জাতীয় নির্বাচনে ‘বক্তৃতাই’ যে প্রার্থীর পুঁজি!


চট্টগ্রাম : সময়টা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। দেশব্যাপী জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সদ্য ছাত্রলীগ সভাপতির পদ ছেড়ে আসা তরুণতম নেতা মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী।

অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী রানিং এমপি শাহজাহান চৌধুরী, আর বিএনপির প্রার্থী তৎসময়ে দলটির দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, প্রভাবশালী এ নেতা যোগাযোগ মন্ত্রীর ‘তকমায়’ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তখনও।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তখন সাতকানিয়া-লোহাগড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল বেশ নড়বড়ে। জামায়াতের একচ্ছত্র আধিপত্য। তার উপর আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও জাফর আহমদ চৌধুরীর মধ্যে গ্রুপিং তুঙ্গে। ‘৯১ সালে এই আসনে নির্বাচন করে জামায়াতের কাছে পরাজিত হন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। আর ‘৯৬ এ মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা জাফর আহমদ চৌধুরী। এ পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতা মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে আসুক দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে সেই চাওয়াটিও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠেছিল।

কাজেই একদিকে জামায়াতের অস্তিত্ব রক্ষা, অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার সর্বশক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি দলীয় গ্রুপিংয়ে ছত্রছান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তির বিপরীতে ভোটের মাঠে ৩১ বছরের একজন তরুণ। সারাদেশে ছাত্রসমাজের আইকন, জননেত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদ, মেধা-মনন আর অনলবর্ষী বক্তার ‘তকমাই’ নির্বাচনী মাঠে যার ভিত্তিমূল।

হেভিওয়েট বিএনপি প্রার্থীর টাকার খেলা আর আধিপত্য, সাতকানিয়ায় সারাদেশের জামায়াত শক্তির ঐক্যবদ্ধ উল্লম্ফন, সেই সাথে অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ গ্রামীণ নারীদেরকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট নিশ্চিতে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে ছাত্রী সংস্থার কর্মীদের ঘরে ঘরে শপথ পড়ানোর মওকা, জামায়াত প্রার্থীর জন্য প্রবাসে অবস্থানরত সাতকানিয়া-লোহাগড়ার মানুষের কাড়ি কাড়ি অর্থের জোগান, কর্নেল অলির পক্ষে ঠিকাদারদের বস্তাভর্তি  অর্থ ছিটানোর বিপরীতে অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তিবিহীন মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীর শক্তি কেবল ‘মন্ত্রমুগ্ধ বক্তৃতা’।

বক্তৃতাকে উপজীব্য করে তৎকালীন মিনি পাকিস্তান খ্যাত সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার ভোটের ময়দান মাত করছেন তিনি। মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী বক্তৃতা করছেন শুনে জড়ো হচ্ছেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। মুহূর্তে কানায় কানায় ভরে উঠছে তাঁর নির্বাচনী সমাবেশ।

অশুভ শক্তিতে বলিষ্ঠ, বলীয়ান জামায়াত-বিএনপির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বার্তা ছড়িয়ে সম্মোহনী বক্তৃতাবাজিতে নির্বাচন করে তরুণতম প্রার্থী মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান জামায়াতের সাথে ৬ হাজার। যদিও সেই নির্বাচনে জিতেছিলেন বিএনপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। দুই প্রার্থীর অর্থ ও নিরবচ্ছিন্ন শক্তির কাছে আপাত পরাজয় ঘটলেও রগ কাটার রাজনীতি ও পাকিস্তানি অপশক্তির দুর্গে হানা দিয়ে তাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সেইদিনের তরুণ মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী।

সেই নির্বাচনে একই সাথে পরাজিত হয়েছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার (আনোয়ারা), মোছলেম উদ্দিন আহমেদ (পটিয়া), এডভোকেট সুলতানুল কবির চৌধুরী (বাঁশখালী), নুরুল ইসলাম বিএসসি (বোয়ালখালী), ডা. আফছারুল আমীন (ডবলমুরিং) এর মতো ঝানু প্রার্থীরা। বলাবাহুল্য, দক্ষিণ চট্টগ্রামে ওই সময় একটি আসনও পায়নি আওয়ামী লীগ।

অথচ হারার ‘তকমা’ পাওয়ার পরও পরবর্তীতে উল্লিখিত সবাই একাধিক বার মনোনয়ন পেয়েছেন। এমপি-মন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত হয়েছেন।

সেই বিবেচনায় পরবর্তীতে আর কোনো সুযোগই পাননি মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী। টানা ২৪ বছর ধরে পদপদবীর বাইরে থাকলেও বিন্দুমাত্র হতাশ হননি তিনি। জয়বাংলা স্লোগান ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে নীরবে পার করছেন সোনালী শক্তিমত্তার দিনগুলো।

যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রেসিডিয়াম পদে জায়গা দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মেধাবী অর্জন মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীকে দলে সক্রিয় করা হচ্ছে এমন আলোচনা চাওর হওয়ার পর মঈনুদ্দিনের অতীত সুকীর্তি ও গল্পগুলো স্থান পাচ্ছে রাজনীতি-সচেতনদের মুখে মুখে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রলীগে মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীর কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা ইকবালুর রহীম (দিনাজপুর) আওয়ামী লীগের টিকিটে তিন তিনবারের এমপি (২০০৮ থেকে ২০২০)। এছাড়া প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারি দলের হুইপ।

একইভাবে তার রাজনৈতিক শিষ্যদেরও অনেকেই মন্ত্রী-এমপি কিংবা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। এসব বিবেচনায় রাজনীতির মাঠে ইস্পাত-কঠিন মনোবল ও দৃঢ়তায় গড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীকে দলের যে কোনো পর্যায়ে কাজে লাগানো সম্ভব হলে তিনি ফের জ্বলে ওঠতে পারেন, দলের শক্তিতে পরিণত হতে পারেন এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।