনি তিন মেয়ের জনক। তিনজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকেন, আরেক মেয়ে পেশায় ব্যাংকার, থাকেন ঢাকায়। স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রামের পশ্চিম খুলশী আবাসিক এলাকায় থাকেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি বর্তমানে ওই সোসাইটির দুই বারের সভাপতি।

আইন পেশায় আসার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে চট্টগ্রামে সরকারের এ শীর্ষ আইন কর্মকর্তা বলেন, আইন পেশায় আসবো, সেটা ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল। স্কুল ও কলেজ জীবনে আমি ভালো বক্তৃতা করতে পারতাম। রাজনীতির প্রতি একটা ঝোঁক ছিল। এজন্য মনে করতাম যে রাজনীতি করার জন্য আইন পেশাটাই ভালো। এজন্য ঢাকায় চাকরি করার সময়, অনেক কষ্টে ধানমন্ডি আইন কলেজে পড়েছিলাম এবং সেখান থেকেই আইনের ডিগ্রী লাভ করি।

এলএলবি শেষ করার পর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদের বাবা ও চট্টগ্রামের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নুরুচ্ছফা তালুকদারের অধীনে প্র্যাকটিস শুরু করেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। পরে চট্টগ্রামের পিপি হিসেবে দায়িত্ব পান। কর্মজীবনে ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবি হত্যা মামলাটির কথা বিশেষভাবে মনে আছে ফখরুদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘জিবরান হত্যা মামলাটি বিচারের সময় আমি পিপি ছিলাম। সে মামলার আসামি ছিলেন শিল্পপতি পুত্র টিটু। সে এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে।’

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ২০১৫ সালে তরল কোকেন আনার ঘটনায় চোরাচালানের ধারায় করা মামলায় পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে নারাজি দিয়েছিলেন পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী। যে কোম্পানির আনা সূর্যমুখী তেলের মধ্যে কোকেন এসেছিল, সেই খান জাহান আলী লিমিটেডের মালিক নূর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়ায় গত বছরের আগস্টে নারাজি দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। তার নারাজী আবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য র‌্যাবকে নির্দেশ দেয় আদালত। তবে সে প্রতিবেদন এখনো আদালতে না আসায় হতাশ তিনি।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরের আওতাধীন এ পর্যন্ত ৮৬টি স্বর্ণের মামলায় আসামিদের শাস্তির মুখোমুখি করেছেন বলেও জানান ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্বে থাকা আদালত থেকে স্বর্ণের মামলার কোন আসামি আজ পর্যন্ত জামিন পায়নি। জামিন পেলে সেটা হাইকোর্ট থেকে পেয়েছে। স্বর্ণের মামলায় আমি সবসময় শক্ত ভূমিকা নিয়েছি। সমস্ত লোভ-লালসা উপেক্ষা করে আমি এই কাজটি করে আসছি।’

‘জঙ্গি মামলাগুলো আমি সবসময় সিরিয়াসলি নিয়েছি। নাশকতা, ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে যে সব মামলা হয়েছে- এসবের ক্ষেত্রে আমি সবসময় সতর্ক। এসব ব্যাপারে আমি আপোষ কখনো করিনি।’ বলেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের হওয়া মামলার কোন আসামি কখনো আমার আদালত থেকে ছাড় পায়নি। বর্তমানে বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যা মামলা আমার আদালতে বিচারাধিন আছেন।’

নবীন আইনজীবীদের প্রতি ফখরুদ্দিন চৌধুরীর পরামর্শ, ‘আইন পেশায় আসতে চাইলে জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসুক মন থাকা উচিত। বিশেষ করে জার্নাল পড়া দরকার। আগে তো শুধু ডিএলআর ছিল, এখন তো আইনের অনেক রেফারেন্স বই এসেছে। একটা রেফারেন্স ধরুন ডিএলআরে আছে, তার চেয়ে চমৎকার আরেকটা রেফারেন্স বিসিআরে আছে। আপনি ডিএলআর পড়লেন একটা রেফারেন্স পেলেন, আরেকটা বই যদি আপনি পড়েন আরেকটা রেফারেন্স পাবেন। দশটা রেফারেন্স বই পড়লে আপনি দশটা রেফারেন্স পাবেন। তবে আগে লেখাপড়া করার যে আগ্রহটা ছিল, এখন সেটা কম মনে হয়। রেডিমেট পাওয়ার আগ্রহটা বেশী।’

আগ্রহ কম হওয়ার পেছনে দুটি কারণ চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘এখন ১০০টি মামলার মধ্যে ৮০টিই হচ্ছে ইয়াবা বা মাদকের মামলা। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে আছে আবার এনআই অ্যাক্টের মামলা। এগুলো হচ্ছে টাইপ মামলা, সবগুলো এক ধরনের মামলা। এই টাইপ মামলাগুলো থেকে শেখার কী আছে? সেখানে শেখার তো কিছু নেই। কত আসামি, ইয়াবার সংখা কত? কত দিন জেলে আছে?- এটার উপর ভিত্তি করে জামিন হচ্ছে।’

এসব কারণে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমেছে জানিয়ে ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘যদি ভালো একটা হত্যা মামলা, অস্ত্র মামলা থাকে- তাহলে সেখানে পড়ার, লেখার, রেফারেন্স দেওয়ার বিষয় থাকে। এখন যেহেতু মামলাগুলো গতানুগতিক হয়ে গেছে, এ কারণে লেখাপড়া গতানুগতিক হয়ে গেছে, জানার উৎসটাও গতানুগতিক হয়ে গেছে। ইয়াবার মামলা আর এনআই অ্যাক্টের মামলা থেকে কী শিখবে? শেখার ক্ষেত্র তো নেই। শেখার ক্ষেত্র থাকলে ঠেকে ঠেকে শিখতো।’

সংসদে আইনের ছাত্রদের উপস্থিতি ব্যাপক থাকা উচিত বলে মনে করেন ফখরুদ্দিন চৌধুরী; ‘সংসদ হচ্ছে আইনের ফ্যাক্টরি। আইন সেখান থেকে আসছে। সেখানে যত বেশী আইনজীবী থাকবেন, ততই আইন সমৃদ্ধ হবে। তারা অনেকগুলো সংশোধনী আনতেন। গ্রহণ হোক না হোক উপস্থাপন তো হতো, আলোচনা হতো। সেই সুযোগটা এখন নেই। এখন তো ব্যবসায়ীরা, অর্থবিত্তবানরা সংসদে যাচ্ছেন। যদিও এটা ঠিক যে, পেশাজীবী, গুণী মানুষজনদের এখন নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিলেও হবেন না। কারণ ট্রেন্ডটা বিপরীতমূখী।