
একুশে প্রতিবেদক : ঘাতকদের ব্রাশ ফায়ারে লুটিয়ে পড়েছিলেন জাতীয় চার নেতা। মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যাচ্ছিলেন ঘাতকরা। গেইট পর্যন্ত চলেও গিয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণে দুই পা ঝাঁঝড়া হয়ে যাওয়া ক্যাপ্টেন মনসুর প্রায় বিচ্ছিন্ন পা দুটি টেনে নিয়ে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে পানি পানি বলে গোঙাচ্ছিলেন। একজন কারারক্ষী গোঙানির শব্দ শুনে দৌড়ে যান গেইট পর্যন্ত চলে যাওয়া ঘাতকদের কাছে। বলেন, একজন এখনো মরেনি। ফিরে এলেন ঘাতকরা। এবার শুধু মনসুর আলীই নন, মৃত তিনজনকেও ফের ব্রাশফায়ার করেন, বেয়নেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করেন মনসুর আলীসহ জাতীয় চার নেতাকে।
জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর প্রতীক সেই ভয়াল ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এই তথ্য জানিয়েছেন। গতবছর জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ৩ নভেম্বর রাতে জেলখানায় জাতীয় চার নেতার সাথে আমিও ছিলাম। চার নেতার সাথে গ্রেপ্তার হই এবং একই রুমে রাত যাপন করি। রাত প্রায় তখন ৪টা কি সোয়া চারটা হবে, একটা ভবনের তিনটা রুমে আমাদের রাখা হয়। ১ নম্বর রুমে ছিলেন তাজউদ্দীন সাহেব ও শ্রদ্ধেয় নজরুল ইসলাম সাহেবসহ ৮ জন। ২ নম্বর রুমে ছিলাম এইচ এম কামরুজ্জামান, শেখ আব্দুল আজিজ ও আমিসহ ৮-৯ জন। ৩ নম্বর রুমে ছিলেন এম মনছুর আলী, আব্দুস সামাদ আজাদ ও আমু ভাইসহ প্রায় ১২ জন।
মায়া বলেন, ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর পরিবার শহীদ হন। ৮ দিন পর ২৩ আগস্ট আমাদের ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বেলা ২টার সময় কোরবান আলী আত্মসমর্পণ করেন। এই নিয়ে ২৩ জন গ্রেপ্তার। তিনটা রুমে জাতীয় নেতারা চিন্তা করলেন, আমরা তো বয়সে ছোট ছিলাম, বললেন আমরা ছোট-বড় মিলে ভাগ করে থাকবো। ওই ভাবে শ্রেণী বিন্যাস করে তারা আমাদের তিনটি রুমে রাখলেন। তবে আমরা যখন জেলখানায় ছিলাম, অনেকের বিচার শুরু হয়নি। গাজী ভাইয়ের বিচার শুরু হয়। কোরবান আলী ভাইয়ের বিচার শুরু হয়। কামরুজ্জামান ভাইয়ের বিচার শুরু হয়। সকাল বেলা নিয়ে যায়, আটটার সময়। বিকেলে তাদেরকে কোর্ট মার্শাল থেকে নিয়ে আসে। এসে জাতীয় নেতারা নানান কথা বলেন। আর বিকেল বেলা পায়চারি করেন। কিন্তু একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, তারা যখন হাঁটতেন, আমরাও পেছনে হাঁটতাম। আমি, প্যাটেল, আমরা সবাই। শোনার জন্য, কী বলেন সেটা জানার জন্য। একটা জিনিস চারজনের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য, সঙ্গে সামাদ ভাইও থাকতেন। একটা জিনিস উচ্চারণ করেছেন, বেশিদিন হয়তো আমাদের জেলখানায় থাকতে হবে না। একদিন উচ্চস্বরে মনসুর আলী সাহেব বললেন, যদি বের হয়ে যাস, তোরা বেঈমানি করবি না তো? প্রতিশোধ নিতে পারবি? আমরা বললাম, ইনশাআল্লাহ। সেই সময়টা তিনি পাননি। আমি জেলখানার কিছু ঘটনা বলবো, কয়দিন বাঁচি জানি না, এগুলো বলা দরকার।
স্মৃতিচারণ করে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, তাজউদ্দীন সাহেব ও মনসুর আলী সাহেব- দুইজন দুইটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন তারা জেলখানায় আমাদের বলেছিলেন, সকালে উঠে তাজউদ্দীন সাহেব হাত কচলাতেন, আর ফুলের গাছ লাগাতেন। আমরা তাদের সহযোগিতা করতাম, মাটি কেটে দিতাম, ইট ছুটে গেলে সরিয়ে নিয়ে যেতাম। স্বপ্ন দেখে তাজউদ্দীন আহমেদ একটু রাগান্বিত স্বরে আমাদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে কালো মারসিডিজ গাড়িতে টান দিয়ে তুলে বললেন, চল টুঙ্গীপাড়া যাইতে হবে। আমি বুঝছি, আমার সময় বেশি নাই আর। আমাকে যখন ডাক দিয়েছেন আমাকেই নিয়েই যাবেন তিনি।’
‘এর ৭-৮ দিন পর একই স্বপ্ন দেখলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। তখন তিনি বললেন, আমাকে আজকে বঙ্গবন্ধু তার মারসিডিজ গাড়িতে বসিয়ে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জনসভা করার জন্য। লক্ষণটা ভালো দেখতেছি না’। এই যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের টান, তারা এই বিভীষিকাময় রাত আসবে, সেটা তারা আগেই টের পেয়েছেন। কামরুজ্জামান সাহেবের খুব দরাজ গলা ছিল। তিনি রাতে তাহাজ্জুতের নামাজ পড়তেন, কোরআন তেলাওয়াত করতেন। আমরা তখন শুয়ে থাকতাম। ওই রাতের বিভীষিকাময় ঘটনা, ভোর রাতে ৪টা-সোয়া ৪টায় জেলখানায় পাগলা ঘণ্টা বাজলো। পাগলা ঘন্টা বাজলে হয় কোন কয়েদি পালিয়েছে, নয়তো কোন অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র জেলখানায় ঢুকেছে, সেটা উদ্ধার করার জন্য পাগলা ঘন্টা দেয়। সেটা এক থেকে দেড় মিনিট থাকে। কিন্তু ওই আওয়াজটা মিনিটের পর মিনিট বাজতেই আছে। সারা জেলখানায় একই বিভীষিকাময় অবস্থা। কোন আওয়াজ নেই। আমরা উঠে যার যার বিছানায় বসে রয়েছি। হঠাৎ বারান্দার লাইট অফ হলো। সুবেধার আর কিছু লোকের বুটের আওয়াজ পেলাম, ধাপ ধাপ শব্দে জেলে ঢুকতেছে। কিন্তু দেখতে পাই না আমরা। ছায়া দেখতে পাই। দেখি হাঁটা-চলা করতেছে। আমরা জানালার কিনারে বসে আছি, কামরুজ্জামান সাহেব নামাজের জায়নামাজে বসে আছেন, তসবিহ জপতেছেন। তারা এসে ১ নম্বর রুম খুললেন। সুবেদার দুইজনকে বললো, তাজউদ্দীন ও নজরুল সাহেব আপনারা রুমে থাকেন। ওই সুবেদোরের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তাই বঙ্গবন্ধু তাকে পদোন্নতি দিয়ে সুবেদার বানিয়েছেন। তিনি জেলখানায় ছিলেন। ওই সুবেদার বললেন, আর বাকি যারা আছেন তারা আসেন তারা আমার সাথে বেরিয়ে আসেন।’ বলেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
তিনি আরও বলেন, ‘তাজউদ্দীন সাহেব বোধ হয় বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা হচ্ছে। তিনিও তখন বেরিয়ে গেছিলেন। তিনি যখন আমাদের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন তখন সুবেদার তাকে ধরে ফেলল, বললো- আপনি না। আপনি রুমে গিয়ে বসেন। তখন সুবেদার শুধু বলল ‘আর্মি’। ৩ নম্বর রুম খুলে মনসুর আলীকে বের করে ১ নম্বর রুমে কামরুজ্জামানসহ ৪ জন পাশাপাশি বসতেই ৫-৬ সেকেন্ড পরেই ব্যাপক ব্রাশ ফায়ার। ফায়ার করার ২-৩ সেকেন্ড পর দৌড়ে চলে যায় তারা। এর ৭-৮ মিনিট পর গোঙানির শব্দ, পানি চাচ্ছে, কারা গোঙাচ্ছিলেন বুঝতে পারছি না। রুমের ভেতরে না বাইরে তা বুঝতে পারছি না। এক মিয়া সাব (কারারক্ষি) আইসা দেখেন একজন লোক মরে নাই, উনি ছিলেন মনসুর আলী সাহেব। উনি ডিগবাজি মারলেন। উনার বুকে লাগেনি। পা গুলিতে ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে, গোঙাচ্ছিলেন। ১৫ মিনিট পর আর্মিরা ১ নম্বর রুমে ঢুকে যায়। তারা শলা পরামর্শ করে আবার গুলি চালায়। তিনজন তো আগেই মারা গিয়েছিল, শুধু মনসুর আলী সাহেব বেঁচে ছিলেন, মৃত ও জীবিত চারজনকেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ১২ থেকে ১৬টি বেয়নেট চার্জ করেছে। এইভাবে জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। উদ্দেশ্যে একটাই বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এই জাতীয় চার নেতা দেশ স্বাধীনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা যদি বেঁচে থাকে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার তারা করবে, বদলা নেবে। এবং এই দেশকে তারা যেভাবে পাকিস্তান বানাতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।’
মায়া বলেন, একাত্তরের ঘাতক, পঁচাত্তরের ঘাতক, ৩ নভেম্বরের ঘাতক, ১৫ আগস্টের ঘাতকরা একই সূত্রে গাঁথা। এই পেতাত্মা এখনো শেষ হয়নি, এখনো ঘুরে। আমরা অনেকে বলি, শেখ হাসিনার কিছু হলে, হবে কেন? এই আগেই তাদের শেষ করতে হবে। সুযোগ দেওয়া যাবে না। সুযোগ দেওয়া হবে না। হওয়ার পরে না এখন থেকে চিহ্নিত করতে হবে, কারা সেই শত্রু। কারা আমার পিতাকে হত্যা করেছে। কারা জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করেছে। কারা ২১ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। সেই চিহ্নিত শত্রুকে বারবার ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আর বিচারের দাবি আমরা করতে চাই না। এদেরকে চিরতরে শেষ করতে হবে।
‘তাই চলুন আজকে শপথ নিই, এই হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, তবে এর পেছনে যারা নেপথ্যে ছিল, কলকাঠি নেড়েছে, পরিকল্পনা করেছে, তাদের এখনো ধরা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করবো, এদের খুঁজে বের করেন। এরাই আসল জাত শত্রু। এরা এখনো বেঁচে আছে। এখনো ষড়যন্ত্র করে। এদেরকে বাংলাদেশে চিরতরে নির্মূল না করা পর্যন্ত এরা বারবার ছোবল দেওয়ার চেষ্টা করবে। মনে রাখবেন, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।’ বলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
