বিশেষ সম্পাদকীয়। ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকারের অপব্যবহার বন্ধ হোক


আজাদ তালুকদার : সংসদ সদস্য হলে তাঁর গাড়িতে স্টিকার থাকবে সেটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আমরা এমনও এমপি দেখেছি, যার পরিবারের ৭ সদস্যই পৃথক পৃথকভাবে গাড়িতে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগিয়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াতেন।

এক সংরক্ষিত আসনের এমপিকে দেখেছি, যিনি এমপি ছিলেন ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত। কিন্তু এমপি পদ গত হওয়ার পরও অর্থাৎ ২০১৮ সাল পর্যন্ত গাড়িতে সেই স্টিকার রেখে দিয়েছিলেন তিনি। শুধু তা নয়, তার ডাক্তার কন্যাও গাড়িতে সমানে ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকার লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।

তাদের সেই স্টিকারপ্রীতি, অনৈতিক স্টিকার-ব্যবহার নিয়ে কলম ধরতে হয়েছিল একুশে পত্রিকাকে। আর তখনই একবুক মনোবেদনা নিয়ে চির ‘স্বাদ’র স্টিকার ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তারা।

প্রায় ৬ বছর আগে ঢাকায় এক নারী এমপির পুত্র বখতিয়ার আলম রনি যে গাড়িতে চড়ে মাতাল অবস্থায় গুলি করে রিকশাচালক হাকিম ও জনকণ্ঠ পত্রিকার অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলীকে হত্যা করেছিলেন, সেই গাড়িতেও ছিল ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকার।

২৫ অক্টোবর তুচ্ছ ঘটনায় নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে পিটিয়ে দাঁত ভেঙে দেওয়া এবং তার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার ঘটনাটিও ঘটিয়েছেন এমপিপুত্র ইরফান সেলিম এবং তার গাড়ির চালক-দেহরক্ষীরা। বলাবাহুল্য তাদের বহন করা গাড়িতেও ছিল যথারীতি ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকার। ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকার থাকলেও সেই গাড়িতে সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ছিলেন না।

নৌ কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত ইরফান একদিকে এমপিপুত্র ও অন্যদিকে নোয়াখালী-৪ আসনের সাংসদ একরামুল করীম চৌধুরীর জামাতা। এছাড়া ইরফান নিজে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।

এর আগে ২০১৮ সালের জুন মাসে ঢাকার মহাখালীতে ইরফান সেলিমের শালা শাবাব চৌধুরীও ‘সংসদ সদস্য স্টিকার’ যুক্ত গাড়ি দিয়ে এক চালককে পিষে হত্যা করেন। শাবাব নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরী ও নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার চেয়ারম্যান কামরুন্নাহার শিউলির একমাত্র ছেলে।

সর্বশেষ গত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানা পুলিশের টহল গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে আরো একবার আলোচনায় আসেন এমপিপুত্র শাবাব চৌধুরী। উক্ত দুটি ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

হামেশাই ঘটছে এমন ঘটনা। অর্থাৎ গাড়িতে সংসদ সদস্য স্টিকার লাগিয়ে ঘুরছেন স্বজনেরা। অবশ্য সব সংসদ সদস্যের বেলায় এমন যথেচ্ছাচার হচ্ছে তা নয়। কিন্তু যাদের হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে স্টিকারের আড়ালে অপরাধ প্রবণতা বা অপরাধ ঝুঁকি তো থেকেই যায়, উপরন্তু স্টিকারযুক্ত গাড়িতে বসার পর কতিপয় সংসদ সদস্যের স্বজনের মাঝে এমন রাজা রাজা ভাব থাকে, কেউ কেউ তখন নিজেদেরকে দুর্দমনীয়, অপ্রতিরোধ্য মনে করে থাকেন। তারা মনে করতে থাকেন যে, এই স্টিকারটি বোধহয় তাদের সকল কিছুর রক্ষাকবচ!

আজকের দিনে তাই এমন দাবি ওঠতেই পারে ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকারের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ হোক। সংসদ সদস্য ছাড়া এই স্টিকার অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবেন না। যদি করেন তবে তা হবে অন্যায়, অপরাধের শামিল।

লেখক: সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।