শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭

কক্সবাজারে দুদক আতঙ্ক

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০, ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ


কক্সবাজার : দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অভিযানে কক্সবাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকসহ ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্টরা এখন আতঙ্কে। কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িত অন্তত ৬০ জনের খোঁজ ইতিমধ্যে পেয়েছে দুদক; এই সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব দালালরা কক্সবাজারে চলমান ৭০টিরও বেশি প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ থেকে ‘কমিশন বাণিজ্য’ করে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদকের হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা থেকে ঘরে ও অফিসে তালা দিয়ে পালিয়েছেন কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কেন্দ্রিক তৎপর থাকা কয়েক ডজন দালাল। যারা এতদিন ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন।

দালালের তালিকায় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান ও তার ছেলে মেহেদি হাসানের নাম আসার পর তাদেরও ছাড় দিচ্ছে না দুদক।

গতকাল সোমবার দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি টিম পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান ও তার ছেলে মেহেদি হাসানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ লাখ ১২ হাজার টাকা জব্দ করে।

এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে দুদকের একটি টিম মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শাখা থেকে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের ১১টি একাউন্ট থেকে ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯০ টাকা জব্দ করেছে।

পরদিন ১৫ সেপ্টেম্বর পৌর মেয়র মুজিবুর ও তার পরিবারের ৬ কোটি টাকার সম্পত্তির খোঁজ পায় দুদক। অবৈধ উপায়ে অর্জিত সন্দেহে এসব সম্পদ অভিযুক্তদের হস্তান্তর না করার জন্য কক্সবাজারের সাব-রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দেওয়া হয় দুদকের পক্ষ থেকে।

১৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পৌরসভা মেয়র মুজিবুর রহমানের আটটি দলিল জব্দ করে দুদক। এর মধ্যে তিনটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বায়নাকৃত। অন্যদিকে বাকি পাঁচটি আমমোক্তারনামা। জব্দ করা দলিলের জমির পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৮৩ শতক।

কক্সবাজারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি মুজিবুর রহমানকে এভাবে আইনের আওতায় আনার চিত্র দেখে কক্সবাজারের বিভিন্ন অফিসে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালরা অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জোরালো লবিং-তদবির করছেন বলেও জানা যাচ্ছে।

কক্সবাজারে দুদকের ধারাবাহিক অভিযান শুরু হয় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক সার্ভেয়ারকে র‌্যাবের সহযোগিতায় নগদ ৯৩ লাখ টাকাসহ আটক করে দুদক। পরে ২২ জুলাই মো. সেলিম উল্লাহ, ৩ আগস্ট মোহাম্মদ কামরুদ্দিন ও সালাহ উদ্দিন নামের তিন দালালকে আটক করে দুদক। আটকের সময় এসব দালালের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার নগদ চেক ও ভূমি অধিগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি উদ্ধার করা হয়।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাবেদ মো. কায়সার নোবেলের কাছ থেকে দুই দফায় ২১ কোটি ২২ লাখ টাকা জব্দ ও কক্সবাজার শহরে তার চারটি ফ্ল্যাটেরও নিয়ন্ত্রণ নেয় দুদক। গত রোববার কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী এলাকায় অভিযান চালিয়ে নোবেলের জমির নিয়ন্ত্রণ নেয় দুদক।

কক্সবাজারে দুদকের ধারাবাহিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে আসা দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে কক্সবাজারের ১০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান করছে দুদক। তারা কক্সবাজারে চলমান ৭০টিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তিনি বলেন, দুর্নীতিতে জড়িত জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকসহ ৬০ জনের খোঁজ ইতিমধ্যে আমরা পেয়েছি, তাদের অবৈধ সম্পদের ব্যাপারেও অনুসন্ধান চলছে।