- অস্ত্রধারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা
জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে গড়ে উঠা বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠেছে। রোহিঙ্গা শিবিরে গোলাগুলি, খুনোখুনি, জ্বালাও-পোড়াও এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
গত সপ্তাহে দুই রোহিঙ্গা গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে এক নারীসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় বাংলাদেশি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন নারী ও শিশুসহ শতাধিক রোহিঙ্গা। আতঙ্কে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে পাশ্ববর্তী নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে শত শত রোহিঙ্গা পরিবার।
গত কয়েকদিন বড় ধরনের ঘটনা না ঘটলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখনো থমথমে পরিস্থিতি। প্রতি রাতে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ। যে কোন সময় আবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংঙ্কা করছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা।
এভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অশান্ত হয়ে পড়ার পেছনে মিয়ানমার সরকারের ইন্ধন ও অর্থায়ন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে এমন সময় রোহিঙ্গা শিবিরে সন্ত্রাসীরা দাপট দেখাচ্ছে, যখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ, গাম্মিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত করতে লড়াই করছে।
অন্যদিকে বরাবরের মতই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপরে গণহত্যা, নিপীড়নকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান বলে আখ্যায়িত করে বিশ্ব দরবারে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার।
এ অবস্থায় ‘আধিপত্য বিস্তারকে’ কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা মাস্টার মুন্না ও মাস্টার আবুল কালাম গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপ সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে তথ্য আসছে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অশান্ত হয়ে উঠা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে রোহিঙ্গা শিবির সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে।
রোহিঙ্গাদের একটি অংশের দাবি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নয়, মূলত মিয়ানমার সরকার বা সে দেশের সেনাবাহিনীর ইশারায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে উগ্রপন্থী রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো। শিবিরে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে ওই গ্রুপের নেতারা কৌশলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে।
বিশ্ব দরবারে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসাবে তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সংঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জানা গেছে, মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ হত্যাকাণ্ডের পর উখিয়া-টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়লে ওই সুযোগে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ভয়ংকর হয়ে উঠে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। সে থেকে এখন পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনি অব্যাহত রেখেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাস্টার মুন্না গ্রুপ, মৌলভী আনাস গ্রুপ, মাস্টার আবুল কালাম গ্রুপ, হাকিম ডাকাত, জকির গ্রুপসহ আরও কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপের অপতৎপরতা রয়েছে। তাদের হাতে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যোগাযোগের জন্য তারা ‘ওয়াকিটকি’ও ব্যবহার করছে।
অভিযোগ আছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক বেশিরভাগ সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে এখন মিয়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিরা যোগাযোগ রাখছেন রোহিঙ্গা প্রতিনিধির মাধ্যমে।
শরণার্থী শিবির অশান্ত করার শর্তে মাস্টার মুন্নাসহ কয়েকটি গ্রুপকে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা ফ্রিতে দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এতে করে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মিয়ানমার সরকারের ইশারায় সংঘর্ষে জড়িয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অশান্ত করে তুলছে।
অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করছে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। মাস্টার মুন্না, মাস্টার আবুল কালামসহ একাধিক রোহিঙ্গা কেন্দ্রিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহ করছে টেকনাফের রঙ্গিখালীর গিয়াস বাহিনী। গিয়াস বাহিনীর নিজস্ব কারিগর দিয়ে অস্ত্র তৈরি করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী জানান, মাস্টার মুন্নার লোকজন কোন কারণ ছাড়াই সাধারণ কিছু রোহিঙ্গা যুবক বা বৃদ্ধদের ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। পরে আল-ইয়াকিনের লোকজন তাদেরকে মারধর করছে। এরপর চাঁদা না দিলে প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে এ ধরনের শেখানো কথা বলতে বাধ্য করছে। পরে কথাগুলো ভিডিওধারণ করে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
যে সব রোহিঙ্গাদের হত্যা করলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অশান্ত উঠতে পারে, টার্গেট করে তাদেরকে আল-ইয়াকিনের নেতা বা সদস্য বলে ক্যাম্পে প্রচার করে ওইসব ব্যক্তিদের হত্যা করতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের উস্কানি দিচ্ছে মাস্টার মুন্না গ্রুপের লোকজন। এতে করে রোহিঙ্গা বিভিন্ন গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি দাবি করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আল-ইয়াকিনের কোন অস্তিত্ব নেই। আল-ইয়াকিনের নাম ভাঙিয়ে মূলত ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। কথিত আল-ইয়াকিন মিয়ানমার সরকারের সৃষ্টি। যারা আল-ইয়াকিনের নেতা দাবি করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাঁদাবাজি করছে, তারা আসলে মিয়ামারের গুপ্তচর।
তার দাবি, মাস্টার মুন্না মিয়ানমার সরকারের এজেন্ট। শত কোটি টাকার ইয়াবার বিনিময়ে মাস্টার মুন্নাকে দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে মিয়ানমার সরকার।
তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ৩৫ জন সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসীকে মাস্টার মুন্না ভাড়া করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনে রেখেছেন। এতে করে যে কোন সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংঙ্কা রয়েছে।
সোনফবাব নামের একজন রোহিঙ্গা তাদের পরিচালিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এক বার্তায় দাবি করেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে তাদেরকে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন মাস্টার মুন্না। তার দাবি, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য মাস্টার মুন্নাকে ৬০ কোটি টাকা দিয়েছে।
এদিকে পেট্রোল হাতে নিয়ে দুই রোহিঙ্গা যুবক এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছে, তাদেরকে নগদ টাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঘরগুলোতে অগ্নিসংযোগ করার জন্য পাঠিয়েছিল ডাকাত মুন্না অর্থাৎ মাস্টার মুন্না। ভিডিওটি একুশে পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত আছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারসহ নানান দাবিতে সোচ্চার লন্ডন প্রবাসী রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাম্প্রতিক সংঘাতের পেছনে মিয়ানমার সরকারের হাত রয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দুই সদস্য আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার দায় স্বীকার করে দেয়া বক্তব্যের পর তারা (মিয়ানমার) এক প্রকার পাগল হয়ে গেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উগ্রপন্থীদের মাধ্যমে সংঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে মিয়ানমার। পাশাপাশি মিয়ানমারেও ফের রোহিঙ্গাদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।
রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি রোহিঙ্গা শিবিরে সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান জোরদার করে, তখন মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদেরকে নিরাপত্তার স্বার্থে সে দেশে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদেরকে হিংসা, হানাহানি থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানান রোহিঙ্গা নেতা মো. ইলিয়াস।
রোহিঙ্গা রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা জালাল আহমদ বলেন, ক্যাম্পে সংঘর্ষে লিপ্ত দুই গ্রুপের লোকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
তিনি বলেন, মূলত মুন্না ও আবুল কালাম দুইজনই রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) গ্রুপের নেতা। বিভিন্ন কারণে, অকারণে মাস্টার মুন্না দল ত্যাগ করে চলে আসার কারণে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। তাদের সাথে মিয়ানমার সরকারের যোগসাজশ আছে, যা তদন্ত করলে বের হয়ে আসবে।
জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু দ্দৌজা একুশে পত্রিকাকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে, অপরাধীদের অনেকেই ধরা পড়েছে।
ক্যাম্প অশান্ত হওয়ার পেছনে মিয়ানমার সরকারে সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। তবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ সংঘাত হচ্ছে বলে আপাতত আমরা ধারণা করছি।
এ বিষয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি পুরোপুরি আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ক্যাম্পে সংঘর্ষে জড়িতদের অনেকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে।
রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘর্ষের পেছনে মিয়ানমার সরকারের সম্পৃক্ততার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনাদের কাছে যদি কোনো তথ্য থাকে, আমাদেরকে তা দিয়ে সহযোগিতা করুন।

