রবিবার, ৫ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭

করোনা হটস্পট পটিয়া, একদিনেই সর্বোচ্চ শনাক্ত ৪৯

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুন ৩, ২০২০, ৮:৫৩ অপরাহ্ণ


পটিয়া (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা এখন করোনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে। এ উপজেলায় একদিনে সর্বোচ্চ ৪৯ জন করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত পটিয়ায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে চারজন মারা গেছেন। সুস্থ হয়েছেন ৩৭ জন।

করোনা সঙ্কটের শুরুর দিকে শনাক্তের হার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলাকে হার মানিয়েছে পটিয়া উপজেলা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই উপজেলায় হুঁ হুঁ করে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি পটিয়ার চার লাখ বাসিন্দাও।

গতকাল মঙ্গলবার রাত সোয়া ১২ টায় পটিয়া উপজেলায় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) ল্যাব হতে দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী গতকাল একদিনেই ৪৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ জাবেদ।

গতকাল শনাক্তদের মধ্যে রয়েছেন, দেড় বছরের শিশুসহ মোট ৩ জন শিশু, পটিয়া থানার এক পুলিশ সদস্য, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাসহ সরকারী দফতরের তিনজন, পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন স্বাস্থ্যকর্মী।

পটিয়া উপজেলায় করোনা পজিটিভ ৪৯ জনের পটিয়া পৌরসভায় ২৪ জন। তন্মধ্যে, পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড একজন, ৪ নং ওয়ার্ডে চার জন, ৫ নং ওয়ার্ডে এক জন, ৬ নং ওয়ার্ডে পাঁচ জন, ৭ নং ওয়ার্ডে দুই জন, ৮ নং ওয়ার্ডে ছয় জন, ৯ নং ওয়ার্ডে একজন, মুন্সেফবাজার এলাকায় একজন, খাসমহল রোড়ে দুই জন, পটিয়া সদরে একজন। এছাড়া পটিয়া থানার এক পুলিশ সদস্য, পটিয়া উপজেলা অফিসের এক জন, উপজেলা মৎস্য অফিসের দুইজন, বিভিন্ন ইউনিয়নের মধ্যে ছনহরা, আশিয়া, কেলিশহর, হাইদগাঁও ইউনিয়ন ও ধলঘাট ইউনিয়নের গৈড়লা এলাকায় এক জন করে এবং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নে পাচঁ জন, খরনা ইউনিয়নে তিনজন, কুসুমপুরা ইউনিয়নে তিন জন, শোভনদন্ডী ইউনিয়নে দুই জন, মনসা এলাকায় তিন জন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগী পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দেড় বছর, পাঁচ বছর ও ৮ বছর বয়সী তিন জন শিশু রয়েছে। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী রয়েছেন ১১ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী রয়েছেন ১০ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী রয়েছেন ১৫ জন, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী রয়েছেন ৯ জন। এদের মধ্যে গত তিন দিন আগে পটিয়া পৌরসভার করোনা আক্রান্তে মারা যাওয়া এক ব্যাংকারের পরিবারের চার সদস্যের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘পটিয়া উপজেলায় এখন আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। এই উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই শনাক্ত হচ্ছে নতুন রোগী। এ কারণে উপজেলাটি আমাদের সবার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তের হার কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছি আমরা। নির্দেশনা না মানলে আক্রান্তের হার আরও বাড়বে।’

পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা জাহান উপমা বলেন, পটিয়ায় প্রথম দিক থেকে আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তার মূল কারণ হচ্ছে প্রশাসনের সাথে জনগণের ইদুর-বিড়াল খেলা। এসব খেলার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন পটিয়াবাসীকে। শুরু থেকে প্রশাসন সমাগম রোধ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের লক্ষ্যে তৎপরতা চালিয়ে আসরেও কাজের কাজ কিছুই হয় নি। লাখ টাকা জরিমানা করে, সচেতনতার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পরও মানুষজনকে ঘরে ঢুকাতে পারি নাই। আজ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এত পরিমাণ বেড়ে গেছে যার ফলে এ অবস্থা। রক্ষা পেতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, করোনা সংক্রমণের প্রথম দিক থেকে প্রচারণা চালিয়েও কোন কাজ হয় নাই। মানুষের মাঝে কথা শোনার প্রবণতা নাই। ঈদের বাজারগুলোতে দিনের বেলায় অভিযান শুরু করলাম এবার তারা শুরু করল ভোর রাতে। ভোর রাতে শুরু করলাম তারপর তারা শুরু করল দোকানের শার্টার বন্ধ করে দিয়ে ব্যবসা। দোকানের বাইরে স্টাফদের পাহারা দিয়ে রাখত। পুলিশ কিংবা প্রশাসন আসার খবর শুনার সাথে সাথে শার্টার বন্ধ করে দিত। এমন অনেক সময় দেখা গেছে আমরা ছদ্মবেশে অভিযানে গিয়েছি খবর পেয়ে তারা পালিয়ে গেছে। লুকোচুরি খেলছি দীর্ঘদিন ধরে। এ লুকোচুরি খেলার পরিণতি আছে।

ইউএনও বলেন, উপজেলার এক প্রান্ত গেলে আরেক প্রান্তে মার্কেট খুলে দেয়। পটিয়া সদরে অভিযান শুরু হওয়ার পর মার্কেট চালু করে দেয় পটিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায়। মার্কেট নিয়ে যায় সীমান্তবর্তী এলাকায়, গ্রামের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। পটিয়া- আনোয়ারার সীমান্তবর্তী এলাকা মুরালীঘাটে গিয়ে ব্যবসা চালু করে দেয়। শান্তিরহাটে রাস্তার উপর দোকান বসে যায়। এসব ইউনিয়নগুলোর মানুষ আক্রান্ত হওয়া শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, এমনকি আজকেও মানুষের মুখে মাস্ক নাই। মানুষকে মুখে মাস্ক পরাতে পারছি না। কত ধরনের অযুহাত তারা দেখাচ্ছে। যারা ঔষধ বিক্রি করে তাদের মুখেও মাস্ক নাই। মাস্ক ছাড়া ফার্মেসিগুলিতে ঔষধ বিক্রি করে। জরিমানা করেও কাজ হয় না। প্রশাসনের সাথে দিব্যি লুকোচুরি খেলায় লিপ্ত ছিল পটিয়াবাসি।

পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় এ পর্যন্ত ১৩৭ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গত মাসের ১২ এপ্রিল ৬ বছরের এক প্রতিবন্ধি শিশুর শরীরে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। ঐ দিন রাতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। কয়েকদিন আগে পটিয়ায় একটি পরিবারের একজনের সংস্পর্শে আসা ঐ পরিবারের শিশু সহ ৯ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এরপর থেকেই সংখ্যাটা হুঁ হুঁ করে বাড়তে থাকে।

বাদ যায়নি পটিয়া হাসপাতালের করোনার নমুনা সংগ্রহকারীর পরিবারের লোকজনও। দুইজন নমুনা সংগ্রহকারীর স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা ও দুই শিশুর শরীরেও করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।