২৩ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬, সোমবার

‌রাজাভুবন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিস্ময় : সন্ত্রাসী, বকলম সালামই স্কুলের সভাপতি!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১১, ২০১৯, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের আবদুস সালাম সিকদার ওরফে সালাম মেম্বার ওরফে কানা সালাম স্থানীয় রাজাভুবন হাইস্কুলের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্কুলটির প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন।

বুধবার (৯ এপ্রিল) ‌‌‘চোরের পক্ষ নিয়ে ‘প্রবাসী’ ইমামকে পুলিশের সামনেই পেঠালেন মেম্বার’ এবং বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) ‘সাজাপ্রাপ্ত ‘ডাকাত’ সালামকে বাঁচাতে নথি গায়েব!’ শিরোনোমে প্রকাশিত একুশে পত্রিকার দুটি প্রতিবেদনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষের মাঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক ভাইরাল হয় সালাম মেম্বারকে নিয়ে করা প্রতিবেদন দুটি। বিচারের আওতায় এনে সালাম মেম্বারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিসহ শত শত মানুষ কমেন্ট করে ক্ষোভ ও নিন্দা জানান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এছাড়া অনেকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে সালাম মেম্বারের অপকর্মের তথ্য পাঠাচ্ছেন একুশে পত্রিকার কাছে। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখাও পাঠাচ্ছেন। তাদের একজন রাজাভুবন হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন।

২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত তিনি স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। সালাম-মেম্বারের হুমকি-ধামকি এবং রোষানল থেকে বাঁচতে একপর্যায়ে তিনি রাজাভুবন স্কুল ছেড়ে সমিতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে হাফ ছেড়ে বাঁচেন। ওই সময় সালাম মেম্বারের দুর্ব্যবহারে কীভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন এবং স্কুল ছেড়েছিলেন সেই কথাই একুশে পত্রিকায় লিখে পাঠিয়েছেন মাইন উদ্দিন। সেটি তুলে ধরা হলো একুশে পত্রিকার পাঠকদের জন্য।

২০১০ সালে রাঙ্গুনিয়ার রাজাভুবন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। একই সময়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন রতন কান্তি পাল ও অশ্রু চক্রবর্তী।

আমার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অত্যন্ত সৎ, উচ্চ শিক্ষিত ভাল মানুষ হলেও শয়তান এবং সন্ত্রাসী বকলম এক সদস্যের দূর্ব্যবহারে দিন দিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। প্রতিটি মিটিংয়ে সবার সাথে তার খারাপ আচরণে মনটা ক্রমশ বিষিয়ে উঠলো। কিন্তু সভাপতি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। তিনি সব সময় আমাকে বলতেন, স্যার দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভাল নয়। এই সব লোক যে কোনো কিছু করে বসতে পারে।

লোকটা (সালাম মেম্বার) একবার আমাকে বলে ফেললো, পরের বার যেইভাবে হোক তিনি সভাপতি হবেন। তার কথায় আমারও মনে জিদ চেপে বসলো- আমি প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন তাকে আর কমিটিতে আসতে দিবো না। কিন্তু জোর করে তাকে তো ঠেকানো যাবে না। হঠাৎ মাথায় এলো তার ছেলে তো ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। এই একটা সুযোগ। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে অন্যান্য শ্রেণীর কিছু শিক্ষার্থীকে প্রমোশন না দিলেও ৯ম শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীকে ১০ম শ্রেণিতে প্রমোশন দিয়ে দিলাম। শিক্ষকরা কারণ জানতে চাইলে বুঝিয়ে দিলাম যে, ৯ম ও ১০ শ্রেণীর একই বই।

যথাসময়ে ভোটার তালিকা করা হলো। খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুমোদনের সময় তালিকায় কমিটির সকল সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে নিতাম। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হলে মনোনয়নপত্র প্রদানের দায়িত্ব মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে দেওয়া হলো। ওই লোক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে যখন জানতে পারলেন ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর অভিভাবক ভোটার হলেও প্রার্থী হতে পারবেন না।

উপজেলা থেকে ছুটে এসে আমার উপর প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। তার ছেলের বার্ষিক পরীক্ষার নম্বর ফর্দ নিয়ে বললেন আমার ছেলে ৮ বিষয়ে ফেল করার পরও ১০ম শ্রেণীতে কিভাবে উঠলো? আমি বললাম ১০ বিষয়ে ফেল করাদেরও এবার প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। ৯ম শ্রেণীতে কাউকে ফেল করানো হয়নি। অতপর আমার বিরুদ্ধে ইউএনও-এর কাছে মামলা করা হলো। ইউএনও স্যার সকল কাগজপত্র দেখে তাকে বললেন, তোমার ছেলে ১০ম শ্রেণীতে এবং তুমি ওই শ্রেণীর ভোটার। ভোটার তালিকার প্রতি পৃষ্ঠায় তো তোমার স্বাক্ষর আছে।

আমার উপর হামলা করা হবে বলে কতো হুমকি-ধামকি দেওয়া হলো। কিন্তু লোকটি সহজে হেরে যাওয়ার মানুষ নয়। নিজের টাকা দিয়ে ৪ জন অভিভাবককে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সাধারণ মানুষ তার উপর ছিল প্রচণ্ড বিরক্ত। প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ করলেও তার প্রার্থী ৪ জনই অপমানজনকভাবে পরাজিত হলো। নতুন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন আবারও অ্যাডভোকেট আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী।

কিন্তু লোকটি আমার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল। আমার স্থানীয় শিক্ষকদের সাথে খারাপ ব্যবহার ও হুমকি দেওয়া শুরু হলো। আমিও মান-সম্মানের ভয়ে সুযোগ খুঁজছিলাম। অবশেষে ২০১২ সালের আগস্টে সমিতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসলাম। আফসোস সেই বকলম লোকটি ঠিকই এখন ঐ স্কুলের সভাপতি। কী বিচিত্র আমাদের দেশের রাজনীতি!

### সাজাপ্রাপ্ত ‘ডাকাত’ ছালামকে বাঁচাতে রায়ের নথি গায়েব!
### চোরের পক্ষ নিয়ে ‘প্রবাসী’ ইমামকে পুলিশের সামনেই পেটালেন মেম্বার

একুশে/এসআর/এটি