শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭

বিবাহিত-অবিবাহিত দ্বন্দ্বে আটকে আছে ছাত্রদলের কমিটি

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০, ১১:৩৯ অপরাহ্ণ


ইমরান এমি : চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের ১১ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর একে একে কেটে গেলো সাতটি বছর। সেই কমিটি আর পূর্ণাঙ্গ হয়নি।

নতুন কমিটি হওয়ার যেটুকু সম্ভাবনা সম্প্রতি তৈরি হয়েছিল বিবাহিত নেতাদের রাখা-না রাখা নিয়ে সে সম্ভাবনাও এখন কমে আসছে। যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসছে না বিএনপির এই ছাত্র সংগঠনে।

২০১৩ সালের ৩১ জুলাই গাজী সিরাজ উল্লাহকে সভাপতি ও বেলায়েত হোসেন বুলুকে সাধারণ সম্পাদক করে ১১ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। ৭ বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ভার নিতে নারাজ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

এই ব্যর্থতার পেছনে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দোষারোপ করছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে না পারলেও অব্যাহতি নেননি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কেউই। এখনো পদ আঁকড়ে বসে আছেন ৪০ বছর বয়সী এ ছাত্রনেতারা। অথচ তারা কেউ এখন আর ছাত্রদলে সময় দেন না বলে অভিযোগ আছে।

বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ পদে আসীন হয়ে সেই ছাত্রদল নেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন সেখানে। ২০১৩ সালের সেই কমিটির সভাপতি গাজী সিরাজ এখন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন বুলু চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক।

চার সহসভাপতির মধ্যে মঈন উদ্দিন শহীদ নগর বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক, ফজলুল হক সুমন নগর যুবদলের সহসভাপতি ও জিয়াউর রহমান জিয়া নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন। চার যুগ্ম সম্পাদকের মধ্যে জমির উদ্দিন নাহিদ স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক, আলী মর্তুজা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও মোশাররফ হোসেন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আরেক যুগ্ম সম্পাদক জালাল উদ্দিন সোহেল মারা গেছেন। নগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম রাশেদ এখন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। ১১ জনের মধ্যে শুধু সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরী নগর ছাত্রদলে আছেন।

জানা যায়, এক সময় নগরীতে ছাত্রদলের শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও এখন ছাত্রদলের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। বিএনপির সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলসহ দলীয় কর্মসূচিতে ও বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্রদলের সক্রিয় ভূমিকা ছিল না।

এক সময় ছাত্রদলের নেতাদের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো ছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম আইন কলেজ, পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ, বাকলিয়া শহীদ এন এম জে কলেজ (নোমান কলেজ) ও ব্যারিস্টার সুলতান আহমেদ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলও ছিল তাদের আশা জাগানিয়া। কিন্তু সাংগঠনিক স্থবিরতায় এখন কলেজগুলোতে ছাত্রদলের অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কমিটি না থাকায় উঠে আসছে না নতুন নেতৃত্ব। আর যারা হামলা মামলার শিকার করে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে সক্রিয় আছেন, কমিটি না হওয়ার কারণে তারাও হারিয়ে যাচ্ছেন মিছিল থেকে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন বুলু একুশে পত্রিকাকে বলেন, পুরনো কথা আমি বলতে চাই না। কেন কমিটি হয়নি, কাদের কারণে হয়নি, সেদিকে যাব না। নতুন কমিটিতে যেন সাহসী, মামলা হামলার শিকার ছাত্রনেতাদের রাখা হয় এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে করা হয় সেটার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।

সম্প্রতি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে হয়েছে। সেখানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের নির্দেশে স্থান পেয়েছেন ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া ছাত্ররা। পাশাপাশি পুরনো রীতি ভেঙে এবারের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন অবিবাহিত, নিয়মিত ছাত্ররা। সে ধারা জেলা ও মহানগর কমিটিতে রাখতে নির্ধারণ করে দেওয়া হয় কিছু ক্যাটাগরি। আর সে ক্যাটাগরির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ২০০০ সাল বা তারপরে এসএসসি হতে হবে এবং হতে হবে অবিবাহিত। এই শর্তের কারণে নতুন কমিটিতে বাদ যাচ্ছেন অনেক নেতা। নিয়মিত ছাত্র হলেও বিবাহিত হওয়ার কারণে কমিটিতে স্থান হারাতে হবে ত্যাগী ও মেধাবীদের। আর সেটা মানতে নারাজ তারা।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী বিবাহিত ছাত্রনেতারা তাদের কমিটিতে রাখার দাবিতে বিগত কয়েক মাস ধরে চালিয়ে আসছেন নানা কর্মসূচি। অবরুদ্ধও করে রেখেছেন বিএনপির নেতাদের। মুখোমুখি অবস্থানেও চলে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। সার্বিক বিষয়ে বিএনপি নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ করে বিবাহিত নেতাদের নিয়ে নূন্যতম কয়েক মাসের জন্য হলেও ছাত্রদলের একটি কমিটি দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তারেক রহমান নিজের সিদ্ধান্তে অটল। কোনভাবেই বিবাহিতদের কমিটিতে রাখা যাবে না। যার কারণে কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও অবিবাহিত-বিবাহিত দ্বন্ধে আটকে আছে নগর ছাত্রদলের কমিটি।

দলীয় সূত্র জানায়, বিবাহিতদের না রেখে কমিটি হলে সেক্ষেত্রে আন্দোলনে যাবে পদবঞ্চিত বিবাহিত ছাত্রদল নেতারা। আর সে আন্দোলনের প্রভাব পড়বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। যার কারণে নির্বাচনের আগে নগর ছাত্রদলের কমিটি হোক সেটা চান না নগর বিএনপির সভাপতি ও মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনসহ বিএনপির নেতারা। যার কারণে দীর্ঘদিনের কমিটির জট খুলছে না।

তবে বিবাহিত ছাত্রদল নেতাদের সংগঠিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যশী আলিফ উদ্দীন রুবেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতি করে আসছে। সিনিয়র নেতাদের দ্বন্ধের কারণে নগর ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে আমরা একটি পরিচয় পেতাম। এত বছর পর যখন কমিটি হচ্ছে সেখানে আমাদের বিবাহিত অজুহাতে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার পায়তারা চলছে। আমরা চাই আমাদের একটি পরিচয়। প্রয়োজনে এক মাসের জন্য বিবাহিত ও ত্যাগী নেতাদের নিয়ে একটি কমিটি করা হোক। এরপর বিবাহিতদের বাদ দিয়েই হোক, আমাদের আপত্তি নেই।

তিনি বলেন, কমিটিতে রাখা হবে কি হবে না সেটা এ মাসের ৩১ তারিখ আমাদের জানাবে। অবিবাহিত দাবি করে অনেক বিবাহিত ফরম জমা দিয়েছে। সবমিলিয়ে এই মাসেই একটি সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হবে এমনই আশ্বস্ত করেছে বিভাগীয় টিম। এরপরও যদি আমাদের বাদ দেওয়া হয় তাহলে আমরা আমরণ অনশনসহ কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।

তবে কমিটিতে বিবাহিতরা থাকছেন না জানিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ছাত্রদলের কমিটিতে বিবাহিতরা থাকছেন না। আমাদের যে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি মেনেই কমিটি হবে।

কমিটি কবে নাগাদ হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটি গঠনের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা কমিটির চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিতে পারব।