মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

বাসা ভাড়া দিতে সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাই!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুলাই ১, ২০২০, ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ


চট্টগ্রাম : করোনাকালে গাড়ি চলাচল সীমিত থাকায় বাসা ভাড়া দিতে পারেননি সিএনজি অটোরিকশা চালক জুয়েল (২৫) ও বাস চালক বেলাল (২৬)। এ নিয়ে নিয়মিত বাড়িওয়ালার অপমান সহ্য করতে হতো তাদের। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে তারা খুঁজতে থাকেন টাকা উপার্জনের ‘শর্টকার্ট’ পথ। এক সময় দুইজন মিলেই সিদ্ধান্ত নেন সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাই করার। যে সিদ্ধান্ত সেই কাজ।

গত ২৮ জুন (রোববার) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর বড়পুল এলাকা থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ফিশারীঘাট যান জুয়েল ও বেলাল। এরপর ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন বলে সেখান থেকে ইপিজেড স্টিলমিল খালপাড় এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাত করে চালককে আহত করে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। পরে আহত চালকের তথ্যের ভিত্তিতে ২৯ জুন (সোমবার) ভোরে নগরীর অক্সিজেন মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিএনজিসহ উক্ত দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে ইপিজেড থানা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি ধারালো ছোরা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার উভয়ের বাড়ি কিশোরগঞ্জ৷ জেলায়। সম্পর্কে তারা খালাতো ভাই।

পুলিশ জানায়, পেশায় সিএনজি অটোরিকশা চালক জুয়েল হালিশহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। বেলাল আগ্রাবাদে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে লকডাউনের কারণে সিএনজি অটোরিকশা চালাতে না পেরে মারাত্মক অর্থকষ্টে পড়েন তারা দুজনেই। ইতোমধ্যে ৩১ হাজার ৫শ’ টাকা বাড়ি ভাড়া জমে যায় জুয়েলের। কোনমতে ধার দেনা করে বাড়ির মালিককে ১৭ হাজার টাকা দিয়ে পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়েও রক্ষা হয়নি। বাড়ির মালিকের চাপে শেষ পর্যন্ত বাসা ছাড়তে বাধ্য হয় জুয়েল। এরপর টাকা উপার্জনের ‘শর্টকার্ট’ পদ্ধতি খুঁজতে শুরু করেন তিনি। ২৬ জুন রাতে নগরীর বড়পোল মোড়ে বেলালকে নিয়ে পরিকল্পনা করে জুয়েল।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৮ জুন (সোমবার) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে জুয়েল ও বেলাল নগরীর বড়পোল থেকে ১৫০ টাকা ভাড়ায় ফিশারীঘাট যাওয়ার জন্য মামুন নামে এক প্রতিবন্ধীর সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে। ফিশারীঘাট পৌঁছালে বর্ধিত ভাড়ার আশ্বাসে তাদেরকে ইপিজেড থানা এলাকার স্টিলমিল খালপাড় নিয়ে যেতে বলে। চালক মো. মামুন তাদের স্টিলমিল খালপাড়ে নিয়ে যাওয়ার পথে রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পুকুর পাড় তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছলে তারা চালক মামুনকে গাড়ি থামাতে বলে। গাড়ি থামানোর সাথে সাথেই তারা গাড়ি থেকে নেমে প্রতিবন্ধী সিএনজি চালক মামুনের পেটে ও ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেন। এ সময় টেনে হিচড়ে মামুনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করে সিএনজি অটোরিশা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।

এরপর খবর পেয়ে ইপিজেড থানার একটি দল তৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত মামুনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে একদিন ভোরে সাড়ে ৫টার দিকে নগরীর অক্সিজেন মোড়ের চৌধুরী ভবনের সামনে থেকে ছিনতাইকৃত সিএনজি অটোরিকশাসহ ছিনতাইকারী জুয়েল ও বেলালকে গ্রেপ্তোর করে।

ইপিজেড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, বাস চালক মো. মামুন সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়ে সংসার চালাতে এখন মাঝরাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা চালায়। সেদিন সে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বের হলে জুয়েল ও বেলাল তাকে ভাড়ায় যাওয়ার কথা বলে কৌশলে ইপিজেড ইস্টার্ন রিফাইনারির মোড়ে নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাত করে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা ভেবেছে মামুনের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু মামুনের কোমরে টাকা নেওয়ার ব্যাগ থাকার কারণে ছুরির আঘাত পেটে লাগেনি তেমন। পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিএনজি অটোরিকশাসহ ছিনতাইকারী দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) তারা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।

পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, এ ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রতিবন্ধী মামুনের পরিবার নিঃস্ব হয়ে যেত, যদি পুলিশ দ্রুত সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অক্ষম হতো। গ্রেপ্তার জুয়েল ও বেলাল পেশাদার অপরাধী নয়। অভাবের তাগিদে, পরিবারের প্রয়োজনে তারা সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে।