রবিবার, ৫ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭

উখিয়ার ৫ খুনে সেই রকি বড়ুয়ার হাত?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২০, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : কক্সবাজারের উখিয়ার রত্নাপালং গ্রামে রোকন বড়ুয়া নামে এক কুয়েতপ্রবাসীর বাড়িতে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁর মা-স্ত্রীসহ চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় বহুল আলোচিত-সমালোচিত রকি বড়ুয়ার সংশ্লিষ্টতা মিলছে। এছাড়া উখিয়ার মনখালী এলাকার যুবক জসিম উদ্দিন হত্যার ঘটনায়ও তার হাত দেখতে পাচ্ছে পুলিশ।

এর আগে গত ৭ মে রাতে ‘সাঈদীর মুক্তির জন্য বৈঠক, সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া কে এই রকি বড়ুয়া? শিরোনামে একুশে পত্রিকায় অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর গত ১১ মে রাতে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে রকি বড়ুয়া ও পাঁচ সহযোগিকে অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। একইদিন লালখান বাজার এলাকায় মেরিন কে এইচ টাওয়ারে রকি বড়ুয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে তার কথিত রক্ষিতা এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর রকি বড়ুয়া ও তার সহযোগিদের নানা অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করে ভুক্তভোগীরা। এ নিয়ে বিভিন্ন থানায় তার নামে একের পর এক মামলা দায়েরের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এবার উখিয়ায় এক পরিবারের চারজনকে খুনের ঘটনায়ও রকি বড়ুয়া হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুনের ঘটনাটি ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রোকন বড়ুয়ার মা সখী বড়ুয়া (৫০), স্ত্রী নিলা বড়ুয়া (২৫), ছেলে রবীন বড়ুয়া (৪) ও দেড় বছর বয়সী ছেলে সনি বড়ুয়া।

একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। খুনের ঘটনায় শুরুতে কোন ক্লু পায়নি পুলিশ। হত্যার বিষয়ে নিহত নিলার বাবা শশাংক বড়ুয়া ২৬ সেপ্টেম্বর উখিয়া থানায় যে মামলা দায়ের করেন তাতে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। খুনের সপ্তাহখানেক পরও পুলিশ আসামি ধরতে পারছিল না। যদিও এটি যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সে বিষয়ে নিশ্চিত হয় পুলিশ। কারণ বাড়িতে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার থাকলেও কোনো মালপত্র খোয়া যায়নি।

খুনিরা হত্যা করে এক তলা ভবনটির ছাদের দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। ছাদের দরজা ভেতর থেকে খোলা হয়েছে। গাছের একটি ডাল ধরেই ছাদ থেকে ঘাতকরা নেমে গেছে। ওই গাছের ভাঙা একটি ডালও আলামত হিসেবে নেন তদন্ত কর্মকর্তারা। বাড়ির পেছনে ধানক্ষেতে ছিল খুনিদের পায়ের চিহ্ন। সেখানে দিয়ে খুনিরা পালিয়ে যায় বলে নিশ্চিত হয় তদন্তকারীরা।

মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ চারজনকে খুনের ঘটনার কয়েকদিন পর শোকাহত রোকন বড়ুয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে ফোন করেন তার ভায়রাভাই অসীম বড়ুয়া। সে সময় অসীমের সঙ্গে রকি বড়ুয়াও রোকনের বাড়িতে যায়। অসীম ফোন করে তখন রোকনকে জানায়, রকি বড়ুয়া তার বন্ধু ও অনেক প্রভাবশালী মানুষ। সে চাইলে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করতে পারবে।

রোকনও তাদের সহযোগিতা কামনা করেন, আকুতি জানান হত্যার আসামি শনাক্তে সাহায্য করতে। এরপর শিপু বড়ুয়া ও উজ্জ্বল বড়ুয়া নামের দুইজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে উখিয়া থানা পুলিশ। যদিও তাদের কাছ থেকে হত্যার কোন ক্লু বের করা যায়নি। তৎকালীন উখিয়া থানা ও কক্সবাজারের পুলিশ কর্মকর্তারাও রকি বড়ুয়ার প্রতি ‘দুর্বল’ ছিলেন, রকি বড়ুয়ার ইশারায় শিপু ও উজ্জ্বল গ্রেপ্তার হয়েছে বলে উখিয়ায় আলোচনা আছে।

পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই কক্সবাজার জেলার পরিদর্শক পুলক বড়ুয়া। গত ১১ ডিসেম্বর উক্ত মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে রোকনের ভায়রাভাই সেই অসীম বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করে বসেন তিনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে রোকন বড়ুয়ার স্ত্রী নিলা বড়ুয়ার মোবাইল ফোনে অসীম বড়ুয়ার নাম্বার থেকে একটি কল আসে। কলটি আসে হত্যাকাণ্ডের রাতে, সাড়ে ১১ টার দিকে। সেই কলের সূত্র ধরেই অসীম বড়ুয়াকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর অসীম বড়ুয়াকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন জানায় পিবিআই। ১৮ ডিসেম্বর শুনানি শেষে অসীম বড়ুয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তবে অসীম বড়ুয়াকে রিমান্ডে নিয়েও হত্যার কোন ক্লু বের করতে পারেনি পিবিআই।

এরপর গত ১০ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের জেলা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত অসীম বড়ুয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। সেদিন জামিন শুনানির সময় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মামলার বাদী ও অসীম বড়ুয়ার শ্বশুর শশাংক বড়ুয়া দাবি করেন, তার মেয়ের জামাই নির্দোষ!

অন্যদিকে সন্দেহজনকভাবে প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া শিপু বড়ুয়া ও উজ্জ্বল বড়ুয়া এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

হত্যার শিকার মিলা বড়ুয়ার স্বামী রোকন বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, কোন এক অদৃশ্য কারণে মামলার বাদী আমার শ্বশুর শশাংক বড়ুয়া অসীম বড়ুয়াকে নিরপরাধ দাবি করেছেন। ফলে জামিন পায় অসীম বড়ুয়া। এর নেপথ্যেও রকি বড়ুয়ার হাত রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই অসীম বড়ুয়া আমাকে রকি বড়ুয়ার শরণাপন্ন হওয়ার জন্য বারবার বলে আসছিলো।

রোকন বড়ুয়া আরও বলেন, অসীম বড়ুয়া জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই আমি আতংকে আছি। নানাভাবে, নানাদিক থেকে আমার উপর চাপ আসছে। তবে রকি বড়ুয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে একটু স্বস্তিতে আছি। কারণ তার প্রভাবেই এই মামলা প্রভাবিত হয়ে আসছিল। তার প্রভাবে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও পরিবর্তন হয়েছে চারবার।

বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই কক্সবাজার জেলার পরিদর্শক ক্যা চি নু চাকমা। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি রয়েছে। রকি বড়ুয়ার প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও মাথায় রয়েছে আমাদের। কিছু ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট হাতে আসেনি এখনো। করোনাভাইরাসের কারণে রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হচ্ছে। রিপোর্ট হাতে এলেই হয়তো ঘটনার নেপথ্যে থাকা আরও তথ্য বের হয়ে আসবে।

এদিকে গত বছরের ২৮ জুলাই উখিয়া মনখালী মেরিন ড্রাইভের পাশ থেকে জসিম উদ্দিন নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি মনখালী গ্রামের মৃত ছিদ্দিক আহম্মদ মেম্বারের ছেলে। লাশ উদ্ধারের সময় জসিমের দেহে আঘাতের চিহ্ন পায় পুলিশ।

একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, জসিম খুনের মামলাটির তদন্তে নেমে পুলিশ রকি বড়ুয়ার সংশ্লিষ্টতা দেখতে পায়। কিন্তু প্রতিবেশী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট, দেশ-বিদেশের ক্ষমতাবানদের সঙ্গে রকি বড়ুয়ার সখ্যতার গল্প শুনে তাকে আইনের আওতায় আনতে দ্বিধাদ্বন্ধে ছিল পুলিশ।

রকি বড়ুয়ার বিষয়ে এগুতে চাইলে তদন্তকারীদের থামিয়ে দেয়া হয় ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে। একুশে পত্রিকায় রকি বড়ুয়াকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশের সে ঘোর কেটে গেছে। এখন রকিকে জসিম হত্যা মামলায় আসামি করার পথে হাঁটছে উখিয়া থানা পুলিশ।

জসিম খুনের মামলাটি ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সিদ্ধার্থ সাহা তদন্ত করছেন। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, জসিম খুনের সবকিছু এখন আমার কাছে পরিষ্কার। আশা করছি, তদন্ত খুব দ্রুত শেষ করতে পারবো।

এ বিষয়ে উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তার একুশে পত্রিকাকে বলেন, জসিম হত্যা মামলা নিয়ে আগে কী হয়েছে না হয়েছে আমি জানি না। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে উখিয়া থানায় যোগ দেয়ার পর রহস্য উদঘাটন না হওয়া মামলাগুলো খতিয়ে দেখা শুরু করেছি। শিগগিরই জসিম খুনের তদন্ত শেষ করা হবে।

# সেই রকি বড়ুয়াকে গ্রেফতারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে লোহাগাড়া
# বিদেশি পিস্তল ও রক্ষিতাসহ সেই রকি বড়ুয়া গ্রেপ্তার
# র‌্যাবের ভয়ে ৩ তলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে রকি বড়ুয়ার এই হাল!
# রকি বড়ুয়ার কাছে ৩৫ লাখ টাকার এফডিআর পেয়েছে র‌্যাব
# সেই রকি বড়ুয়া ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের ৪ মামলা
# সেই রকি বড়ুয়ার বিরুদ্ধে এবার ধর্ষণ চেষ্টা ও চাঁদাবাজির মামলা
# রকি বড়ুয়ার নিরাপত্তায় ৬ ভারতীয় পুলিশ!
# সাঈদীকে মুক্ত করতে রকি বড়ুয়ার নেতৃত্বে বৌদ্ধ বিহারে হামলা : র‌্যাব
# বৌদ্ধ বিহারে ভাংচুর: রকি বড়ুয়ার ‘ডানহাত’ জাহাঙ্গীরের দোষ স্বীকার