
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : ‘৯০-এর দশকে একটি সংবাদপত্রে সম্পাদনা সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নূর খান। কয়েক বছর পর পত্রিকাটির প্রকাশনা সাময়িক বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান।
এক সময় দলের প্রেস রিলিজ নিয়ে পত্রিকা অফিসেও যেতেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পিএ হিসেবে যোগ দেন। মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী হওয়ার পর পরই এপিএস হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। এতেই যেন রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ পেয়ে বসেন তিনি। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে তার ক্ষমতা আর অবৈধ সম্পদের পরিমাণ। গল্পটি সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এপিএস নূর খানের।
অভিযোগ আছে, মন্ত্রণালয়ের প্রভাব খাটিয়ে বহুল আলোচিত জি কে শামীম ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন নূর খান। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। ফলে খুব অল্প সময়ে বনে যান বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক। এপিএস পদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তদবির বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্লট বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করে নূর খান হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সুপারিশ কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শাখায় ২২ জনের চাকরির ব্যবস্থা করেন তিনি। বিনিময়ে ছোটবড় প্রতিটি পদের জন্য নিয়েছেন ৪-৫ লাখ আর বড় পদের ক্ষেত্রে টাকার অংকটা গিয়ে ঠেকেছে ৯-১০ লাখে। যাদের সুপারিশের মাধ্যমে চাকরি দিয়েছেন তাদের মধ্যে মিরসরাইয়ের ফখরুল ও শুভ ছাড়া বাকিরা তার নিজ এলাকা হাটহাজারির মাদার্শা ইউনিয়নের বাসিন্দা।
সর্বশেষ তার ভাগিনা আবছারকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট শাখায় নিয়োগ পাইয়ে দিয়েছেন নূর খান। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও রয়েছে ব্যাপক গুঞ্জন। মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাবলে নিজের ছোট ভাই মামুন খানকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চাকরিও দিয়েছেন নূর খান।
নূর খানের অবৈধ আয় ও সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জে সিপিডিএলের প্রজেক্টে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে নূর খান এবং তার ভাগ্নের নামে। এছাড়াও জিইসি সার্কেলে মেডিকেল সেন্টারের পার্শ্ববর্তী ‘লাজ ফার্মা’ ফার্মেসিসহ শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি দোকানও রয়েছে। নিজ গ্রামেও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক এই নূর খান। হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা, বড় দীঘিরপাড় ও সীতাকুণ্ডে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে তার নামে। ঢাকার পূর্বাচলে ৫ কাঠার একটি প্লটেরও মালিক তিনি।
শুধু তাই নয়, এপিএস হিসেবে চট্টগ্রামের হালিশহরে আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট (৩১৬) ২৫ বছরের কিস্তিতে সুদসহ ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধের নিয়মে পেলেও নূর খান ৬ মাসের মধ্যে ৪৬ লাখ টাকা একসাথে পরিশোধের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন। গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, একমাত্র নূর খান ছাড়া এখন পর্যন্ত ঐ প্রকল্পে ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রাপ্ত কেউই পুরো টাকা পরিশোধ করে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি।
অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়েও অবাক করার মত তথ্য এসেছে একুশে পত্রিকার কাছে। গত বছরের শেষের দিকে প্রাণ জাহাঙ্গীর নামে দুবাইয়ের এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর সাথে দুবাই ভ্রমণে যান নুর খান। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুদক ও প্রশাসনের নজর এড়াতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নামে নূর খান সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিরসরাই ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আজমের (দুবাইয়ের পরিচিত হুন্ডি ব্যবসায়ী) মাধ্যমে অবৈধভাবে ২৫ কোটি টাকা দুবাইয়ে পাচার করেছেন বলে তথ্য দিয়েছেন নূর খানের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এমন দুই ব্যক্তি।
রাজনীতিতেও পিছিয়ে নেই নূর খান। কোনো রকম পূর্ব রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা অবস্থান না থাকা সত্ত্বেও ইঞ্জিনিয়ার মােশাররফ হােসেনের সুপারিশে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে নূর খানের নাম দেওয়া হয়েছে। নূর খানের আছে ভ্রমণ বিলাসিতাও। বিগত ৫ বছরে এপিএস নূর খান স্বপরিবারে প্রায় ৬ বার সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক ভ্রমণ করেছেন বলে জানা যায় অনুসন্ধানে।
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদার জিকে শামীম। তার কয়েকমাস পর দুদকে নূর খানের বিরুদ্ধেও একটি লিখিত অভিযোগ করে সংশ্লিষ্টরা। দুদকে দেওয়া ওই অভিযোগে নূর খানকে জিকে শামীমের সহযোগী দাবি করা হয় এবং তার সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে টাকা পাচারের বিষয় সেখানে উল্লেখ করা হয়। এপিএস নূর খানের আয়ের সাথে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও দাবি করা হয়েছিল ওই লিখিত অভিযোগে। অভিযোগের কপিটি গত ১৫ জানুয়ারি গ্রহণ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ পাওয়ার প্রেক্ষিতে নূর খানের জ্ঞাতআয় বহির্ভূত সম্পদের খোঁজে দুদক তদন্তে নামলেও রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত এখন থমকে আছে।
নূর খানের নিজ এলাকা হাটহাজারীর মাদার্শা ইউনিয়নের একজন বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রথমে তো গুদাম ঘর ছিল নূর খানের। এখন বিশাল জায়গা জুড়ে বাড়ি করছেন তিনি। ইতোমধ্যে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এক্সট্রেইল ব্র্যান্ডের গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। সবাইকে দেখান যে, এলাকার মানুষকে চাকরি দিয়ে সহায়তা করেন, কিন্তু তার বিনিময়ে গ্রহণ করেন লাখ লাখ টাকা।
কখনো ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত না হয়েও এক লাফে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের মতো বৃহত্তম ইউনিটে দপ্তর সম্পাদক পদে নূর খানের নাম প্রস্তাব করা প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভঅপতি গিয়াসউদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জীবনের কোনো সময়েই রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকা নূর খানের জন্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মত প্রবীণ নেতা সুপারিশ করলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে। যারা নিজের জীবনের সবটুকু দিয়েছে রাজনীতিতে তাদের মূল্যায়ন না করে কীভাবে নূর খানের মত দুর্নীতিবাজ লোক পদ-পদবির জন্য সুপারিশ পান তা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়।
তিনি আরো বলেন, নূর খান মন্ত্রণালয়ের প্রভাব খাটিয়ে যে দূর্নীতি করেছে, অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে তা সকলের কাছেই ওপেন সিক্রেট। দুদকেও তার এই বিষয়গুলো উল্লেখ করে একটি অভিযোগও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখিনি। ক্ষমতা দিয়ে দাবিয়ে রেখেছে সব। কিন্তু দুর্নীতির দুর্গন্ধ বেশিদিন ছাপিয়ে রাখা যায় না। একদিন না একদিন তা প্রকাশিত হবে এবং তাকে শাস্তির আওতায় আসতেই হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, মোশাররফ স্যার সরল মনের মানুষ। তিনি মানুষকে বিশ্বাস করেন। আর সেই সুযোগ নিয়ে নূর খান দুর্নীতি করেছে। নূর খানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্যারকে বলে সুপারিশ করিয়ে নিতো এবং স্যারের অজান্তেই হাতিয়ে নিতো লাখ লাখ টাকা। যে নূর খান সাড়ে ৭ হাজার টাকার ভাড়া বাসায় থাকতো, সে আজ নিজের গাড়ি, একাধিক বাড়ি, প্রচুর জমিজমা এবং অঢেল সম্পদের মালিক।
তিনি আরো বলেন, স্যার (মোশাররফ) মন্ত্রী থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে নিজের পরিবারের বেশ কয়েকজনকে সরকারি চাকরিরও ব্যবস্থা করে দেন নূর খান। জিকে শামীমের দুর্নীতি ফাঁস হয়ে গেছে, কিন্তু নূর খান প্রত্যেকটা সেক্টরকে এমনভাবে ম্যানেজ করেছে যাতে তার কুকীর্তি প্রকাশ না পায়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নূর খানের আকণ্ঠ দুর্নীতির কথা জানেন না। স্যারের ধারণা, নূর খান সাথে থেকে স্বচ্ছল হয়েছেন, কিন্তু সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সেকথা তিনি জানেন না। জানলে স্যারও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলে আমার ধারণা।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে জিকে শামীমকে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি ২০০ কোটি টাকার এফডিআর চেক ও ১০ কোটি নগদ অর্থ উদ্ধার করে র্যাব। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, তিনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গণপূর্তের সব ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে বারবার নূর খানের নাম উচ্চারিত হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এপিএস নূর খান উল্লিখিত অভিযোগসমূহ মিথ্যা দাবি করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। আমি আমার গ্রামের বেশ কিছু মানুষকে চাকরি দিয়েছি কিন্তু এর বিনিময়ে কোনো টাকা নিইনি। প্রয়োজনে আপনারা খবর নিয়ে দেখতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, দুদকে আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের বিষয়ে শুনেছিলাম। অভিযোগগুলো সত্য হলে দুদক তো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতো, তাই না? আমি কোনো দুর্নীতি করিনি। আমার সুনাম নষ্ট করার জন্য একটি চক্র এই মিথ্যা অভিযোগগুলো তুলছে।
এদিকে নূর খানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ যাওয়ার বিষয়টি আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছিলেন দুদক সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন।
মঙ্গলবার নূর খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একুশে পত্রিকাকে শরীফ উদ্দিন বলেন, অভিযোগটির বিষয়ে এখন আমার কাছে কোন তথ্য নেই। এ বিষয়ে জানার জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক শরীফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
পরে দুদক সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক শরীফ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না। যদি আমার কাছে ইনফরমেশন থাকতো তাহলে সেটা আপনাকে শেয়ার করতে কোনো সমস্যা ছিল না।’
