
তাপস কুমার নন্দী :দুর্গাপূজার দিন দশ-পনেরো আগে কাঁধে ঢাক নিয়ে বেরিয়ে যেতেন তাঁরা। ফিরতেন পুজো শেষ হওয়ার পরে। কেউ যেতেন শহরে, কেউবা গ্রামে। অনেকে আসতেন বিভিন্ন এলাকা থেকে। কিন্তু এবার কী হবে! দুর্গাপূজার যদিও বেশ কিছুদিন দেরি। কিন্তু এখনও কোনও ঢাকিই বায়না পাননি।
অন্য বছর এই সময় ঢাকের ‘ফিটিং’ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন ঢাকিরা। অনেকে ঢাকের খোল তৈরি করেন। নিয়মিত রেওয়াজ হয়। কিন্তু করোনা সব কিছু বদলে দিয়েছে।
বাশঁখালীর সাধনপুরের প্রবীণ ঢাকি অজিত জলদাস বলছিলেন, “বাইরের কোনও পুজো থেকে এখনও ফোন আসেনি। সবই অনিশ্চিত। কী হবে, বুঝতে পারছি না।”
বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে তিন-চার হাজার ঢাকি আছেন। দুর্গাপূজার সময়ে তাঁদের মধ্যে দেড়-দুই হাজার শিল্পী চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তের মণ্ডপে ঢাক বাজাতে যান। অনেকে জেলার বড় বড় মণ্ডপে থাকেন। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অনেকের চুক্তি থাকে। কেউ কেউ শুধু পুজোর সময়েই বরাত পান। কেউ আবার প্রবীণ ঢাকিদের সঙ্গী হয়ে বেরিয়ে পড়েন। দুর্গাপূজার সময়ে যাতায়াত বাদ দিয়ে মণ্ডপে কমবেশি পাঁচ দিনের বরাত থাকে ঢাকিদের। খুব কম হলেও জনপ্রতি ৫-১০ হাজার টাকা রোজগার হয়। কিন্তু এবার সে সুযোগ কই?
দেবেন দাস নামে চন্দনাইশের এক ঢাকি বলেন, “দুর্গাপূজার মওসুমেই আমাদের প্রায় সারা বছরের রোজগার হয়। কিন্তু এ বার এখনও কোনও ফোন আসেনি।”
শীতল দাস নামে বোয়ালখালীর আরেক ঢাকির কথায়, “আমরা একসঙ্গে আটজন চট্টগ্রাম শহরের বড় পুজোগুলোতে যাই। কিন্তু এবার তিন জনকে ডেকেছে। বাকিদের এবার যেতে হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে পুজো কমিটি।”
পুজো কমিটি করোনা পরিস্থিতিতে জেলার বড় বড় পুজোতেও কাটছাঁট হয়েছে। সেখানেও কমছে ঢাকির সংখ্যা।
পটিয়ার বাশিমোহন জলদাস বলছিলেন, “ঢাক, কাঁসি নিয়ে এক-একটা দলে পাঁচ-সাত জন করে থাকি। স্থানীয় মণ্ডপগুলো থেকেও আমরা ডাক পেতাম। এবার তাও কম আসছে।” তবে তাঁদের আশা, পুজোর আগে আরো কিছুটা স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে।
বোয়ালখালীতে বিনয়বাশী জলদাসের ১০টি পরিবার মওসুমী ঢাকি। দুর্গাপূজার মওসুমে ঢাক বাজান। করোনা আবহে এবারপরিস্থিতি ভিন্ন। ফলে রোজগারে টান। পুজোয় কী হবে তাও নিশ্চিত নয়।
নগরীর পাথরঘাটার দুলাল, রাজকুমারেরা জানান, পুজোমণ্ডপে পাঁচদিন বাজালে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা মেলে। খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা উদ্যোক্তারাই করেন। এবার সেটা অনিশ্চিত। পুজো কমিটিগুলো থেকেও অগ্রিম বায়না করেননি কেউ। তবে এখনই হতাশ হতে রাজি নন তাঁরা।
ঢাকিরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “ঢাকের বোলে মা দুর্গার বোধন হয়। বিসর্জনও হয়। আমরা উপেক্ষিত হলে চলবে কী করে? এখনও তো সময় আছে।”
