১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, শনিবার

চবি-দুদক লুকোচুরি খেলা!

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯, ৬:৩১ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ নিয়ে শুরু হয়েছে জটিলতা। এ প্রকল্পের দুই ধাপের কাজে দুইজন পৃথক ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। যা গড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত। এ নিয়ে চবি ও দুদকের মধ্যে শুরু হয়েছে একপ্রকার ‘লুকোচুরি খেলা’।

আবার ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে একপক্ষ বলছে, প্রথম ধাপের ঠিকাদার এককভাবে দরপত্র জমা দিয়ে কাজটির কার্যাদেশ পেয়েছে। এছাড়া প্রাক্কলিত ব্যয়ের (সরকার নির্ধারিত প্রকল্প ব্যয়) চেয়ে ১৪ দশমিক ৮৯৩ শতাংশ বর্ধিত টাকা দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যপক্ষের অভিযোগ, ভবনটির দ্বিতীয় ধাপের কাজটি অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে পাইয়ে দেওয়াসহ নানা পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ। দ্বিতীয় ধাপের কাজে একাধিক ঠিকাদার পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ তুলেছেন। এমন অভিযোগ তুলে দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন অভ্র ঘোষ নামে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের দরপত্র সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তলব করেছে দুদক। এ প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ১০ জানুয়ারি বেশিরভাগ তথ্য প্রদান করে।

গত ২৭ জানুয়ারি চবি তথ্য ও ফটোগ্রাফি শাখা থেকে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানানো হয়েছে, প্রকল্পটির প্রথম ধাপ ও দ্বিতীয় ধাপে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়ার বেশ কিছু তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত ওই ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে, দুদকের এক কর্মকর্তা অভিযোগ দিয়েছেন তাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে না চবি। এ অভিযোগ গত ১৬ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু চবি প্রশাসন তাদের ব্যাখ্যায় তিন ধাপে দুদককে চিঠি দেওয়ার বিষয় উল্লেখ করেছেন। সে ব্যাখ্যায় দুদকে পাঠানো চিঠিগুলোর স্মারক নম্বরও উল্লেখ রয়েছে। প্রশাসনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দুদকে তথ্য যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে তা সত্য নয়।

কারণ গত বছরের ৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য দফতর দুদকের চিঠি পেয়ে ৬ নভেম্বরই দুদককে পাল্টা চিঠি দেয়। এছাড়া ১৯ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর পরিচালক বরাবর আরো একটি চিঠি (যার স্মারক নং সি-১২৩২/গোপ-শা/৯২৯৪) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঠায়।

চিঠিতে শুধুমাত্র দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের বিষয়েই নয়; অতীত ও বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও উন্নয়ন কাজ সংক্রান্ত কোন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে কিনা- তা তদন্ত করতে দুদককে আহ্বান জানানো হয়।

বিশেষভাবে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে (সি-/গোপ-শা-৫৯৩১/ স্মারক মূলে) বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের আওতায় ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চ-এ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সরকারী তহবিলের টাকা অপচয় সংক্রান্ত তথ্যাদি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির যে প্রমাণ মিলেছে সে সকল তথ্য-উপাত্ত অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদককে অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া সি-১২৩২/গোপ-শা/৯২৯৪ স্মারক মূলে আইইআর নিয়ে পাঠানো চিঠির প্রেক্ষিতে দুদকের গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করারও অনুরোধ করা হয়।

এদিকে রোববার (২৭ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পাঠানো বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবনটি দুটি ধাপে নির্মিত হচ্ছে। প্রথম ধাপের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে একটি মাত্র ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দরপত্র পাওয়া যায়। ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট ফ্রেন্ডস ইন্টারন্যাশনাল নামে ওই প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্কলিত ব্যয়ের ১৪ দশমিক ৮৯৩ শতাংশ উর্ধ্বহারে ৭৩০ দিনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার শর্তে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রকল্পের মেয়াদ চার দফায় ৫২৮ দিন বাড়ানো হয়।

এরপর দ্বিতীয় ধাপের দরপত্র আহ্বান করা হলে ২টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স-জি.কে.বি.এল (জে.ভি) প্রাক্কলিত ব্যয়ের (সরকার নির্ধারিত প্রকল্প ব্যয়) ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ উর্ধ্বহারে দরপত্র জমা দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সম্মতি নিয়ে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ উর্ধ্বহার দর কমিয়ে তফসিলে উল্লেখিত দর অনুযায়ী কাজ সম্পাদনের ব্যাপারে সুপারিশ করে।

২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৫০৫ তম সভার ৭৫ নং সিদ্ধান্তে যা চুড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। একই বছরের ২৪ অক্টোবর ৭০০ দিনের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করার শর্তে কার্যাদেশ প্রদান করে। এরপর চুক্তিপত্র ও প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় ডকুমেন্টের পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের CPTU Website এ প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়।

এছাড়া ওই বছরের ২১ নভেম্বর চুক্তিপত্র ও যাবতীয় ডকুমেন্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিপিটিইউ এর উপ পরিচালক বরাবর (স্মারক নং- ৯৬৮/সি/ই-২২৪৭/১৬ মূলে) পাঠানো হয়। যদি কারো আপত্তি থাকতো তাহলে সিপিটিইউতে অভিযোগ তুলতে পারতো।

কিন্তু কোনো পক্ষই দরপত্র, কার্যাদেশ প্রদান ও ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে বিষয়ে কোন ধরণের আপত্তি এতে জানায়নি। নির্মাণ কাজ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সমন্বয়ে গঠিত সরকারী পিআইসি বিভিন্ন সময়ে নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন এবং নির্মাণ কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, জনগণের অর্থে পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাই সরকার ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনার শিক্ষা দর্শন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা শতভাগ সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছি। এখানে কোথাও দুর্নীতির সুযোগ নেই।

দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবন নিয়ে দুদকের তদন্তের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শুধু এ প্রকল্প নয়; নিকট অতীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া হয়েছে সবগুলো নিয়ে তদন্ত করতে দুদককে চিঠি দিয়েছি। দুদক তদন্ত করে যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি পায় তাহলে তাদের উচিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার এ কে এম নুর আহমদ বলেন, দুদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুলেনি। তাদের কাছে কোনো এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন তারা সে বিষয়টি তদন্তের স্বার্থে তথ্য চেয়েছে। আমরা তথ্য প্রদান করেছি। এখানে তথ্য গোপন করা হয়েছে বা দুদকে পাঠানো হয়নি বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা মিথ্যা। আমরা দুদকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদান করেছি। এবং প্রয়োজনে আরো তথ্য লাগলে তাও দেব।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ বলেন, দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা ভবনে নির্মাণের ক্ষেত্রে একাধিক ঠিকাদার পরিবর্তন করার যে খবর প্রচার হচ্ছে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ দ্বিতীয় ধাপে শুরু থেকে যে ঠিকাদার কাজ করছে সে ঠিকাদার এখনো কাজ করছে। আর ঠিকাদার অভিজ্ঞ নাকি অনভিজ্ঞ সে বিষয়ে সরকারের নীতিমালাই যথেষ্ঠ। আমি একা কোনো ঠিকাদারকে এক টাকার কোনো কাজের কার্যাদেশও দিতে পারিনা। কারণ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ অনেকগুলো ধাপ পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ঠিকাদার নিয়োগ হয়। কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে এতোগুলো পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে পছন্দের কোনো ঠিকাদারকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের মান যাচাইয়ে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দফতরই কাজ করে না; এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের সরকারী (পিআইসি) কমিটি নির্মাণ কাজ পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করেন।

উক্ত বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।