চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলো এত শক্তিশালী কেন?

ইমরান এমি : দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি হাসপাতালগুলো। সরকার ৫০ বেডের বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কোভিড সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও সেটা অনেকেই মানছেন না। আবার অনেক হাসপাতাল চাপের মুখে পড়ে ২-৪ জন রোগী ভর্তি করে দায় সারার চেষ্টা করলেও প্রকৃতপক্ষে সেবাবিমুখ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের ক্লিনিক মালিকগুলো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি জামায়াতের সাথে জড়িত চিকিৎসকরা কখনো এককভাবে, কখনোবা সম্মিলিতভাবে গড়ে তুলেছে এসব হাসপাতাল। ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদেরও কেউ কেউ ক্লিনিক ব্যবসার সাথে জড়িত।

চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়স্থ মেডিকেল সেন্টার আবুল খায়ের গ্রুপের মালিকানাধীন হাসপাতাল। এটি পরিচালনা করেন আবুল খায়েরের জামাতা, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক।

এছাড়া চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন হাসপাতাল, ন্যাশনাল হাসপাতাল, চান্দগাঁও ফরিদার পাড়া এলাকার চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল, পাহাড়তলী আল আমিন হাসপাতাল জামায়াত সমর্থিত ডাক্তারদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের ডাক্তাররা পরিচালনা করেন।

মেট্রোপলিটন ও ন্যাশনাল হাসপাতাল থেকে বের হয়ে জামায়াত সমর্থিত ডাক্তারদের একটি অংশ নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার পার্কভিউ হাসপাতাল গড়ে তুলেন। প্রবর্তক মোড়ের কাছে সিএসসিআর হাসপাতালটি ড্যাব নেতা সাবেক চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী ডা. এম এ ফয়েজ ছাড়াও আওয়ামী লীগ, বিএনপির প্রায় ৪০ জন চিকিৎসক মিলে গড়ে তুলেছেন।

নগরের মির্জাপুর এলাকার ডেল্টা হাসপাতালটি প্রায় ১৫০ জন চিকিৎসক ও ব্যবসায়ী মিলে গড়ে তুলেছেন। ট্রিটমেন্ট হাসপাতালের মালিক নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন এবং একদল চিকিৎসকের গড়া বায়েজিদ এলাকার মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

এছাড়াও নগরীর রয়েল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, বেলভিউ ও সেবা হাসপাতাল আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকরা পরিচালনা করছেন। চিকিৎসক ও কয়েকজন ব্যবসায়ী যৌথভাবে পরিচালনা করছেন শেভরন হাসপাতাল।

তথ্য মতে, এসব বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৫০ বেডের হাসপাতাল রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ন্যাশনাল হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, ডেল্টা হাসপাতাল, সিএসসিআর, রয়েল হাসপাতাল, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল।

জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গত শুক্রবার (১২ জুন) পর্যন্ত চট্টগ্রামের ২০টি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা সন্দেহের রোগী ভর্তি ছিল ২৬৭ জন, করোনা রোগী ভর্তি ছিল ৩৬ জন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল ২৫ জন, রোগী ভর্তি না করে ফিরিয়ে দিয়েছে ১২ জন, খালি বেড ছিল ৮২৭ টি ও মোট বেড আছে ১৫৯০টি।

তার মধ্যে রোগী ভর্তি না করে মেডিকেল সেন্টার ফিরিয়ে দিযেছে ৩ জন, ভেন্টিলেটর খালি না থাকায় ২ জন রোগী ফিরিয়ে দিয়েছে সিএসটিসি হাসপাতাল।

পার্কভিউ হাসপাতালে করোনা সন্দেহে ভর্তি আছে ২৬ জন, করোনা আক্রান্ত আছে ৬ জন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে ৭ জন। তারা রোগী ফিরিয়ে দিয়েছে ৪ জন। সিএসসিআর হাসপাতালে ১২ জুন পর্যন্ত করোনা সাসপেকটেড রোগী ভর্তি ছিল ৬ জন, করোনা রোগী ৩ জন। হাসপাতালটিতে ৮২টি বেডের মধ্যে ৩৮ টি বেড খালি থাকলেও চিকিৎসক স্বল্পতা ও অসুস্থতার অজুহাতে ভর্তি বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, ন্যাশনাল হাসপাতালে করোনা সন্দেহের রোগী ভর্তি আছে ১১ জন। এছাড়া করোনা রোগী ৬ জন, আইসিইউতে ৫ জন রোগী ভর্তি ছিল বলে জেলা প্রশাসন তথ্য দিয়েছে। এ হাসপাতালের ১শটি বেডের মধ্যে খালি আছে ৩৭ টি। বন্ধ রাখা হয়েছে আইসিইউ ভর্তি।

গত শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে করোনা সাসপেকটেড রোগী ভর্তি ছিল ১৪ জন, করোনা রোগী ভর্তি ছিল ২ জন। হাসপাতালটি ফিরিয়ে দিয়েছে ২ জন রোগী। এ হাসপাতালে ৭০ টি বেডের মধ্যে ১১টি খালি আছে এবং বন্ধ রাখা হয়েছে আইসিইউ ভর্তি।

চট্টগ্রাম ডেল্টা হাসপাতালে করোনা সন্দেহের রোগী ভর্তি আছে ৩৫ জন, করোনা রোগী আছে ৪ জন, ফিরিয়ে দিয়েছে এক জন রোগীকে। ডাক্তার ও নার্স সংকটের অজুহাতে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালটির আইসিইউ সেবা।

ওয়াকিবহাল সূত্র মনে করছে, জেলা প্রশাসনকে রোগী ভর্তি বা চিকিৎসাসেবা প্রদানের যে তথ্য বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিয়েছে, প্রকৃতপক্ষে বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। বাস্তবতার সাথে এই তথ্যের কোনো মিল নেই।

সরকার ৫০ শয্যার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগী ভর্তির বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দিলেও অনেকে সেটা মানছে না। করোনা রোগী দূরের কথা, সাধারণ রোগীও ভর্তি নিচ্ছে না তারা। যার কারণে সাধারণ জনগণের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, এসব হাসপাতালেল পিছনে শক্তি কারা? সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো এত স্পর্ধা কীভাবে দেখায় তারা।

অবশ্য কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মতো করে একটা জবাব দেন বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী।

‘হায়রে বাণিজ্য, হায়রে মানবিকতা’ শীর্ষক এক ফেসবুক পোস্টে মুহাম্মদ সুলতান নামে এক ব্যক্তি প্র্শ্ন করেন বেসরকারি হাসপাতালগুলো কেন এতো শক্তিশালী? আগ বাড়িয়ে চিকিৎসক নেতা ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী এই প্রশ্নের জবাবে দেন; লিখেন-‘কারো বাপের টাকায় হাসপাতাল করে নাই, নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে করেছে তাই।’

এদিকে, গত ১০ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নগরীর মেডিকেল সেন্টার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল ও পার্ক ভিউ হাসপাতালে ঘুরে কো্থাও ভর্তি হতে পারেননি বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম ছগীর। শেষে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সুপারিশে বিকেলে পার্কভিউতে ভর্তি করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান। তার অবহেলাজনিত মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করে বক্তৃতা-বিবৃতি দেন অনেকে।

গত ১১ জুন নগরের পার্কভিউ, ম্যাক্স, মেট্রোপলিটন হাসপাতালে করোনা সন্দেহে ভর্তি নেয়নি নগর বিএনপির সহ সভাপতি লায়ন মো. কামাল উদ্দিনকে। মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি নিলেও সময় মতো অক্সিজেন পাননি তিনি। পরে ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে মারা যান কামাল উদ্দিন।

গত ১০ জুন বুধবার মধ্যরাতে জিইসি মোড়ের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বণিক বার্তার চবি প্রতিনিধি জোবায়ের চৌধুরীর বাবা জসিম উদ্দিন চৌধুরী। তাকে ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।

জোবায়ের চৌধুরী বলেন, হাসপাতালের একজন কর্মচারী অক্সিজেন সেচ্যুরেশান মেপে দেখেন ৮৯। সে মুহূর্তে অক্সিজেন সেবার দরকার থাকলেও তা নিশ্চিত না করে ফ্লু কর্নারে শয্যা খালি নেই উল্লেখ করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তারও আগে ৩১ মে বিকেলে হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এছাক ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজী মোহাম্মদ ইউনুছ। অসুস্থ হলে সচরাচর তিনি চিকিৎসা করান মেট্রোপলিটন অথবা মেডিকেল সেন্টারে। এই দুই হাসপাতালের কোথাও ভর্তি হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি এশিয়ান হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে রাতে আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হলে উক্ত দুই হাসপাতালে আইসিইউ বেডেরে কাছে আকুতি জানান হাজী ইউনুছের স্বজনরা। কিন্তু এতটুকুন মন গলেনি কারো। শেষপর্যন্ত রাত ১০টার দিকে একপ্রকার বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সজ্জন ব্যবসায়ী, দানবীর হাজী মোহাম্মদ ইউনুছ।

এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিএমএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ডা. নাসির উদ্দীন মাহমুদের সাথে। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, করোনা মহামারীতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি না করানো তাদের রাজনৈতিক শক্তির কারণ। সরকার যদি শক্ত হাতে এদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যায় তাহলে তারা রোগী ভর্তি করাতে বাধ্য। বর্তমান যে কমিটি গঠন করা হয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল তদারকির জন্য তারা ভালো কাজ করছে, তবে তাদের আরো বেশি শক্ত হতে হবে। যোগ করেন ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বদিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা নিয়মিত তদারকি করছি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। কোভিড সংক্রমিত ও কোভিড সন্দেহজনক রোগীদের যেন ভর্তি করা হয় সে বিষয়ে আমরা হাসপাতালগুলোকে বলছি। প্রায় হাসপাতাল রোগী ভর্তি নিচ্ছে, তবে সেটা পর্যাপ্ত নয়।

আমরা চাইলে কঠোর হতে পারি, কিন্তু তাতে করে তো সেবা নিশ্চিত হবে না। তারপরও আমরা কঠোর হবো, যদি কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়। বলেন এই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও সিইও ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি নিচ্ছে না। তারা নানা অজুহাতে রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে। এ সময়ে এমন অমানবিক আচরণ কাম্য নয়। সরকার যদি একটু কঠোর হয়, তাহলে রোগী ভর্তি করতে তারা বাধ্য।