২১ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬, শনিবার

ঘুরে দাঁড়িয়েছে পটিয়ার লবণশিল্প

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ১০, ২০১৯, ২:১৯ অপরাহ্ণ

কাউছার আলম, পটিয়া : চট্টগ্রামের পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সরকারি নানান ইতিবাচক পদক্ষেপের সুফল পেতে শুরু করেছে পটিয়ার ইন্দ্রপুলের লবণ মিল-মালিকরা। ব্রিটিশ আমল থেকে চাঁনখালী খালের পাড়ে গড়ে উঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ লবণ পরিশোধন এলাকা ইন্দ্রপুল থেকে পরিশোধিত লবণ যাচ্ছে সারাদেশে।

পাশাপাশি লবণ শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ১০/১২ হাজার শ্রমিক এখানে এসে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বছরের ৬ মাস এখানে পুরোদমে চলে লবণ পরিশোধনের কাজ।

জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, টেকনাফ, উখিয়া, মগনামা এলাকায় মাঠে উৎপাদিত কাঁচা লবণ আসতো পটিয়ার ইন্দ্রপুল এলাকার লবণ মিলগুলোতে। সাঙ্গু নদী থেকে মুরালী ঘাট হয়ে চাঁনখালী খাল দিয়ে লবণ-বোঝাই বড় বড় নৌকা আসতো ইন্দ্রপুলে। কিন্তু ৯০ দশকের পর থেকে চাঁনখালী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে ইন্দ্রপুল লবণ শিল্প। চাঁনখালী ভরাট হয়ে যাওয়ার পরেও কর্ণফুলী নদী দিয়ে বোয়ালখালী খাল হয়ে ইন্দ্রপুলে লবণবোঝাই ট্রলার আসতো। কিন্তু ধলঘাট এলাকার চন্দ্রকলা সেতু ভেঙে খালে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে ইন্দ্রপুল লবণ শিল্পের কপালে শেষ পেরেকটি টুকে দেয়া হয়।

পরবর্তীতে চাঁনখালী খাল খনন হলেও নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে এই শিল্প। এসময় ধীরে ধীরে অনেক লবণ মিল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১শ’ লবণ মিল থেকে নামতে নামতে ডজনে নেমে আসে। পরে ট্রাকে করে লবণ আসতে থাকে ইন্দ্রপুলে। বিগত কয়েক বছর থেকে সরকারি নানান ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে ইন্দ্রপুলের লবণ মিলগুলোতে আবারো কাঁচা লবণ আসতে শুরু করে। বর্তমানে ট্রলার ও ট্রাকে করে কাঁচা লবণ আসে এখানে।

সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইন্দ্রপুল এলাকায় প্রায় ৪৮টি লবণ মিল রয়েছে। যেখানে বিগত কয়েক বছর আগেও ২০টি মিল ভালোভাবে চলতো না। কিন্তু এখন পুরোদমে চলছে লবণ পরিশোধনের কাজ। চাঁনখালী খাল হয়ে ট্রলারে করে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে ট্রাকে করে লবণের কাঁচামাল আসে এখানে। আবার পটিয়া থেকে যেসব লবণ সারা দেশে যাচ্ছে তা দেশের ৪০ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে বলেও জানা গেছে।

ট্রলার মালিক মো. কবির আহাম্মদ সওদাগর জানান, তিনি নিয়মিত কুতুবদিয়া থেকে লবণের কাঁচামাল নিয়ে পটিয়া ইন্দ্রপুলে আসেন। তার ট্রলারে সর্বোচ্চ ২ হাজার মন লবণ কাঁচামাল আনা যায়। বর্তমানে ২ শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক লবণ পরিশোধনের কাজে নিয়োজিত। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব কাঁচামাল ট্রাকে এবং ট্রলারে করে আনা হয় তা শ্রমিকরা বস্তা এবং ঝুড়ি করে মিলে নিয়ে যায়। কাঁচামালগুলো মিলে পরিশোধন করে এবং প্যাকেটজাত করে সারাদেশে সরবরাহ করা হয়।

ইসলামাবাদ সল্টের পরিচালক মুহাম্মদ আশেক এলাহি বলেন, ইন্দ্রপুলের মিলে পরিশোধিত লবণ প্যাকেটজাত করে সিলেট, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রাজশাহী, বগুড়া, ভৈরব, নরসিংদী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে লবণশিল্প সঠিক পথেই এগুচ্ছে।

বিসিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে লবণের চাহিদা রয়েছে ১৬ লক্ষ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। এতে আরও ১ লক্ষ ৩০ হাজার মেট্রিক টন লবণের ঘাটতি রয়েছে। তাই আপদকালীন মজুতসহ প্রায় ৩ লক্ষ মেট্রিক টন লবণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে প্রায় ৩ লক্ষ মেট্রিক টন লবণের আমদানি করা প্রয়োজন রয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন কলকারখানায় শিল্প লবণ হিসেবে সোডিয়াম সালফাইড আমদানি করে থাকে। তা ধবধবে সাদা বিধায় ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি করে আসছে। অন্যদিকে সোডিয়াম সালফাইড নামে বস্তার গায়ে লেভেল লিখে সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) আমদানি করে লাভবান হচ্ছে। কারণ সোডিয়াম সালফাইড আমদানিতে সরকারকে ৭ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানিতে শতভাগ ট্যাক্স দিতে হয়। তাই তারা ৭ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে প্রতারণা করে ভোজ্য লবণ আমদানিতে ব্যয় কম হচ্ছে এবং অধিক মুনাফা লাভের সুযোগ পাচ্ছে।

এতে করে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী লাভবান হলেও অধিকাংশ লবণ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সরকারি নজরদারি বাড়ানোর কারণে অসাধু ব্যবসায়ীদের সোডিয়াম সালফাইড আমদানি কমেছে। এছাড়াও চাঁনখালী খাল খনন, মহাসড়কের যান চলাচলে হয়রানি বন্ধসহ বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। যার কারণে বর্তমানে পটিয়া ইন্দ্রপুলে নতুন নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে।

পটিয়া ইন্দ্রপুল লবণ শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল খালেক বলেন, কয়েক বছর আগেও ইন্দ্রপুল লবণ শিল্প থেকে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারের বেশ কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে এখানে নতুন করে লবণ শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-মহাসড়ক সম্প্রসারণ, লবণ বোঝাই ট্রাক হয়রানি বন্ধ, চাঁনখালী খাল খনন করাই সহজে ট্রলার চলাচল করা।

এছাড়াও এখানে লবণ শিল্পের প্রসারে বিসিক শিল্প নগরীর প্রতিনিধি সবসময় তাদের সহায়তা।

একুশে/কেএ/এটি