সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬ আশ্বিন ১৪২৭

‘অভ্যুত্থান বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সতর্কতা আমলে নেননি বঙ্গবন্ধু’

প্রকাশিতঃ শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২০, ৮:১০ পূর্বাহ্ণ


বাসস : একজন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক বলেছেন যে, ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের নিরিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি আসন্ন অভ্যুত্থানের কথা অবহিত করেছিলেন। যদিও ওই সময় দেশটির শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা সম্পর্কে নানা জল্পনা-কল্পনা চালু রয়েছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ ব্যুরোর বাংলাদেশ ডেস্কের স্টিফেন আইজেনব্রাউন এ হত্যাকা-ের বেশ কয়েক বছর পর এক সাক্ষাৎকারের বলেন, ‘শেখ মুজিবকে তার জীবননাশের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা আমাদের ‘নৈতিক দায়িত্ব’ ছিল কিনা তা নিয়ে (স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের মধ্যে) আলোচনার কথা মনে পড়ে।

তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের ডিসি’র স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, ‘হ্যাঁ, আমাদের এ দায়িত্ব রয়েছে’ এবং রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টারকে বাংলাদেশের স্থপতিকে তাঁর জীবনের সম্ভাব্য হুমকির কথা জানাতে বলা হয়েছিল।

আইজেনব্রাউন বলেন, সম্ভবত ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ের শেষের দিকে বা আগস্টের শুরুতে কিছু খসড়া টকিং পয়েন্ট নিয়ে রাষ্ট্রদূত বঙ্গবন্ধুর কাছে যান।

কর্মকর্তা স্মরণ করেন, ‘যাই হোক, বোস্টারকে যা বলতে বলা হয়েছিল তার সারমর্ম হল, আমরা অভ্যুত্থানের অনেক হুমকি এবং আপনার বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকির বিষয়ে শুনেছি। তিনি কারো নাম উল্লেখ করেননি। তিনি মুজিবকে কেবল সাবধান হওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলেন।’

আইজেনব্রাউন আরো বলেন : “আমার যতটুকু মনে আছে, মুজিব এ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন (হুমকি) এবং বলেছিলেন, চিন্তা করবেন না, আমি আমার লোকদের জানি; তারা আমাকে ভালবাসে এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন কূটনীতির মৌখিক ইতিহাসের সংগ্রহ অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোমেটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিং (এডিএসটি)’তে তার সাক্ষাৎকার রয়েছে, যেখানে আইজেনব্রাউন বাংলাদেশের স্বাধীনতার কয়েক বছর পরে বলেন, ‘অভ্যুত্থানের, এমনকি মুজিবের জীবনের হুমকির ছক তৈরি হয়ে গেছে।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাবেক পররাষ্ট্র কর্মকর্তা স্মরণ করেন, ‘বাংলাদেশের লোকেরা দূতাবাসকে এটি (চক্রান্ত) ফিসফিস করে বলত। এই খবরটি ওয়াশিংটনে এত দৃঢ়ভাবে এসেছিল যে এ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে এটি নিছক ‘অলস আলাপ’ নয়। শেখ মুজিবের জীবন বিপদাপন্ন বলে মনে হয়েছিল।’

এডিএসটি গবেষক চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডি ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে এই সাক্ষা]কারটি নিয়েছিলেন যখন আইজেনব্রাউন স্মরণ করেন যে এই হত্যাকা-টি বাংলাদেশ ডেস্কে তার দায়িত্বের শেষ দিনে হয়েছিল এবং ‘এটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার ছিল’।

তিনি দাবি করেন যে এ মারাত্মক অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নেতাকে তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যসহ হত্যা করায় ‘আমেরিকানরা প্রায় বাংলাদেশীদের মতোই অবাক হয়েছিল।’

সেই সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আইজেনব্রাউন মন্তব্য করেন, ‘এটি ছিল একটি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ, যেখানে সেনাবাহিনীর মাঝারি স্তরের কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা মধ্যরাতে তাঁর বাড়িতে এসে তিনি ও তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের গুলি করে হত্যা করে। সম্ভবত এক ডজনের বেশি লোককে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারীরা সবাইকে স্বয়ংক্রীয় অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। ‘১৯১৮ সালে রাশিয়ার রাজপরিবারের সদস্যকের হত্যার চেয়ে এ ঘটনাকে অতটা আলাদা বলে মনে হয়নি।’

তবে আইজেনব্রাউন জোর দিয়ে বলেন যে ‘প্রকৃত অপরাধীরা, যে মেজরররা এটি করেছিল, তারা অভ্যুত্থানের আগের দিনগুলোতে আমরা যাদের কথা শুনে আসছিলাম, তারা ছিল না।’

‘১৯৭৫ সালে ডেস্কে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পারি যে আমেরিকানরা শেখ মুজিবকে সতর্ক করেছিল, যেমনটি আমি বলেছি; তবে অভ্যুত্থান আসলে কারা ঘটাল তাদের পরিচয়ে এবং হত্যাকা-ের ভয়াবহতায় তারা অবাক হয়েছিল।’

আইজেনব্রাউন স্মরণ করেন যে সেদিন সকালে তিনি ‘প্রচ- শোরগোলের’ মধ্য দিয়ে তার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। কারণ কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশের রাজধানীতে এমন ভয়ানক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়েছিল।

‘বিশ্বাস করুন, সেদিন ডেস্কে একটি ধকল ছিল,’ তিনি বলেন।

পূর্বে প্রকাশিত নথিপত্র ও প্রতিবেদন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু দু’বার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান সম্পর্কে ভারতের সতর্কতা উপেক্ষা করে বলেছিলেন যে ‘ষড়যন্ত্রকারীরা’ তার ‘নিজের সন্তান’, তারা তার ক্ষতি করবে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যদের হত্যা করার সাত মাসেরও বেশি আগে ভারতের গবেষণা ও বিশ্লেষণ শাখার (র)-এর একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা তাকে ষড়যন্ত্রকারীদের সমাপর্কে সতর্ক করতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা রামেশ্বর নাথ কাও ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশের নেতার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন তিনি তাকে বলেন, ‘এরা আমার নিজের সন্তান এবং তারা আমার ক্ষতি করবে না।’

আশোকা রায়না’র ‘ইনসাইড র’ অনুসারে বঙ্গবন্ধু এ উদ্বেগকে নাকচ করলে কাও জোর দিয়েছিলেন যে ভারতীয় তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং তিনি তাকে এই চক্রান্তের আরো বিশদ পাঠিয়ে দেবেন।

কাও পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে র-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঢাকায় প্রেরণ করেন, যিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এমন কর্মরত ও বরখাস্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ইউনিট ও পদমর্যাদার যথাযথ বিবরণ তুলে ধরেছিলেন।

রায়না লিখেছিলেন, ‘কিন্তু আবারও তিনি (বঙ্গবন্ধু) কনভিন্সড হননি।