ব্যবসায়ীকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগের ভিত্তি দিল সিসিটিভি ফুটেজ

শরীফুল রুকন ও জিন্নাত আইয়ুব : ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় নাছির উদ্দীন শাহ (৪৩) নামের একজন মৎস্যব্যবসায়ীকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছিল র‌্যাবের বিরুদ্ধে। পরিবারের এ অভিযোগ তুলে ধরে গত ১৯ আগস্ট ‘আনোয়ারার ব্যবসায়ীকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ (ভিডিও)’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে একুশে পত্রিকা।

এরপর একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘটনার সময়ের ছবি-ভিডিও চোখে আঙ্গুল দিয়ে জানিয়ে দিল অভিযোগের ভিত্তি আছে।

দৃশ্যপট ১ : দুপুর ২:৩৪
১৮ আগস্ট, দুপুর ২টা ৩৪ মিনিট। স্থান আনোয়ারার বটতলী ইমাম শরীফ মার্কেটের সামনে। সিঁড়ি দিয়ে মার্কেটের উপরে উঠার একটি পথের সামনে একটি সিএনজি অটোরিকশা এসে থামে। নাম্বার চট্টমেট্রো-থ-১৩-২২৭১। অটোরিকশা থেকে গাঢ় চকলেট রঙের ফুল হাতা গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট পরা এক যুবক একটি সাদা লম্বা ব্যাগ হাতে নিয়ে নেমেই ইমাম শরীফ মার্কেটে ঢোকা শুরু করেন। ভেতর থেকে কেউ একজন অটোরিকশাটির দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর সিএনজি অটোরিকশাটি সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

দৃশ্যপট ২ : দুপুর ২:৪৭
১৮ আগস্ট, দুপুর ২টা ৪৭ মিনিট। ইমাম শরীফ মার্কেটের উপরে উঠার আরেকটি পথের প্রবেশমুখ। সিএনজি অটোরিকশা থেকে নামেন হলুদ হাফ হাতা গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট পরা এক যুবক। তিনি নামতেই চালক ভেতর থেকে অটোরিকশার দরজা বন্ধ করে দেন। এরপরই চালক সামনে এগিয়ে যান। নামার পর মাস্ক পরা ওই যুবককে ভাড়া পরিশোধ করতে দেখা যায়নি। নেমেই মুঠোফোনে কথা বলা শুরু করেন ওই যুবক।

২টা ৪৭ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে কালো গ্লাসের র‌্যাবের একটি মাইক্রোবাস আসলে থামার সংকেত দেয় হলুদ হাফ হাতা গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট পরা যুবকটি। গতি কমিয়ে সামনে এগিয়ে যায় মাইক্রোবাস। যুবকটিও মাইক্রোবাসে থাকাদের রিসিভ করতে সামনের দিকে এগিয়ে যান। মাইক্রোবাসটির কয়েক হাত পেছনে র‌্যাবের ডাবল কেবিন ভ্যানকে দেখা যায়। সেটিও পার্কিং করতে সামনে এগিয়ে যায়।

দৃশ্যপট ৩ : দুপুর ২:৫০
১৮ আগস্ট, দুপুর ২টা ৫০ মিনিট। ইমাম শরীফ মার্কেটের উপরে উঠার যে পথে হলুদ হাফ হাতা গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট পরা যুবক সিএনজি থেকে নেমেছিলেন, সেই পথে আবার আসেন যুবকটি। এরপর টি-শার্ট পরা র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা মাথায় হাত দিয়ে আসেন। একে একে সেখানে কয়েকজন জড়ো হন; তাদের মধ্যে প্রথম দৃশ্যপটের গাঢ় চকলেট রঙের ফুল হাতা গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট পরা যুবকটিও ছিল। ৫০ মিনিট ১৯ সেকেন্ডে দেখা যায়, সাদা পোশাকে অন্তত ৭ জন উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পেছনে একে একে আসেন, পোশাক পরা তিন র‌্যাব সদস্যসহ সাদা পোশাকে কয়েকজন।

দৃশ্যপট ৪ : দুপুর ২:৫৭-৫৮
১৮ আগস্ট, দুপুর ২টা ৫৭ মিনিট। রড নিয়ে যাচ্ছেন ফুলহাতা শার্ট ও স্যান্ডেল পরা এক যুবক। ভুক্তভোগীদের দাবি, বাসার চাবি আনতে দেরি হওয়ায় তালা ভাঙার জন্য রড নেয়া হচ্ছিল তখন। ৫৮ মিনিটে ৮ সেকেন্ডে টি-শার্ট পরা এক যুবকসহ দুইজনকে উঠতে দেখা যায়; টি-শার্ট পরা ওই যুবককে পরে বাসায় তল্লাশি চালাতে দেখা যায় অপর এক ভিডিওতে।

দৃশ্যপট ৫ : বিকাল ৩:২০
১৮ আগস্ট, বিকাল ৩টা ২০ মিনিট। র‌্যাব সদস্যকে রিসিভ করা হলুদ হাফহাতা গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট পরা সেই যুবকটিকে মার্কেট থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতে দেখা যায়। প্রবেশপথে একটু পায়চারি করে এক পাশে সরে যায় ওই যুবক।

দৃশ্যপট ৬ : বিকাল ৩:৪৩
১৮ আগস্ট, বিকাল ৩টা ৪৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডে। সেই সাদা লম্বা ব্যাগটি হাতে নিয়ে সাদা পোশাকে একজনকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। তার পেছনে পোশাক পরা তিন র‌্যাব সদস্য। ৪৩ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে দেখা যায়, সাদা ব্যাগটি খুলে ভেতরে কী আছে সেটা দেখছেন দুইজন। লোকজন জড়ো হতে থাকে। একটু পর সাদা ব্যাগটি নিয়ে সেখান থেকে সরে যান সাদা পোশাকে থাকা লোকজন ও র‌্যাব সদস্যরা।

উপরোক্ত সব ঘটনা আনোয়ারার বটতলী ইমাম শরীফ মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।

এদিকে নাছির উদ্দীন শাহকে মাইক্রোবাসে বসিয়ে রেখে ইমাম শরীফ মার্কেটের তৃতীয় তলায় থাকা তার বাসায় তল্লাশির একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহেল মাহমুদের উপস্থিতিতে টি-শার্ট পরা এক যুবকসহ কয়েকজন তল্লাশি চালাচ্ছেন। টি-শার্ট পরা ওই যুবক এক দিকে দেখিয়ে বলেন, স্যার, এগুলো দেখতে হবে। তখন একজন বলেন, না এগুলো দেখেছি।

অভিযানের সময় র‌্যাব ১টি ওয়ান শুটারগান, ২ রাউন্ড গুলি, ৭টি রামদা এবং ১টি চায়নিজ কুড়াল উদ্ধারের দাবি করলে নাছিরের স্ত্রী শারমিন আকতার র‌্যাব সদস্যদের উদ্দেশ্যে করে বলে উঠেন, ‘যা করছেন সব ষড়যন্ত্র।’ তখন সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ষড়যন্ত্র যদি আপনার বাসায় কেউ রেখে, এটা কীভাবে বলেন আপনি বলেন।’

এরপর নাছিরের স্ত্রী শারমিন আকতার বলেন, ‘বাসায় কোনোদিন ছুরি আনতে আমি দেখিনি।’ সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘আপনি বলেন, আমরা তো এনাদের সাথে করে নিয়ে এসেছি।’ নাছিরের স্ত্রী তখন বলেন, ‘সাথে নিয়ে এসেছেন তো জানি। এটা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র।’ সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ষড়যন্ত্র হলে আপনারা সেটা আদালতে প্রমাণ করবেন। সেটা তো আমাদের দেখার বিষয় না।’

এজাহারে গড়মিল
১৮ আগস্টের এ ঘটনার পরদিন ১৯ আগস্ট আনোয়ারা থানায় নাছির উদ্দিন শাহকে আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা করেন র‌্যাবের এসআই বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেবনাথ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৮ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে কোরিয়ান ইপিজেড এলাকায় টহল ডিউটি করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, পারকি লুসাই পার্ক এলাকায় কতিপয় দুষ্কৃতিকারী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী অবস্থান করছে। সত্যতা যাছাইয়ে ২টা ৫০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছা মাত্রই একজন ব্যক্তি র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। দৌড়ে পালানোর বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় ও কথাবার্তায় অসঙ্গতি ও সন্দেহভাব প্রকাশ পাওয়ায় ঘটনাস্থলের সম্মুখে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করি। একপর্যাসে সে স্বীকার করে, বটতলী রুস্তম হাট ইমাম শপিং সেন্টারের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটের মাস্টার বেডরুমের বক্স খাটের নিচে কিছু অস্ত্র-গুলি রয়েছে। এরপর ৩টা ২০ মিনিটে উল্লেখিত স্থানে হাজির হয়ে ১টি ওয়ান শুটারগান, ২ রাউন্ড গুলি, ৭টি রামদা এবং ১টি চায়নিজ কুড়াল উদ্ধার করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন র‌্যাবের এসআই বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেবনাথ।

অথচ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুপুর ২টা ৪৭ মিনিটে র‌্যাবের একটি মাইক্রোবাস ও একটি ডাবল কেবিন পিকআপ বটতলী রুস্তম হাট ইমাম শপিং সেন্টারের সামনে আসে।

৪ জন আনসার সদস্য, একজন বিজিবি সদস্য ও একজন পুলিশ কনস্টেবলকে নিয়ে এসআই বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেবনাথ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। অথচ অভিযানে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহেল মাহমুদ, যা ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে কিছুই এজাহারে উল্লেখ নেই।

নাছিরের কাছ থেকে অস্ত্রের তথ্য পেয়ে তার বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে এজাহারে; অথচ অভিযানের সময় তাকে বাসায় নেয়া হয়নি। বাসার নিচে মাইক্রোবাসে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

মামলার জব্দ তালিকার দুই সাক্ষী বলছেন, জোর করে স্বাক্ষর নিয়েছে
সাক্ষী জামাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সেদিন র‍্যাব আমাকে ডেকে নিয়ে বলছে, দেখ এটা। এ সময় অনেক লোকজন জড়ো ছিল। র‌্যাব বলেছে, এখানে একটা স্বাক্ষর করো। একপ্রকার জোর করে নিয়েছে। নাছির আমার জানামতে অনেক ভালো ছেলে।’

জব্দ তালিকার আরেক সাক্ষী আলমগীর হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘র‍্যাব ডেকে নিয়ে আমাকে একটা খালি পেপারে স্বাক্ষর করতে বলে, প্রথমে আমি করেনি, পরে ওসি সাহেবের সাথে কথা বলে করেছি। এসব বিষয় আমি আপনাকে মোবাইলে বলতে পারবো না, আপনি সরাসরি যোগাযোগ করুন। তবে নাছির লোক ভালো ছিল।’

অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অবস্থান নাকি ব্যবসায়িক বিরোধ মেঠাতে সালিশ বৈঠক
এ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পারকি লুসাই পার্ক এলাকায় কতিপয় দুষ্কৃতিকারী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী অবস্থান করছে- এমন তথ্যে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় দৌড়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন ব্যবসায়ী নাছির উদ্দীন শাহ।

কিন্তু স্থানীয়রা দিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তারা বলেছেন, নাছির উদ্দিন শাহকে আটক করেছে তিনি এলাকায় একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মাছের ব্যবসায় জড়িত। সম্প্রতি তার ব্যবসায়িক পার্টনার আখতারুজ্জামান খান মিজানের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে উভয়পক্ষ মীমাংসার জন্য বসেন পারকি এলাকার লুসাই পার্কের পাশে। ওই বৈঠক শেষে হঠাৎ তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈঠকে বারশত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাঈনুউদ্দীন গফুর খোকন, ওই এলাকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রহমান মেম্বার, স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির মনোনীত প্রতিনিধি নুর হোসেন ইমন, যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক নেতাসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা উপজেলার বারশত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাঈনুউদ্দীন গফুর খোকন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ওই দিন মিজান আর নাছিরের মৎস্য প্রজেক্টের ঝামেলা নিয়ে লুসাইতে বৈঠক ছিল। বৈঠকে উভয়পক্ষের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত হয় বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ৪ লক্ষ টাকা জমা দিয়ে আবার বৈঠকে বসার। এরপর বৈঠক শেষে নাছির লাঞ্চের ব্যবস্থা করে সবার জন্য লুসাইতে। তখন মিজানকে দেখেছি, ফোনে খুব ব্যস্ত ছিল, ইশারা ইঙ্গিতে বেশ কয়েকটা কলে কথা বলেছে। পরে বৈঠক থেকে আমরা তিনজন রওনা হয়েছি। আমরা কিছুদূর আসার পর শুনি নাছিরকে র‍্যাব আটক করেছে।

এ ব্যাপারে নাছিরের ভাই নাজিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার ভাইকে আটক করার পর র‍্যাবকে আমরা জিজ্ঞেস করি, ভাইকে কেন আটক করা হয়েছে। তখন র‍্যাব বলেছে, তোমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিজান একটা অভিযোগ করেছে, তাই আটক করা হয়েছে। ব্যবসায়িক বিরোধ নিয়ে অভিযোগ দিলে এখন র‌্যাব কীভাবে অস্ত্র মামলা দিল? র‍্যাব আমাদেরকে বলেছে এক কথা, এজাহারে উল্লেখ করেছে ভিন্ন কথা।

ব্যবসার বিরোধে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ স্ত্রীর
গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় আনোয়ারায় স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নাছির উদ্দিন শাহ’র স্ত্রী শারমিন আক্তার তার স্বামীকে নির্দোষ এবং ষড়যন্ত্রের শিকার উল্লেখ করে বলেছেন, আমার স্বামী চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা আখতারুজ্জামান খান মিজানের সাথে পারকি এলাকায় ৮-১০ বছর যাবত মৎস্য ব্যবসা করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, কলহ সৃষ্টি হয়। সে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে ১৮ আগস্ট সকালে পারকি লুসাই পার্কে আনোয়ারার বারশত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির মনোনীত প্রতিনিধি নুর হোসেন ইমন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাঈনউদ্দীন গফুর খোকনসহ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহমান, ব্যবসায়িক পার্টনার নুর মোহাম্মদ ও নুরুল হক শাহ্ জাহাঙ্গীর মেম্বারসহ আমার স্বামীর প্রতিপক্ষ আখতারুজ্জামান খাঁন মিজানের পক্ষে চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা সাহেদ ও কাইয়ুম এর উপস্থিতিতে বৈঠক হয়।

“বৈঠকে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) উভয় পক্ষ চার লক্ষ টাকা জমা দিয়ে উভয় পক্ষে দুইজন সালিশকার নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষ করে বের হওয়ার মূহুর্তে হঠাৎ সিভিল পোশাকে কয়েকজন র‍্যাব সদস্য এসে অভিযোগ আছে বলে আমার স্বামীকে আটক করে। বেলা ১২টার দিকে বটতলী ইমাম শরীফ মার্কেটের সামনে আমাদের ভাড়া বাসার সামনে নিয়ে আসে র‌্যাব। আমি তখন তালা মেরে কেনাকাটার জন্য বাসার বাইরে গিয়েছিলাম। এসে দেখি আমার স্বামীকে গাড়িতে রেখে র‍্যাব সদস্যরা তালা খুলে আমার বাসায় ঢুকছে। এ সময় তাদের সাথে থাকা একটা ছেলে সাদা বস্তার ভেতর কিছু নিয়ে ভেতরে ঢুকে, পরে বাসার খাটের নিচে সেটা ঢুকিয়ে দেয়। এক রুমে তারা তল্লাশি করে, আরেক রুমে গিয়ে বস্তাভর্তি অস্ত্রগুলো ঢুকিয়ে দেয়। একটু পর অস্ত্র পেয়েছে জানিয়ে তারা চলে যায়। পাশের জানালা দিয়ে আমরা এসব দেখেছি, আমাদের পাশের রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তখন। আশপাশের সবাই দেখেছেন এসব, আমার উপরের বাসার একজন আপাও দেখেছেন।”

শারমিন আরও অভিযোগ করে বলেন, “আমার বাসায় কোনোপ্রকার অস্ত্র মজুদ ছিল না। আমার স্বামীর সঙ্গে তার ব্যবসায়িক পার্টনার আখতারুজ্জামান খান মিজানের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, কলহ সৃষ্টির পর থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে আমার স্বামীকে হুমকি-দমকি দিয়ে বলতেন, র‌্যাবে আমার বন্ধু আছে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকে র‍্যাব দিয়ে ধরিয়ে মৎস্য প্রজেক্ট আমার করে নিব।”

ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আকুতি জানিয়ে শারমিন আকতার বলেন, “দুই শিশু নিয়ে আমি এখন অসহায় অবস্থায় আছি, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আখতারুজ্জামান খান মিজান সোমবার সকালে মুঠোফোনে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি পরে জানাবো।’ নাছিরের স্ত্রী ও ভাই অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে র‌্যাবকে ব্যবহার করে আপনি ফাঁসিয়েছেন- এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী- এমন প্রশ্নে মিজান পরে ফোন দেবো বলে সংযোগ কেটে দেন।

তবে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারকে আখতারুজ্জামান খান মিজান জানান, নাছিরের সঙ্গে আগে অংশীদার হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন তিনি। নাছির প্রতারণা করে তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মৎস্য প্রকল্পের পুকুরটি নিয়েছিলেন। চুক্তির সময় শেষ হওয়ার পরে তিনি যখন পুকুরটি হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন নাছির তাকে সন্ত্রাসী দিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন এবং এ কারণেই তিনি র‌্যাব ও আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে নাছিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

এদিকে নাছিরের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাটি তদন্তের জন্য আনোয়ারা থানার এসআই খুরশীক আলমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি আসামি নাছির উদ্দিন শাহকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। ২৩ আগস্ট রিমান্ড শুনানি শেষে চট্টগ্রামের বিচারিক হাকিম আদালত আসামি নাছির উদ্দিন শাহকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফাঁসানোর অভিযোগ ও জব্দ তালিকার সাক্ষীদের দেয়া বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই খুরশীক আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, জব্দ তালিকার সাক্ষীদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে।

অভিযান পরিচালনা করা র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহেল মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, “ফুটেজে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের কাউকে তো আমরা চিনি না। তাদেরকে কেউ যদি চিনে থাকেন, তাদেরকে যদি শনাক্ত করা যায়, আমরাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। এখানে আমাদের কারও জড়িত থাকার বিষয় নেই। মামলাটি এখন পুলিশ তদন্ত করছে, যা কিছু পাওয়া যায় সেটা আপনারা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সরবরাহ করতে পারেন। পুলিশ তদন্ত করে যদি দেখে নাছির নির্দোষ, তাহলে আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই।”

নাছিরের বিরুদ্ধে র‌্যাবের কাছে মিজান অভিযোগ দিয়েছিল উল্লেখ করে র‌্যাব কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ বলেন, “লুসাই পার্ক এলাকায় মিজানের একটি পুকুর আছে। এটা তাদের পৈত্রিক। দীর্ঘদিন ধরে তারা সেখানে মাছের ব্যবসা করে। সেখানে নাছির উদ্দিন শাহের সঙ্গে তার এক বছরের লাগিয়াত চুক্তি ছিল। ওই চুক্তিটা গত এপ্রিলে শেষ হয়। তখন মিজান বলে, আমি চুক্তি নবায়ন করবো না, অন্যজনকে দেবো। যেহেতু আপনি যে মূল্যে নিয়েছিলেন, এখন বাজারমূল্য সেটার চেয়ে বেশি। তখন সালিশ বিচারে দেনা-পাওনা সেরে নেয়ার বিষয় আসে। তখন ওখানে কয়েকবার দুই পক্ষের মধ্যে সালিশ-দরবার হয়েছে। তখন দেখা গেল, নাছির উদ্দিন শাহ ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পাবেন। সালিশে মিজানকে বলা হয়, টাকা দিলে নাছির চলে যাবে। সালিশের পরদিন যখন মিজান টাকা দিতে গেছে, তখন নাছির বলেছে, আমি এই টাকা নেবো না, ১৬ লাখ টাকা দিতে হবে, এটা আমি পাই। এটা নিয়েও আবার সালিশ বিচার হয়েছে। তখন ১৬ লাখ টাকার পক্ষে কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারেনি, পরে নাছির বলেছে, আমাকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে, নয়তো যাবো না। এরপর মিজান আনোয়ারা থানায় গিয়েছিল, সেখানে জিডি বা অভিযোগ করেছে, পরে তারা আদালতে গিয়েছিল, করোনার জন্য আদালত বন্ধ ছিল, মামলা করতে পারেনি। তারপর আমাদের কাছে মিজান একটা অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগ পেয়ে আমরা যখন নাছির শাহকে ধরেছি, সে নিজের মুখে স্বীকারও করেছে, মিজানের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চেয়েছে। এছাড়া মাছের প্রজেক্টে গেলে নাছির শাহ ও তার লোকজন মিজানকে মেরেছে, হুমকি-দমকি দিয়েছে, ঘের থেকে মাছ ধরে নিয়ে গেছে। বিষয়গুলো এরকম।”

র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহেল মাহমুদ বলেন, “আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে গিয়েছি, নাছিরের বাসা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা ছিল। আমরা বাজারের দু’জন দোকানদার এবং বিল্ডিংয়ের মালিককে সাক্ষী হিসাবে ডেকে আনি। নাছিরের এক আত্মীয়কে ফোন করে মালিক বাড়ির চাবি পেতে সক্ষম হন। দরজা খোলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার স্ত্রী উপস্থিত হয়েছিলেন। আমরা তার শয়নকক্ষের বক্স খাটের নিচে অস্ত্র এবং ধারালো অস্ত্র পেয়েছি। বাইরের লোকদের পক্ষে বক্সখাট তুলে অস্ত্র রাখা একেবারেই অসম্ভব। তারপরও যদি দেখা যায়, অন্য কেউ এতে জড়িত আছে। তাহলে সেটা খুঁজে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দিন। তিনি জড়িতদের ধরে শাস্তির আওতায় আনবেন। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা যেটা করেছি, আইন অনুযায়ী করেছি। এখানে র‌্যাবের দুর্নাম যাতে না হয়। অন্য কেউ জড়িত থাকলে তারা আইনের আওতায় আসবে।”

র‌্যাবের মাইক্রোবাসকে এক যুবকের থামানোর সংকেত দেয়া, রিসিভ করা প্রসঙ্গে র‌্যাব কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ বলেন, “থামানোর সংকেত দিলে তো আমরা সেখানেই থামতাম। কিন্তু আমরা তো থামিনি। ওই যুবককে চিনি না।”

এ র‌্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, নাছিরকে ২০১৩ সালে আনোয়ারা থানায় দায়ের করা একটি মামলায় আসামি করা হয়েছিল। নাছির সন্ত্রাসী কাজে জড়িত বলে তারা জেনেছেন। তবে নাছিরের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩২৬, ৩৭৯, ৪৪৭ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা ওই মামলাটি জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিবেশী দায়ের করেছিলেন।

জানতে চাইলে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ আমি দেখেছি। বিষয়টি আমি আরও যাছাই-বাছাই করে দেখবো। ফাঁসানোর চেষ্টা যদি কেউ করে থাকে, আমি কথা দিচ্ছি, আমি কাউকে ছাড়বো না। যদি এ ধরনের কিছু হয়ে থাকে, নিশ্চিত থাকুন সর্বোচ্চ যে ব্যবস্থা নেয়া যায় আমি সেটাই নেবো, ব্যক্তিগতভাবে আমি বিষয়টি দেখছি। যদি কেউ ফাইজলামি করে থাকে সেটার দায় র‌্যাব নেবে না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যেভাবে ফাঁসানোর অভিযোগ আসছে, ক্রসফায়ারের নামে হত্যার অভিযোগ আসছে, পরাধীন দেশেও তো এ ঘটনাগুলো ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলে ঘটেনি, পাকিস্তান আমলে ঘটেছে কিনা সন্দেহ আছে। তাহলে স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মহুতি দেয়ার মূল্য কী রইল। এভাবে চললে অসহায় মানুষগুলো যাবে কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘অন্যায়কারী যে বিভাগের যে পেশারই লোক হোন না কেন, অন্যায়-অনিয়ম করলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিজেরাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে পারলে, সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়বে, কমবে না। এতে দেশের মানুষের কাছে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা পাবে। কোন ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের নেয়া কোনভাবেই উচিত নয়।’