২১ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬, শনিবার

যেভাবে খুন হন রোহিঙ্গা জানে আলম

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ১০, ২০১৯, ১০:৫৯ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: টাকা ও স্বর্ণালংকারের লোভে রোহিঙ্গা জানে আলমকে খুন করেন তার স্ত্রীর ছোট বোনের স্বামী মো. শফিক। এ কাজে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তিন সন্ত্রাসীকেও পাশে পেয়েছিলেন তিনি।

গত ৬ এপ্রিল নগরের খুলশী থানাধীন আমবাগান এলাকায় রেলওয়ে জাদুঘরের পাশ থেকে জানে আলমের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ তদন্তে নামে। এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী শফিকসহ চারজনকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার তারা দোষ স্বীকার করে চট্টগ্রাম আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে অভিযুক্তরা জানিয়েছেন, শফিকের স্ত্রী দেলোয়ারার বড় বোন বোন রহিমার স্বামী হচ্ছেন জানে আলম। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ ব্লকে থাকতেন জানে আলম। তবে রামুর হাজীপাড়া কচ্ছপিয়া গ্রামের ঠিকানায় ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করে দীর্ঘদিন সৌদিআরবে ছিলেন তিনি।

অনদিকে নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ চৌমুহনী সুলতান কলোনীতে থাকতেন রোহিঙ্গা শফিক। তিনি ভ্যানে করে ফুটপাতে বিরিয়ানি বিক্রি করতেন। দেলোয়ারা হচ্ছে শফিকের তৃতীয় স্ত্রী।

সম্প্রতি রহিমা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বামী জানে আলম। এরপর অসুস্থ বোনের সাথে হাসপাতালে থাকা শুরু করেন দেলোয়ারা। অন্যদিকে রাত হলে শফিকের বাসায় ঘুমাতে যেতেন জানে আলম।

এভাবে এক সঙ্গে চলাফেরার কারণে শফিক জেনে যায় সৌদি আরবে অনেকদিন অবস্থানের কারণে জানে আলমের কাছে প্রচুর টাকা-স্বর্ণালংকার রয়েছে। এসব হাতিয়ে নিতে দুলাভাইকে খুনের পরিকল্পনা করেন শফিক।

রাস্তা-ঘাটে বিরিয়ানি বিক্রির সুবাদে উঠতি বয়সী বখাটে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পরিচয় শফিকের। তাদের মধ্যে চৌমুহনী চারিয়াপাড়ার আাবুল বশরের ছেলে আরাফাত ওরফে ফরহাদ (১৮), মৌলভী পাড়ার প্রদীপ দাশের ছেলে রাজু দাশ (২৩) ও সুপারীওয়ালার পাড়ার আনোয়ার হোসেনের ছেলে নুর আলম ইমনকে (১৮) নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ২০ হাজার টাকায় তারা খুন করতে রাজী হয়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছুরি কেনার জন্য তিনজনকে ৫০০ টাকা দেন শফিক। তবে গত ৫ এপ্রিল রাতে ছুরি কিনতে নিউ মার্কেট গিয়ে তারা দেখতে পান দোকান বন্ধ। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে তিন ভাড়াটে সন্ত্রাসীসহ চট্টগ্রাম মেডিকেলে যায় শফিক। মেডিকেলের গেইট থেকে ৩০টাকা দিয়ে একটি ফল কাটার ছুরি কিনেন তারা।

পরে ডবলমুরিংয়ের বাসায় ঘুমাতে নিয়ে যাবার কথা বলে জানে আলমকে মেডিকেল থেকে বের করে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে চারজনে মিলে টাইগারপাস আমবাগান হয়ে আকবরশাহ মাজার গেটে নামেন। সেখানে একটি দোকানে চা-নাস্তা খেয়ে জানে আলমকে রেলওয়ে জাদুঘরের পাশে পাহাড়ের উপর তুলে শফিক।

রোহিঙ্গা জানে আলম নগরীর রাস্তাঘাট তেমন চিনতেন না। যার কারণে তার ধারণা ছিল হয়তো এ পথেও শফিকের বাসায় যাওয়া যায়। এরমধ্যে পেছন পেছন তিন ভাড়াটে সন্ত্রাসীও পাহাড়ে উঠে। জাদুঘরের দেয়ালের পাশে যেতেই রাজু ছুরি বের করলে জানে আলম চিৎকার দেয়। এরপর শফিক ও রাজু তার মুখ এবং গলা চেপে ধরে। হাত চেপে ধরে ইমন ও আরাফাত। এরপরও সে চিৎকার করলে শফিক অন্ডকোষ চেপে ধরে। তখন জানে আলম মাটিতে পড়ে যায়। এক পর্যায়ে চারজনে মিলে গলা টিপে ও ছুরিকাঘাত করে জানে আলমের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

খুলশী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, জানে আলমকে খুন করে তার স্ত্রী রহিমাকে নিয়ে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়েছিল শফিক। থানায় মামলা করার সময়ও রহিমার সাথে শফিক সার্বক্ষণিক ছিল। এমনকি মর্গে কান্নাকাটিও করে সে। পরে তদন্তে জানা যায়, খুনের পরিকল্পনাকারী শফিকই।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আমরা নিশ্চিত হয়েছে খুনের সময় শফিক ঘটনাস্থলে ছিল। লাশ উদ্ধারের দুইদিনের মধ্যেই আমরা ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি। এরপর জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করার পর তারা আদালতে খুনের কারণসহ সবকিছু স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।