২৩ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬, সোমবার

চোরের পক্ষ নিয়ে ‘প্রবাসী’ ইমামকে পুলিশের সামনেই পেটালেন মেম্বার

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ৯, ২০১৯, ১২:২২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : মোবাইল ফোনের চোরচক্রের পক্ষ নিয়ে এক নিরীহ, নিরাপরাধ কোরআনে হাফেজকে পুলিশের সামনে পেটালেন রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবদুস সালাম প্রকাশ কানা সালাম। মেম্বারের বর্বরতার শিকার হাফেজ মোহাম্মদ ইসহাক সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইনে একটি সরকারি মসজিদের পেশ ইমাম। সোমবার দুপুরে মেম্বার সালামের স্থানীয় রাজারহাটস্থ ব্যক্তিগত কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় সোমবার রাতে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ মোবাইল চুরির সাথে জড়িত মাসুদ ও সুজন নামে দুজনকে আটক করে। নির্যাতনের শিকার হাফেজ ইসহাক রাঙ্গুনিয়া থানায় সালাম মেম্বার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে ‘সমঝোতার’ কথা বলে সালাম মেম্বারের লোকজন ভিকটিমকে থানা থেকে নিয়ে যান।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, উত্তর রাঙ্গুনিয়ার ফুলবাগিছা এলাকার বাসিন্দা হাফেজ ইসহাক গত সপ্তাহে আল আইন থেকে ছুটিতে আসেন। এসেই বাড়ির সংস্কারকাজে হাত দেন। রোববার ঘরে টাইলস লাগানের সময় টাইলস-মিস্ত্রি কাদের ও সুজন হাফেজ ইসহাকের ভাগিনার একটি দামি মোবাইল ফোন সরিয়ে ফেলে।

ইসহাকের ভাগিনা ও স্বজনরা টাইলস মিস্ত্রিদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে মোবাইল সেটটি উদ্ধার করে সেখানেই বিষয়টি শেষ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মোবাইল ফিরিয়ে না দিয়ে টাইলস মিস্ত্রিরা যে যার মতো বাড়ি চলে যায়।

রোববার রাতে হাফেজ ইসহাকের ভাগিনা তার এক বন্ধুকে নিয়ে টাইলস মিস্ত্রি মাসুদ ও সুজনের বাড়িতে যায়। তারা টাইলস মিস্ত্রীদের ভয়ভীতি দেখায় এবং একপর্যায়ে চর-থাপ্পড় দিলে মাসুদের দখল থেকে সেটটি বের হয়ে আসে।

এরপর সোমবার দুপুরে স্থানীয় সালাম মেম্বার তার কার্যালয়ে জরুরি ‘তলব’ করেন হাফেজ ইসহাককে। না এলে তুলে আনা হবে বলে খবর পাঠানো হয়। হাফেজ ইসহাক গিয়ে দেখতে পান মেম্বারের কার্যালয়ে আগে থেকে রাজারহাট রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) এর ইনচার্জ এসআই আতিক এবং দুই মোবাইল চোর বসে আছে।

তাদের উপস্থিতিতেই মেম্বার সালাম টাইলস মিস্ত্রি মাসুদের পকেট থেকে ইসহাকের ভাগিনা ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে দাবি করে সেই টাকা এখনই দিতে চাপ সৃষ্টি করেন। মেম্বারের এমন বিচারে হতভম্ব হাফেজ ইসহাক।

তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সালাম মেম্বার গর্জন করে নিজেকে নতুন করে চিনিয়ে দেন, ‘বলেন-আমি কিন্তু খুব খারাপ মানুষ। আমার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা। মনে রেখো- আমার হাত থেকে কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।’ এসময় ইসহাক রাঙ্গুনিয়ার নেতৃস্থানীয় মানুষের সাথে তার পরিচয় এবং আত্মীয়তার কথা জানালে আরো ক্ষেপে যান সালাম। মন্ত্রী-টন্ত্রী হিসাব করার টাইম নেই জানিয়ে এসআই আতিকের সামনেই হাফেজ ইসহাককে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকেন মেম্বার সালাম। এসময় তার বাহিনীর দুই যুবক এসে ইসহাককে শ্বাসরোধে হত্যা করতে উদ্যত হয়। শুধু তাই নয়, মারধরের সময় ইসহাকের কান্নার শব্দ তার স্বজনদের ফোন করে শোনান সালাম। এতে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে হাফেজ ইসহাকের স্বজনদের মাঝে।

এসময় জেলা পুলিশের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি জরুরি মিটিংয়ে শহরে ছিলেন রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি আহসানুল কাদের ভূঁইয়া ইমতিয়াজ। সেখান থেকেই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সালাম মেম্বারের ‘জিম্মিদশা’ থেকে হাফেজ ইসহাককে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করেন ওসি। এরপর আহত ইসহাককে রাঙ্গুনিয়া থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তার ঘাড়, কোমড়, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের সৃষ্টি হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি আহসানুল কাদের ভূঁইয়া ইমতিয়াজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, একজন মাওলানার সঙ্গে সালাম মেম্বার যে আচরণ করেছে তা দুঃখজনক। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। থানায় মামলার প্রস্তুতি নেয়া আছে। ভুক্তভোগী চাইলে যে কোনো সময় মামলা হতে পারে।

হাফেজ ইসহাক একুশে পত্রিকাকে বলেন, বিদেশে একটি মসজিদে ইমামতি করে আমি সংসার চালাই। একমাসের জন্য বাড়িতে বেড়াতে এসে বিনাকারণে এভাবে অপমানিত ও নির্যাতিত হবো ভাবিনি। আমি মামলা করতে থানায় গিয়েছিলাম। কিন্তু সমঝোতার কথা বলে সালাম মেম্বারের লোকজন আমাকে থানা থেকে নিয়ে আসে। বলছে মামলা করে কোনো লাভ হবে না। বরং এলাকায় বসে মীমাংসা করে ফেলেন। এখন দেখি তারা কী মীমাংসা করে।

প্রসঙ্গত, মেম্বার আব্দুস সালাম বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, অস্ত্র, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণসহ অন্তত ডজনখানেক মামলা রয়েছে। রাঙ্গুনিয়া থানার ডাকাতি মামলায় (মামলা নং ০৮(১১)৮৭) ১৯৯২ সালের ২৮ অক্টোবরের রায়ে আবদুস সালামের ২২ বছর সাজা হয়। রাঙ্গামাটির কাউখালি থানার ০৩(৮)৮৮ মামলায়ও সালামের সাজা হয়।

এছাড়া ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসদমন ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয় আবদুস সালামের। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সালামকে একদিনও সাজা ভোগ করতে হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা সোবহান হত্যা মামলায় দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সালাম মেম্বারের নাম আসলেও এই মামলায় তার কিছুই হয়নি।

অপরাধ করেও বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় সালাম মেম্বার এলাকায় অঘোষিত সম্রাট বনে গেছেন। স্থানীয় রাজারহাট এলাকায় আলীশান অফিস বানিয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। অফিসে গড়ে তুলেছেন প্যারালাল থানাপ্রশাসন, মিনি কারাগার। রাঙ্গুনিয়ার শীর্ষসন্ত্রাসী আলমগীর বাহিনীর প্রধান আলমগীর এবং সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর সালাম মেম্বারের আপন সহোদর। অবশ্য স্থানীয় সাংসদ, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কঠোর মনোভাবের ফলে আলমগীর বাহিনীর প্রধান আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে এলাকাছাড়া।

একুশে/এসআর/এটি