২৭ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, মঙ্গলবার

এসআই সাইফকে বাঁচানোর চেষ্টা কেন?

KSRM Advertisement
প্রকাশিতঃ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৯, ১১:৪২ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামে ১৪ হাজার ১০০টি ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় বাকলিয়া থানার বরখাস্ত এসআই খন্দকার সাইফ উদ্দিন কারাগারে গেলেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নিচ্ছে না পুলিশ। এ ছাড়া এ ঘটনায় আদালতে দেয়া অভিযোগপত্রে এমন ‘ফাঁকফোকর’ রাখা হয়েছে, যা দিয়ে অনায়াসেই পার পেয়ে যেতে পারেন পুলিশ কর্মকর্তা সাইফ!

২০১৮ সালের ৩০ জুলাই দিবাগত রাত ১টার দিকে নগরের বাকলিয়া থানার পশ্চিম বাকলিয়া হাফেজনগর এলাকার একটি বাসার দরজা ভেঙে ১৩ হাজার ৫০০ ইয়াবা জব্দ করে র‌্যাব। এর আগে বাড়িটির মালিকের ছেলে নাজিম উদ্দিন মিল্লাতকে ৬০০ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়।

পাশাপাশি ওই বাসা থেকে পুলিশের ইউনিফর্ম, মাদক বিক্রির ২ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়। র‌্যাব বলছে, সাইফ ওই বাসাটি ভাড়া নিয়ে ইয়াবাব্যবসা করতেন। তবে তিনি পরিবার নিয়ে কল্পলোক আবাসিক এলাকায় থাকতেন। সাইফের সহযোগি ছিলেন গ্রেফতার মিল্লাত।

এ ঘটনায় র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের উপসহকারী পরিচালক নাজমুল হুদা একই বছরের ৩১ জুলাই বিকেলে নাজিম ও পলাতক এসআই সাইফকে আসামি করে বাকলিয়া থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ২ ডিসেম্বর ওই মামলায় মিল্লাত ও সাইফকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন পরিদর্শক রাজেস বড়ুয়া। এতে ২৬ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাফেজনগর এলাকার ওই বাসায় প্রবেশের সময় মিল্লাতকে আটকের পর তার প্যান্টের পকেট থেকে ৬০০ ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। এরপর এসআই সাইফের বাসার তালা ভেঙে মিল্লাতের দেখানো ও বের করে দেয়া মতে, ভেতরে থাকা টেবিলের ড্রয়ার থেকে ১৩ হাজার ৫০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারকৃত ইয়াবা, নগদ টাকা ও অন্য আলামত এসআই সাইফের ভাড়া করা রুম থেকে উদ্ধার করার কারণে তাকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।

তবে উক্ত অভিযোগপত্রে তিনি লিখেছেন, সাইফের সোর্স হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বাসার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন মিল্লাত। বাসার চাবি থাকার সুবাদে সাইফের অবর্তমানে মিল্লাত উক্ত বাসায় অবাধে আসা-যাওয়া করতে পারতো বলে গোপনীয় তদন্তে জানা যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলাটি বিচারের জন্য গেলে অভিযোগপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আসামি সাইফের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, বাসাটি তার জিম্মায় থাকলেও অপর আসামি মিল্লাতের কাছেও চাবি ছিল। সাইফকে ‘ফাঁসানোর’ জন্য তার অনুপস্থিতিতে মিল্লাত এসব ইয়াবা বাসায় রেখে দিয়েছেন।

এ প্রেক্ষিতে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ যুক্তিতে মামলার দায় থেকে এসআই সাইফকে মুক্তি দেয়ার দাবি তার আইনজীবীরা জানাতে পারেন বলে মত দিয়েছেন চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী আসাদুজ্জামান খান।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক রাজেস বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মিল্লাতের কাছে সাইফের বাসার চাবি থাকতেও পারে, আবার না-ও থাকতে পারে। যতটুকু মনে পড়ে আমি সুনির্দিষ্ট করে কিছু লিখিনি।’

তিনি বলেন, ‘সে (সাইফ) তো বিভিন্নভাবে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে। অনেকভাবে সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু আমি সে রকম সুযোগ রাখিনি। সত্য বিষয়টা তুলে ধরেছি।’

যদিও এসআই সাইফের বাসায় কিভাবে ইয়াবাগুলো গেল, সেখানে থেকে ইয়াবাগুলো কোথায় যায়, আরো কারা জড়িত- সেসব বিষয়ে তথ্য আসেনি অভিযোগপত্রে। ২০ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দিলেও সেগুলো প্রায় অভিন্ন।

একা একা অভিযান, ইয়াবাব্যবসা করা তো এসআই সাইফের পক্ষে সম্ভব না; এক্ষেত্রে পুলিশের আরো কেউ যুক্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযোগপত্রে গ্রেফতার মিল্লাত ও সাইফ ছাড়া আর কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এককথায় মামলাটির বিস্তারিত তদন্ত হয়নি বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে অভিযোগপত্রভুক্ত এক নাম্বার আসামি মিল্লাতকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি জবানবন্দি দেননি।

অন্যদিকে এসআই খন্দকার সাইফকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ারা থাকলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। অভিযোগপত্র দেওয়ার দু’মাস পর গত ৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পঞ্চম বিচারিক হাকিম সরোয়ার জাহানের আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক সাইফকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ফৌজধারী কার্যবিধির ১৭৩ (৩খ) ধারামতে, কারাবন্দি সাইফকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত সংক্রান্ত নতুন তথ্য লাভ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়ার সুযোগ থাকলেও পুলিশের সে আগ্রহ, উদ্যোগ কোনোটাই নেই।

উল্টো তদন্ত কর্মকর্তা রাজেস বড়ুয়া একুশে পত্রিকার কাছে দাবি করেছেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার পর সাইফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতি প্রার্থনা ও সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সুযোগ নেই।

মামলার বাদি র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের উপ সহকারী পরিচালক নাজমুল হুদা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগপত্রে কী আছে, না আছে- আমি কিছুই জানি না। আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।’

অন্যদিকে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী।

এদিকে ইয়াবা উদ্ধারের পর থেকে সাইফকে রক্ষার জন্য পুলিশের কিছু কর্মকর্তা তৎপর রয়েছেন, যারা এসআই সাইফের নানা অপকর্মের সহযোগি বলে অভিযোগ আছে। একই কারণে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ।

পুলিশ বলেছে, এসআই সাইফ ঘটনার দিন ৩০ জুলাই রাতে বাকলিয়া থানা-পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। পরদিন সকালে ‘অসুস্থতার’ কথা বলে বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী তাকে ফোর্স দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসার জন্য। সেখান থেকে তিনি ‘কৌশলে’ পালিয়ে যান বলে সে সময় গণমাধ্যমকে জানান ওসি প্রণব চৌধুরী।

অভিযোগ রয়েছে, পালানোর সুযোগ করে দিতেই সাইফকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন বাকলিয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। বিষয়টি জানার পর নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন। এ ঘটনায় বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ কবীর হোসেনকে ক্লোজ (প্রত্যাহার) করা হয়। যদিও এখন খুলশী থানায় একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন কবীর হোসেন। তবে সে সময় ওসি প্রণবের বাবা মারা যাওয়ায় সহানুভূতি পান তিনি, এ নিয়ে তাকে পড়তে হয়নি বড় ধরনের জটিলতায়।

অভিযানে অংশ নেয়া র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, বাকলিয়ার ওই বাসাটি ঘটনার দেড় বছর আগে ভাড়া নেন সাইফ। তিনি বাকলিয়া, চাক্তাই এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ধরা পড়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিতেন। পরে ওই ইয়াবাগুলো বাসায় রাখতেন। এরপর এগুলো বিক্রি করতেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশের ভেতর শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে মাদক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরষের মধ্যে ভূত থাকলে কিছুই হবে না।