ভেজাল সুরক্ষাসামগ্রীতে বাজার সয়লাব, মৃত্যুঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা


একুশে প্রতিবেদক : আব্দুর রহমান। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। রোববার (১২ জুলাই) অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে ভ্রাম্যমাণ এক দোকানির কাছ থেকে হ্যান্ডস্যানিটাইজার কেনেন। রাতে ব্যবহারের পরে তার শরীরে ফোসকা ও হাতে চুলকানির মতো দেখা দেয়। স্যানিটাইজারের বোতলের মুখে কোনো উৎপাদন তারিখ আর প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল না।

সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে নগরের জিইসি এলাকায় আব্দুর রহমানের সাথে কথা হয় একুশে পত্রিকার। তিনি জানান, হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহারের পর তার হাতে চুলকানির সাথে সাথে লাল হয়ে উঠে। এর কারণ জিজ্ঞেস করার জন্য তিনি বিক্রেতাকে খুঁজলেও, তার দেখা পাননি। তবে একই ধরনের হ্যান্ড স্যানিটাইজার তিনি নগরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির কথা জানিয়েছেন।

করোনা মহামারির সংক্রমণ রোধে মানুষ দ্বারস্থ হচ্ছেন সুরক্ষাসামগ্রীর। ফলে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এসব পণ্যের চাহিদা এখন বেশি। এই সুযোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা, হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে ছড়িয়ে পড়েছে ভেজাল, নিম্মমানের ও অননুমোদিত তরল সুরক্ষাসামগ্রী।অনেকক্ষেত্রে এসব পণ্য কসমেটিকস দোকান কিংবা ফার্মেসিতেও সয়লাব।

মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের ফলে স্কিন ক্যান্সার, এমনকি মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন মেডিসিন ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পণ্যের গুণগত মান এবং সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের তৈরি তরলসুরক্ষা ব্যবহারেও উপর জোর দিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল (সিইও) ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, সময়ের তাগিদে অনেকে অননুমোদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারে। কিন্তু ব্যবহারের পূর্বে আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব হেলথ পণ্যগুলো বিএসটিআই, সরকারের অনুমোদন ও ভ্যাট প্রদান করে কিনা। কেননা যেসব উপাদানসমূহ এখানে ব্যবহার করা হয়, সেগুলো আনুপাতিক হারে না থাকলে সাময়িক ব্যবহারে শরীরে বিভিন্ন উপসর্গ হতে পারে। আর দীর্ঘ সময় ব্যবহার হলে স্কিন ক্যান্সার হতে পারে। আর যে কাজে এটি ব্যবহার করতে চাচ্ছি সেটাই পূরণ করা গেলো না।

হকার বা রাস্তার পাশ থেকে এসব পণ্য না কিনতে এবং পণ্য কেনার পূর্বে সরকারের অনুমোদিত এবং পণ্যের লাইসেন্স যাচাই করে কিনতে সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

সূত্র জানায়, জনসমাগকে কাজে লাগিয়ে নগরের ব্যস্ততম মুরাদপুরের ওভারব্রিজ ও এর আশেপাশ, জিইসি, আগ্রাবাদ মোড়, দেওয়াট হাট মোড়, কাজির দেউড়িসহ বেশ কিছু এলাকায় এসব পণ্য বিক্রি হরদম চোখে পড়ে।

এসব পণ্যের গায়ে কোনো উৎপাদন তারিখ কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ থাকে না। প্রথমদিকে এসব পণ্য নগরে সীমাবদ্ধ থাকলেও পুরোদমে এসব সামগ্রী এখন উপজেলায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে ২০ থেকে ৪০, ৬০ থেকে ৯০ টাকা ধরে দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা। অনেকক্ষেত্রে চাহিদা বুঝে এসব পণ্যের মূল্য ঘষে কমিয়ে, বাড়িয়ে বিক্রি করেন। আর ক্রেতারাও ঝুঁকছেন এসব পণ্যের দিকে।

করোনার প্রথম থেকে ভেজাল সুরক্ষাসামগ্রী তৈরী কারখানার দৌরাত্ম্য কমাতে কাজ করে যাচ্ছে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অব্যাহত অভিযানের মুখে জরিমানা আর সিলগালা সত্ত্বেও এসব অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না। নামে-বেনামে তৈর করে চালাচ্ছে ভেজাল কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিরীণ আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, করোনার প্রথম থেকেই হ্যাক্সিসল বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরা রাতারাতি অধিক লাভের আশায় এসব পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছে। আমরা অভিযোগ পেলেই তরিৎ ব্যবস্থা নিচ্ছি, অভিযান চালাচ্ছি। এমন অভিযান সামনেও অব্যাহত থাকবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হ্যাক্সিসল বা হ্যান্ডস্যানিটাইজার প্রস্তুত করতে সর্বোচ্চ ৭৫ এবং সর্বনিন্ম ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। এর বাহিরে মিথানল ছাড়া অন্য কোনো রাষায়নিক সামগ্রী ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু চট্টগ্রামে ওষুধ প্রশাসনের বাইরে আগ্রাবাদ এলাকায় অন্য রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে স্যানিটাইজার তৈরির খবর পায়।

এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইমরান হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, কারখানাটিতে কী দিয়ে এসব পণ্য তৈরী করছে তারা নিজেরাও জানে না, আমরাও জানি না। তারা বিভিন্ন রঙ দিয়ে এসব তৈরি করছে। পরে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেই। এজন্য কোনো হকার থেকে এসব না কিনতে মানুষকে অনুরোধ করছি। দোকানে বিক্রি হলে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, কিন্তু হকারদের উচ্ছেদ করলেও কিছুক্ষণ পরে আবার এসে বসে পড়ে।

ইমরান হোসেন বলেন, করোনা প্রথম দিকে তরল সুরক্ষাসামগ্রীর সংকট ছিল। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকিতে ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠান এসব তৈরি করছে। মার্কেটে কোনো সংকট নেই। কিন্তু প্রতারণা করে, ওষুধ কোম্পানি নয় এমন ভেজাল পণ্য ব্যবহার করলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিষাক্ত রাষায়নিক দ্রব্য হাতে স্পর্শ করে চোখ গেলে চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মুখে গেলে মারা যেতেও পারে। তাই স্পর্শকাতার বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আরও যত্নশীল হতে হবে।

একুশে/আরকেে/এটি