‘ব্যবসায়ী’ ছাত্রলীগ নেতাদের বাধার মুখে জিইসিতে হচ্ছে না ফুটওভার ব্রিজ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : প্রায় দুবছর আশ্বাসেই ফাইলবন্দী হয়ে আছে জিইসি ও লালখানবাজার ফুট ওভার ব্রিজ। পথচারীদের নিরাপদ পথচলা ও রাস্তা পারাপারের কথা ভেবে গত বছরের ১৯ আগস্ট জিইসি, লালখান বাজারসহ নগরের নয় গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) চিঠিও দেয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

জনসাধারণের রাস্তা পারাপারের সুবিধার্থে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর জিইসি মোড়, মুরাদপুর মোড় এবং লালখান বাজার মোড়ে একটি করে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয় সিডিএ। যার মধ্যে মুরাদপুর মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও, জিইসি মোড়ের ব্রিজ নির্মাণ কাজ বাধার মুখে বন্ধ হয়ে আছে।

অন্যদিকে লালখান বাজার ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ নিয়ে নানা সময়ে সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশন থেকে আশ্বাস দেয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে বাধার বিষয়টি সিডিএকে লিখিতভাবে অভিযোগ আকারে জানানো হয়েছে। অভিযোগে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাত্রলীগের একটি অংশের বাধার কথা উল্লেখ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স কন্সট্রাকশন।

ম্যাক্স কন্সট্রাকশন সূত্রে জানা যায়, বেজ ও কলাম স্থাপন কাজে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো টাকাই পায়নি।

নির্ভরযোগ্য সুত্র বলছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল প্লাজার ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতিবিদের বাধার মুখে এ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। তবে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে বাধা কারা দিচ্ছে সিডিএর কর্মকর্তারা সে ব্যাপারে জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেছে।

নিয়মিত জিইসি রাস্তা পার হওয়া পথচারী সেলিম সোহান ক্ষোভ নিয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীসহ শারীরিকভাবে অক্ষমরা এই সড়ক পার হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। একটি ফুটওভার ব্রিজ এই স্থানে খুবই প্রয়োজন। বেশ কয়েকমাস আগে দেখেছিলাম ফুটওভার ব্রিজের কাজ শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু এখন তো বন্ধ হয়ে আছে সেই কাজ। শুনলাম কারা এটি তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। জীবন ঝুঁকি নিয়ে আমাদের রাস্তা পার হতে হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে হোটেল জামান ভবনের সামনে থেকে গোল পাহাড় যাওয়ার রাস্তার মুখের উভয় পাশে মাটি সমান করে পিলার ঢালাই করা রয়েছে। বেজ ও কলাম স্থাপন কাজও প্রায় শেষ করা হয়েছিল। টিনের ছাউনি দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে গোল পাহাড় যাওয়ার মুখে রাস্তায় বিশাল জায়গা। তবে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রয়েছে।

এই বিষয়ে ম্যাক্স কন্সট্রাকশনের প্রকৌশলী মো. হাসমত উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সিডিএর প্রকল্পে জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু করি। হোটেল জামানের সামনের অংশের বেজ ও কলাম স্থাপন কাজও শেষ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু সেন্ট্রাল প্লাজার কিছু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা আমাদের কাজে বেশ কয়েকবার বাধা দেয়।

তিনি আরো বলেন, এই বিষয়টি আমরা প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানকে জানাই। তিনি সিডিএ চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানাবেন বলেছেন। কিন্তু আমাদেরকে এই সমস্যার কোনো সমাধানই দেয়নি সিডিএ। যার কারণে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়।

প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাধার মুখে জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স কনস্ট্রাকশনের কর্মকর্তাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কাজটি বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। আমি বিষয়টি তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে বেশ কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু এই বিষয়ে তিনি আমাদের কোনো সমাধান বা নির্দেশনা দেননি। ইতোমধ্যে সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে বাধার কারণে জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ স্থগিত করার বিষয়টি অস্বীকার করে সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বাধার কারণে এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ বন্ধ করার তথ্যটি সত্য নয়।

অন্যদিকে লালখানবাজার মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে সিডিএর নেই বলে জানা গেছে। সিডিএ সূত্র বলছে, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রকল্পের অধীনে লালখানবাজারে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করবে না সিডিএ।

তবে সিটি কর্পোরেশন থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার অধীনে লালখান বাজার মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানা যায়।

লালখান বাজার মোড়ের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে পথচারী কবির মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, প্রায়ই রাস্তার এপাড় থেকে ওপাড়ে হেঁটে যেতে হয়। আর মোড়ে ডিভাইডারে কোনো ফাঁকা না থাকায় সরু রাস্তা দিয়ে পার হতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিতে হয় রাতে রাস্তা পার হতে। ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের আশার বাণী শুধু শুনে যাই, বাস্তবায়ন কিছুই হয় না।-বলেন তিনি।