মেয়র নয়, এমপি হতে চেয়েছিলেন মনজুর আলম

চট্টগ্রাম : জীবনে এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এজন্য মাঠ-ঘাট চষে বেড়িয়েছিলেন টানা ১৭ বছর ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে। জনকল্যাণমুখী নানা কর্মসূচি ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে অবিভক্ত চট্টগ্রাম-৮ আসনের ১৮টি ওয়ার্ডেই গড়ে তুলেছিলেন সংযোগ, নেটওয়ার্ক।

কিন্তু এমপি হওয়ার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার। তবে এর চেয়েও পেয়েছেন বেশি কিছু। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ৫ বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তার আর আক্ষেপ নেই। জীবনে যা পেয়েছেন তাতেই তৃপ্ত, ঋদ্ধ।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) একুশে পত্রিকার সাথে অনির্ধারিত এক আলোচনায় জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে এসব কথা বলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মনজুর আলম।

মনজুর আলম বলেন, জীবনে ৭টি নির্বাচন করেছি। জীবনের প্রথম নির্বাচনটি ছিল খেলাচ্ছলে প্রতীকী নির্বাচন। ১৯৬০-৬১ সালের কথা। সেসময় দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র আমি। ওয়ার্ড মেম্বার পদে নির্বাচন করে পরপর দুবার জিতেছিলেন আমার প্রয়াত বাবা আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টর। প্রয়াত ইসহাক মিয়াও (পরবর্তীতে জাতীয় পরিষদ সদস্য) আমার বাবার সাথে মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন সেসময়।

তখন আমার বাবা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত মেম্বার। রাজনীতি ও ভোটের কল্যাণে সবসময় সরগরম, উৎসবমুখর থাকতো আমাদের বাড়ি। খেলাচ্ছলে নির্বাচন ছিল সেই উৎসবেরই অংশ। ১০-১৫ জন খেলার সাথী মিলে ‘মেম্বার’ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। সেই নির্বাচনে আমরা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। কাগজ দিয়ে ব্যালট পেপার তৈরি,  গুঁড়োদুধের বড় কৌটা দিয়ে ব্যালট বাক্স তৈরি এক উচ্ছ্বল-উজ্জ্বল মাদকতা সেই ভোট ভোট খেলায়।

ভোট গণনা শেষে দেখা গেলো, আমিই জিতেছি প্রায় সবকটি ভোট পেয়ে। হয়ে গেলাম শিশু মেম্বার। মেম্বার কী জিনিস তখন না বুঝলেও বাবাকে দেখে এটুকু বুঝতাম, মেম্বাররা মানুষের জন্য কাজ করেন, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ান। এই যে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে বোধ, সে বোধে দাঁড়িয়ে পথ চলেছি আশৈশব। সেই পথ-পরিক্রমায় ১৯৯৪ সালে ৪০ বছর বয়সে উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হই। ২০০০, ২০০৫ সালেও এলাকাবাসী আমাকে ব্যাপক ব্যবধানে কমিশনার নির্বাচিত করে। একটি ওয়ার্ডের কমিশনার হলেও সেবা-জনকল্যাণের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলাম পুরো নগরে। বিশেষত চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসনের ১৮ টি ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি ঘরের মানুুষের সাথে নিবিড় সেতুবন্ধন রচনা করেছিলাম।

প্রায় দুইবছর ভারপ্রাপ্ত মেয়র থাকাকালে নগরবাসীর যথাসাধ্য সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। তখনও ভাবিনি আমাকে মেয়র নির্বাচন করতে হবে কিংবা আমি মেয়র হবো। মূলত আমার ঝোঁক ছিল এমপির দিকে। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে আমাকে মেয়র নির্বাচনই করতে হলো। চট্টগ্রামের মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত করলেন।-বলেন মনজুর আলম।

এম মনজুর আলম বলেন, ছোটকাল থেকেই শিক্ষা ছিল- জীবনে এমন কোনও কাজ করবো না, যেন আমার গর্ভধারিণী মাকে গাল শুনতে হয়। ১৭ বছর কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত মেয়র, ৫ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে সেই বিষয়টিকেই প্রতিপাদ্য করে যাবতীয় কর্মসম্পাদন করেছি। জনগণের দেওয়া দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি।

‘এখনো সময়, সক্ষমতা সবই আছে। ভাগ্যে থাকলে সামনে এমপি তো হয়েই যেতে পারেন’-এমন প্রশ্নে ৬৮ বছর বয়েসী মনজুর আলম বলেন, ‘সেই বয়স কি আছে? চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। জীবনে সম্মান-মর্যাদা, মানুষের ভালোবাসা তো কম পাইনি! তাছাড়া এমপি তো আমার ঘরেই আছে। আমার ভাতিজা দিদার দুদুবার সরকার দলীয় এমপি। দেশের মেধাবী নেতৃত্বের হাত ধরে মানুষ ভালো থাকুক, দেশ আরও এগিয়ে যাক, এই মুহূর্তে সেটাই আমার বড় চাওয়া।

অন্য এক জিজ্ঞাসায় সাবেক মেয়র মনজুর আলম বলেন, মোস্তফা-হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের  এখন ৬৮ টি প্রতিষ্ঠান। সমাজসেবায়, জনকল্যাণে নিবেদিত এসব প্রতিষ্ঠানের কলেবর বাড়িয়ে যদি পারি ১০০টি করবো। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। আমাদের কাছে সেবাই ধর্ম,  সেবাই রাজনীতি, সেবাই তৃপ্তি। তাই সেবার পরিধি কেবল চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাতেই খুঁজে নিতে চেয়েছি জীবন-জন্মের অপার সুখ, পরম স্বার্থকতা।- যোগ করেন মনজুর আলম।

তিনি বলেন, মানবসেবা, জনকল্যাণকে আমরা কখনো ভোটকেন্দ্রিক কিংবা স্বার্থকেন্দ্রিক বৃত্তে আবদ্ধ রাখতে চাইনি। তাইতো পত্রিকায় খাগড়াছড়ির দিঘিনালার দুর্গম এলাকায় স্কুলে আসা-যাওয়াতে শিশুদের সকাল-সন্ধ্যা কেটে যাওয়ার সংবাদ দেখে আমরা ছুটে গিয়েছি স্কুল করতে। ১ম থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলটি পরিচালনা হয় মোস্তফা হাকিম ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে। নিজ এলাকা ছাড়াও স্কুল-কলেজ গড়ে তুলেছি সীতাকুণ্ডে। মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছি চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, বগুড়া, গাইবান্ধায়।