ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া


চট্টগ্রাম : চারপাশে ধর্ষণময়, গুটগুটে এক অন্ধকার পরিস্থিতি। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী পর্যন্ত। সাম্প্রতিক লাগাতর ধর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডামাডোল বাজছে দেশজুড়ে। ৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়ে হচ্ছে ধর্ষণের প্রতিবাদ। কিন্তু সেই প্রতিবাদে কিছুই হচ্ছে না। বরং প্রতিবাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ। ধর্ষণকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলছে, তোমাদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আমাদের টিকিটি ছুঁতে পারবে না। আমরা তোমাদের চেয়েও শক্তিশালী।

ঠিক এরকম এক দমবন্ধ পরিবেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রীসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামিকাল অধ্যাদেশ জারি করবে আইন মন্ত্রণালয়। আইনটি মন্ত্রীসভায় অনুমোদনের পর বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। বলেছেন সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। আবার কেউ কেউ এই আইনের বিরোধিতা করে সঠিক প্রয়োগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

নূর সাদিক নামে প্রাক্তন এক ছাত্রনেতা ও ব্যাংকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড মন্ত্রীসভায় অনুমোদনের পর তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘যারা রিলেশনে আছে, তাদের জন্য এই আইন হতে পারে মরণফাঁদ। ভাইয়েরা হয় নিজেকে সংযত করুন, নতুবা বিয়ে করে ফেলুন। এছাড়া আর বাঁচবার উপায় নেই। কেন মরণফাঁদ বলছি তা ভেবে দেখুন। উত্তর আপনি নিজেই।’ এবার আমরা সমাজের বিশিষ্টজনদের মতামত শুনে আসি-

ধর্ষকের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই : আনোয়ারা বেগম

এই আইনকে সাধুবাদ জানিয়ে দেশের প্রথম নারী ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব আনোয়ারা বেগম বলেন, চারপাশে ধর্ষিতার আর্তনাদ, আর ধর্ষকের নগ্ন আস্ফালন-তাই আজকের করুণ সময়টা এমন একটি আইনের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তিনি বলেন, কারাগারে নয়, জনসমক্ষে, প্রকাশ্যে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া উচিত। ধর্ষণ করলে কী শাস্তি হয়, তা সবাই দেখুক, জানুক।

অনেক বুদ্ধিজীবী বলবেন, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া ঠিক হয়নি। যাবজ্জীবন হলে ভালো হতো। যাবজ্জীবন হলে কয়েকবছর পর তারা বেরিয়ে আসবে। তাই এই আইনের কোনো বিকল্প ছিল না-যোগ করেন আনোয়ারা বেগম।

এই আইনের ফলে সমাজ-রাষ্ট্র ঘুরে দাঁড়াবে : অধ্যাপক সেকান্দর চৌধুরী

এই আইনের ফলে সমাজ, রাষ্ট্র ঘুরে দাঁড়াবে এবং এটা ধর্ষণকে অনেকহারে প্রতিরোধ করবে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সেকান্দর চৌধুরী। তবে শুধু আইন নয়, আইনের বাস্তবায়ন জরুরি, সেই সাথে যুব সমাজ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্ষণে নিরুৎসাহিত করণে ভূমিকা রাখতে হবে বলে মত দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একরকমের ধর্ষণ হয়েছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা, বিহারীরা আমাদের আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার একধরনের সাম্প্রদায়িক ধর্ষণবোধ জারি করেছে। এভাবে ২০০০ সাল থেকে সম্প্রতি ধর্ষণ বেড়ে গেছে তাই সবার একটি দাবি ছিলো, সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যদণ্ড না থাকায় এটি বেড়ে গিয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই যে, গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন দিয়েছেন মন্ত্রীসভায়। এটি ধর্ষণ ও যৌননিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।

শুধু শাস্তি দিয়ে সমাজের কোনো অপরাধ নিবৃত্ত করা যায় না : আখতার কবির চৌধুরী

সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে সমাজের কোনো অপরাধকে নিবৃত্ত করা যায় না। সমাজকে মনন, মানসিকতায় নারীবান্ধব হিসেবে পুরোপুরি তৈরি করতে হয়। আমাদের এখানে নারী সম্পর্কে যে শ্রদ্ধা, বিশ্বাসের জায়গা সেটাকে একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে গেছে সমাজপতিরা।

নারীকে সম্মান করার জায়গায় যতদিন পুরুষকে নিতে না পারবো ততদিন পর্যন্ত কঠিনতম আইন করেও ধর্ষণ বন্ধ হবে না। এটা চলছে, চলতে থাকবে। বলেন অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘এ রকম একটি ‘হিট অব দ্য মোমেন্টে’, এখনকার অবস্থায় তড়িগড়ি করে কোন আইন করা এটা কখনো সমাজের জন্য কিংবা যারা ভিকটিম তাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। এগুলো শুধুমাত্র জনগণের আইওয়াশ করার জন্য, জনগণকে শান্ত করার জন্য করা হচ্ছে। শুধু মৃত্যুদণ্ড করায় কোন সুফল আসবে না। নারীদের উপযোগি সমাজ গড়তে আন্তরিকভাবে কাজ করা দরকার।’

এই আইন মাইলফলক : অ্যাডভোকেট রানু

অব্যাহত নারীনির্যাতন, নারীধর্ষণ রোধে এই আইনকে মাইফলক উল্রেখ করে চট্টগ্রামের নারীনেত্রী ও ফাইট ফর উইমেন রাইটসের সভাপতি অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, আমরা এই সরকারকে সাধুবাদ জানাতে চাই। নারীবান্ধব পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর যে সমাজে সুস্থ, অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন তা অনুধাবন করার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনাr বিকল্প নেই। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মানুষের ভাষা, চোখের ভাষা বুঝতে পারেন বলেই আজ ইতিহাস সৃষ্টি হলো।

তবে এই আইনের অপপ্রয়োগ যেন না হয়, সে ব্যাপারেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার রেহানা বেগম রানু।

এটিকে আমি শতভাগ সমর্থন করি : প্রদীপ দেওয়ানজী

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডকে শতভাগ সমর্থন করে চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা যে পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো তাতে করে এইরকম একটি কঠিন ও সময়োপযোগী আইনের খুব দরকার ছিল। একদিন দেরি হলেও অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো।

শুধু সামাজিক বাস্তবতা নয়, এটার পেছনে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিরোধী শক্তিরও অনেকগুলো ইনটেশনাল ব্যাপার এখানে ঘটছে। ফলে আইনশৃঙ্খলাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো। এই আইনটি সেসব শঙ্কা-প্রতিকূলতাতে মোকাবিলা করতেও ভূমিকা রাখবে।

প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, সরকারকে আরেকটা জায়গায় আমি দুর্দান্তভাবে সমর্থন দিতে চাই যে, আগে এগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন আড়াল করা হতো, তেমনি ধর্ষিতা নারীও সামাজিক হেনস্তা, ধর্ষকের হুমকি ও আইনগত ঝক্কিঝামেলা এড়াতে বিষয়গুলো গোপন করতো। সরকারের তরিৎ এগিয়ে আসা ও নানা প্রণোদনার ফলে নারীরা আর বসে নেই। এধরনের ঘটনার মুখোমুখি হলেই তারা মুখ খুলছে, থানায় এসে নির্ভয়ে অভিযোগ করছেন। আমি মনে করি এই যে ভীতিমুক্ত, বাকরুদ্ধহীন পরিবেশ সৃষ্টি, এটিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

এই মুহূর্তে এই ধরনের শাস্তি একটা স্বস্তি বয়ে এনেছে : মিলি চৌধুরী

আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অ্যাডভোকেট মিলি চৌধুরী এই আইনকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন,
এই ক’দিন মনে হচ্ছিলো আমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। এই ধারাবাহিক ধর্ষণগুলো আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আজকে অন্তত একটুখানি স্বস্তি দেখছি।

আপনি দেখুন, মানুষ অনেক সচেতনভাবেই এবার ধর্ষণের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে ধর্ষণ থেমে নেই। প্রতিদিন নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে। বেগমগঞ্জের ঘটনার পরপর আরও অসংখ্য ঘটনা ঘটে গেলো। আমার মনে হচ্ছে যে, মানুষগুলো আরও বেশি হিংস্র হয়ে গেছে। রাস্তায় হাটার সময় গাছাড়া ভাব সমস্ত লোকগুলোর। এটা আমি আজকে আসার সময়ও অনুভব করেছি।

এই মুহুর্তে এই ধরনের একটা শাস্তি আমার জন্য একটা স্বস্তি বয়ে এনেছে, শুধু আমি কেন, আমাদের মতো অনেক মেয়ের কাছে মনে হচ্ছে যে একটা পাথরের ফাঁক দিয়ে নিশ্বাস যেন ফেলতে পারছি। বলেন মিলি চৌধুরী।

ধর্ষণের পর ভিকটিমকে হত্যার প্রবণতা বাড়বে : মোস্তফা ইউসুফ

মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংস্কার করার সিদ্ধান্ত মূলত একটা মনোরঞ্জনবাদী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন ডেইলি স্টারের চট্টগ্রাম স্টাফ করসপনডেন্ট মোস্তফা ইউসুফ।

তিনি বলেন, প্রয়োজন ছিল বিদ্যমান আইনে ধর্ষককে বিচারের মুখোমুখি করা। ধর্ষক যেন রাজনৈতিক পরিচয়ে পার না পেয়ে যেতে পারে, সে ব্যবস্থা করা। বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রিতা থেকে মুক্তি দিয়ে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

এখন যেহেতু মৃত্যুদণ্ডের বিধান এসেছে, ধর্ষণের পরে ভিকটিমকে হত্যার প্রবণতা বাড়বে। আমেরিকার যে
অঙ্গরাজ্যে ধর্ষণে মৃত্যুর বিধান আছে, সেখানে নারীর উপর সহিংসতার হার বেশি। যোগ করেন সাংবাদিক মোস্তফা ইউসুফ।