বায়েজিদ লিংক রোডে ট্রাক স্টেশন, নেপথ্যে কার হাত?

ইমরান এমি : চট্টগ্রামের বায়েজিদ-সীতাকুণ্ড লিংক রোডের সীতাকুণ্ড অংশে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে দুই পাশে সারি সারি ট্রাক। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালাবদলের মতো রাস্তা দখল করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে ট্রাক, যেন জগতের সবচেয়ে নিরাপদ পার্কিং এটি। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ট্রাকের ভারে প্রবেশ মুখের কালভার্টটি যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশংকা করছেন স্থানীয়রা।

শুধু তা নয়, ট্রাকগুলো রাস্তা দখল করে রাখায় নতুন এই সড়ক দিয়ে সারাক্ষণ লেগে থাকে যানজট। ফলে মাত্র ৬ মিনিটে ৬ কিলোমিটারের এই রাস্তাটি পাড়ি দেয়ার কথা থাকলেও এখন পাড়ি দিতে সময় লাগছে ক্ষেত্রবিশেষে একঘণ্টা। এতে নিত্য ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই সড়ক দিয়ে চলাচলাকরীদের।

অভিযোগ ওঠেছে, স্থানীয় সলিমপুর ইউপি চেয়রম্যান সালাহউদ্দিন আজিজ চালু হতে না হতেই সড়কটিকে নিরাপদ ট্রাক স্টেশনে পরিণত করেছেন। সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্কিংয়ের সুযোগ প্রদানের বিনিময়ে প্রতি ট্রাক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা। আর এই কাজে তিনি নিয়োজিত করেছেন তার বড়ভাইকে।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আজিজ। বরং বিষয়টিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম জড়িত আছেন দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, এটার সাথে আমার ভাই জড়িত নয়। তার বয়স ৭৮ বছর চলছে। সে একজন ব্যবসায়ী ও নামাজি মানুষ। সে তো এসব ধান্দাবাজিতে জড়িত থাকবে না। এগুলো এমপি দিদার সাহেবের এবং কেএসআরএম, বিএসআরএমের গাড়ি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বারআউলিয়া, মিরসরাই বিএসআরএম, কবির স্টীল ও জিপিএইচে যায়।


চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আজিজের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে সোমবার (২০ জুলাই) সারাদিন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. দিদারুল আলমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দিনভর চেষ্টা শেষে সন্ধ্যার দিকে এমপি দিদারকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়। তবে তিনি কথা বলতে পারেননি। পরপর চারবার তিনি ফোন রিসিভ করেন, কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে তার কোনো কথা শোনা যাচ্ছিল না।

এদিকে, সারি সারি ট্রাক পার্কিং করে সড়কটিতে নৈরাজ্য সৃষ্টির বিষয়টি অবগত আছেন জানিয়ে ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট খায়রুল হাসান একুশে পত্রিাকে বলেন, এই রাস্তায় ট্রাক পার্কিং করে ড্রাইভাররা রেস্ট নিতে আসে। বেশিরভাগই ভাসমান গাড়ি। আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করি, মামলা দিই। যেহেতু আপনি (প্রতিবেদক) বলেছেন বিষয়টি আমরা আবারও গুরুত্ব দিয়ে দেখব।

সড়কটি নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তারাই সড়কটির তত্ত্বাবধায়ক। জানতে চাইলে সিডিএ নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাস জানান, এর আগেও আমরা কয়েকবার এসব স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু তারা আবারো সেখানে এমন স্ট্যান্ড করে ফেলে। মূলত সেখানে একটি ট্রাক সমিতি আছে, তারাই এটি করছে। এখন যেহেতু আবার বসিয়েছে, এখন আমরা পুনরায় ব্যবস্থা নিবো।

এদিকে বিষয়টির দায় নিতে রাজি নয় সীতাকুণ্ড থানা, হাইওয়ে পুলিশ কেউ। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ মোল্লা বলেন, বিষয়টা হাইওয়ে পুলিশ দেখে, সড়কটি তাদের আওতাধীন। তাদের সাথে আলাপ করুন, তারাই ভালো বলতে পারবে।

বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মাহবুবর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও পাশ কেটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, এটা থানা পুলিশ দেখে। তারপরও আমাদের যে ফাঁড়ি আছে তাদের বলে দিব বিষয়টা দেখার জন্য।


প্রসঙ্গত, ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নির্মিত ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ সড়কটি গত মার্চ মাসে যানচলাচলে উন্মুক্ত করা হয়। এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা গাড়িগুলো উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাইসহ সন্নিহিত অঞ্চলে কিংবা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ দক্ষিণ শহরে প্রবেশ না করে গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা।

যানচলাচলের পাশাপাশি এই সড়ক সংলগ্ন পুরো এলাকাটি আবাসন, পর্যটন ও শিল্পায়নের নেটওয়ার্কে চলে আসার কথা ছিল। নতুন বিনোদন স্পট হিসেবেও রাস্তাটি জমজমাট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে সড়কটিতে ট্রাক পার্কিং গড়ে ওঠার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ৬ কিলোমিটার সড়কের প্রায় পুরোটাতে। এর ফলে সৃষ্ট যানজটে নাকাল হচ্ছে ১৫টি পাহাড়ের বুক চিড়ে গড়ে ওঠা সড়কের পাহাড়ি পথ ধরে চলাচলরতরা।