১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, শনিবার

কর্ণফুলীর রূপমাধুরী, ডিসির স্বপ্নগাথা

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৯, ২:১৯ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : কর্ণফুলী নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করার পর সেখানে দেশের শ্রেষ্ঠ বিনোদন স্পট গড়ে তোলা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. ইলিয়াস হোসেন।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পতেঙ্গা এলাকার মোহনা থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকায় কর্ণফুলীর দুই তীর থেকে দুই হাজার ১১২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করার কথা রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানকে তিনটি পর্যায় বা জোনে ভাগ করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

প্রথম পর্যায়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী তীরের নগরীর সদরঘাট থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড়ে গিয়ে এই কার্যক্রমের সমাপ্তি টানা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ১০ একর জমি উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। এ সময় গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দুই শতাধিক স্থাপনা।

এখন বাকি দুটি জোনে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। সেগুলো হচ্ছে- বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে পতেঙ্গা এবং সদরঘাট থেকে চাক্তাই। এরমধ্যে কোন জোনের কাজ আগে শুরু করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। অভিযানে উদ্ধার হওয়া জায়গার পুণরায় দখল ঠেকাতে ‘মহাপরিকল্পনা’ নিচ্ছে জেলা প্রশাসন।

নিজের দপ্তরে একুশে পত্রিকার সাথে আলাপকালে চট্টগ্রামের ডিসি মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, কর্ণফুলী নদী যাতে আর বেদখল হতে না পারে, সেজন্য নদীর তীরে ওয়ার্কওয়ে, পার্ক নির্মাণ, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে আনন্দ-বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এটা করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবো অচিরেই। প্রস্তাবনার অনুলিপি মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, মাননীয় ভূমিমন্ত্রীর আগ্রহ থাকলে এটা সবচেয়ে ভালো বিনোদন স্পট হবে, হাতিরঝিলকেও হার মানাবে। ভূমিমন্ত্রী মহোদয়কে আমি বলেছি, এক হাজার কোটি টাকার একটা প্রকল্প যদি নেয়া হয় তাহলে পুরো চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টে যাবে কর্ণফুলীর তীর ধরে। কর্ণফুলীর তীর হতে পারে দেশের শ্রেষ্ঠ বিনোদন স্পট।

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। উনি এটা কখনোই না করবেন না। এখন তো আমরা আগের সেই জায়গায় নেই। এক হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের জন্য কোন বিষয়ই না। অনেক বেশী সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ এখন। আমার বিশ্বাস, মাননীয় ভূমিমন্ত্রী এটার উদ্যোগ নিতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটা জানলেই এ বিষয়ে তিনি এগিয়ে আসবেনই। যেহেতু তিনি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ, নদীপ্রেমী মানুষ।’ যোগ করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক।

আরো দুটি পর্যায়ে নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আগামী সপ্তাহে আমরা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে পারি। কোন এলাকা থেকে শুরু করবো সেটা একদিন আগে গণমাধ্যমকে জানাবো। এটা সম্পন্ন করার পর শেষ পর্যায়ের কাজ ধরবো। এখন পর্যন্ত আমাদের ১০ একর জমি উদ্ধার হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের উচ্ছেদ অভিযান শেষে আমরা পরিমাপ করবো, আমাদের কত একর জায়গা হয়েছে। সেটা মিলে আমরা বিনোদন স্পট করার প্রস্তাবনাটা তৈরী করবো।

তিনি বলেন, বিনোদন স্পট করতে গেলে নদী তীরে যেসব জেটি, ঘাট আছে, তাতে চলাচলের বিষয় আছে। সেগুলোও মাথায় রেখে গঠনমূলক উপায়ে নান্দনিক বিনোদন স্পট হতে পারে। নদী পারাপারের ঘাট থেকে চলাচলের জন্য একটা ওভারপাস হতে পারে। সব সংস্থার মতামত নিয়ে, সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে এটা অসাধারণ একটা বিনোদন স্পট হতে পারে। সেই প্রস্তাবনাটা আমরা দেবো।

উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে জেলা প্রশাসন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে জানিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বলেন, এটা আমি মাননীয় ভূমিমন্ত্রীকেও বলেছি। এখানে অন্তত ১০০ শ্রমিক কাজ করেছে। বুলডোজারসহ নানা সরঞ্জাম লেগেছে। যদিও সিটি করপোরেশন আমাদেরকে কিছু সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা এক টাকাও বরাদ্দ পাইনি। আপাতত আমাদের কিছু ফান্ড আছে, সেখান থেকে কোনোরকমে সমন্বয়, ধার-কর্জ করে করছি। তবে ভূমিমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি তিনি অচিরেই করে দেবেন।

উচ্ছেদ করা জায়গার দখল ঠেকাতে শিগগিরই দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ডিসি মো. ইলিয়াস হোসেন।

গত বছরের ফ্রেব্রুয়ারির শেষে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. ইলিয়াস হোসেন ২০১৪-১৫ সালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। সে সময় হাইকোর্টের নির্দেশে জরিপে কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ে ২ হাজার ১১২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

স্মৃতিচারণ করে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমি যখন চট্টগ্রামের এডিসি ছিলাম, তখন এগুলোর মাপ-ঝোক, সীমানা নির্ধারণ, চিহ্নিতকরণ- এ কাজগুলো আমি করে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনা কর্ণফুলীর উচ্ছেদ অভিযানের কার্যক্রম। আমার সৌভাগ্য যে, কাজটি আমার হাত দিয়ে শুরু, আমার হাত দিয়েই শেষ হচ্ছে।

‘নদীপাড়ে অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার কাজটি করতে পেরে আমার ভালো লাগছে। যদিও অনেক বাধাবিপত্তি এসেছে। এটা অনেক চ্যালেঞ্জেরও ছিল, সেই চ্যালেঞ্জকে আমরা গ্রহণ করেছি। এক্ষেত্রে সরকার, মাননীয় ভূমিমন্ত্রীর সহযোগিতা পেয়েছি।’ যোগ করেন ডিসি মো. ইলিয়াস হোসেন।

ছবি: আকমাল হোসেন