
হোসাইন সাজ্জাত : চট্টগ্রাম থেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পাওয়া নেতাদের যেন ‘সংবর্ধনা-বাতিক’ পেয়ে বসেছে! সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে সংবর্ধনা গ্রহণের যে হিড়িক, তাতে মনে হচ্ছে সংবর্ধনা প্রাপ্তির জন্যই যুবলীগের পদ!
ইতোমধ্যে তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মীর মহিউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু মুনির মো. শহীদুল হক রাসেল, যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ বদিউল আলম চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে পর পর ঘটা করে সংবর্ধনা নিয়েছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল, কালারফুল ছিল বদিউল আলমের সংবর্ধনা। তিনি বিমানে এসে হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে খোলা জিপে চড়ে রেলস্টেশনের সংবর্ধনাস্থলে হাজির হন। যুবলীগের নবনিযুক্ত প্রেসিডিয়াম সদস্য আলোচিত সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকেও নিয়ে এসেছিলেন সেই সংবর্ধনায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংবর্ধনাগুলোর একেকটিতে ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ, মহানগর যুবলীগের আয়োজনে সংবর্ধনার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় ব্যয়ভার সংবর্ধনা গ্রহীতার। সে হিসেবে যিনি সংবর্ধনা নিবেন পোস্টার-লিফলেট ছাপা, সাঁটানো, বাসে-ট্রাকে করে লোকসমাগম থেকে শুরু করে সকল খরচ সংবর্ধনা গ্রহণে ইচ্ছুক নেতাই বহন করে থাকেন। অর্থাৎ যার যত টাকার জোর, তিনিই ‘কালারফুল’ সংবর্ধনা গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, যার অর্থ-সামর্থ নেই তিনি তাহলে কী করবেন? তিনি যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হয়েছেন, তারও তো সংবর্ধনা পেতে, নিতে মন চায়। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসা এমনই একজন; লোকবল, অর্থ, পেশিশক্তি কিছু না থাকা সত্ত্বেও অন্য একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে গলায় ফুলের মালা পরে সংবর্ধনার ‘স্বাদ’ নিয়েছেন।
জানা যায়, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির গতবারের সদস্য চট্টগ্রামের লোহাগড়ার সন্তান কায়কোবাদ ওসমানী এবারের কমিটিতেও সদস্য পদে ঠাঁই পেয়েছেন। পেশায় তিনি ব্যাংকার। বর্তমানে তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংক কাকরাইল শাখার ম্যানেজার। চাকরিজীবী হওয়ায় ইচ্ছা করলেও যখন-তখন চট্টগ্রাম আসতে পারেন না।
চট্টগ্রামে যুবলীগ নেতাদের সংবর্ধনার হিড়িক দেখে গত শুক্রবার সকালে তিনিও চট্টগ্রাম আসেন স্বজন-শুভার্থীদের জানিয়ে। বিমানযোগে ওইদিন সকালে চট্টগ্রাম স্পর্শ করেন কায়কোবাদ। ভেবেছিলেন শুভার্থীরা সেখানে অপেক্ষায় থাকবেন। কিন্তু না, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করেননি সেখানে, একটি ফুলও নিয়ে যাননি কেউ। কারণ অন্যদের মতো অর্থায়ন করে সংবর্ধনার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে।
এই অবস্থায় মন খারাপ করে রাতে জামালখান সিকদার হোটেলে বসে এক বন্ধুর সাথে গল্পগুলো করছিলেন কায়কোবাদ। এসময় ইন্সপায়ার চট্টগ্রাম-এর পরিচালক শাহাদাত নবী খোকা ফোন দেন কায়কোবাদকে। সিকদার হোটেলে অবস্থান জেনে ইন্সপায়ার চট্টগ্রাম-এর চেয়ারম্যান সাবেক ছাত্রনেতা মো. সাজ্জাত হোসেনসহ সিকদার হোটেলে যান। মন খারাপ করে সংবর্ধনার প্রসঙ্গ উঠতেই সাজ্জাত হাত বাড়িয়ে দেন। বলেন-কেউ সংবর্ধনা জানায়নি তাতে কী। আপনি চাইলে কালই আপনাকে সংবর্ধিত, সম্মানিত করার ব্যবস্থা করতে পারি।

কীভাবে? কায়কোবাদ ওসমানীর প্রশ্নে সাজ্জাত জানালেন, আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে তিনমাসব্যাপী সার্ভাইবাল আর্ট বা আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ কর্মশালা চলছে চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। কাল (শনিবার) সকাল ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত চলবে ২৫০ জন নারী-শিশুর প্রশিক্ষণ। তাদের মাধ্যমে আপনাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হবে। খুশিতে আপ্লুত কায়কোবাদ পকেট থেকে সাথে সাথে ৩ হাজার টাকা বের করে দিয়ে বললেন, প্লিজ পুষ্পস্তবক আর প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কিছু নাশতা কিনে নিবেন।
পরদিন যথারীতি তাই হলো। আয়োজকরা ৭শ’ টাকায় দুটি পুষ্পস্তবক কিনে বাকি ২৩ শ’ টাকার সাথে আরও কিছু টাকা যোগ করে ২৫০টি চিপস কিনে নিয়ে যান। আয়োজকরা প্রশিক্ষণার্থীদের বললেন, তিনি (কায়কোবাদ) আমাদের সংগঠনের উপদেষ্টা হয়েছেন, উনাকে একটু ফুল দিয়ে বরণ করে নিতে হবে। ব্যাস, জনা দশেক প্রশিক্ষণার্থী এগিয়ে এসে ফুল দিয়ে বরণ করে নিলেন ইন্সপায়ার চটগ্রাম-এর কথিত উপদেষ্টা ও যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নবনিযুক্ত সদস্য কায়কোবাদ ওসমানীকে।
এসময় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ফুলের দুটি মালা এগিয়ে দিয়ে কায়কোবাদ বললেন তার গলায় পরিয়ে দিতে। ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন শিশু-প্রশিক্ষণার্থীরা। আয়োজকদের অনুরোধে এসময় সমস্বরে করতালি দিলেন সকল প্রশিক্ষণার্থী। জানা যায়, এই দৃশ্য নিজের ফেসবুকে লাইভ দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন যুবলীগ নেতা কায়কোবাদ ওসমানী। আর সেই তৃপ্তি বা ‘সংবর্ধনার স্বাদ’ সঙ্গী করে রোববার সকালে বিমানে চট্টগ্রাম ছাড়েন কায়কোবাদ।
এ প্রসঙ্গে সাজ্জাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে অর্থের বিনিময়ে সংবর্ধনার স্রোতে উনার গা না ভাসানোর বিষয়টা। সাম্প্রতিক সংবর্ধনা সংস্কৃতি নিয়ে উনার আক্ষেপ এবং কষ্ট দেখে ইন্সপায়ার চট্টগ্রাম পরিবারের পক্ষ থেকে যুবলীগ সদস্য কায়কোবাদ ওসমানীকে ছোট্ট পরিসরে সংবর্ধিত ও সম্মানিত করার চেষ্টা করেছি। এতে তিনি খুশি হয়েছেন, আমাদেরও ভালো লেগেছে।
এই উপায়ে সংবর্ধনা গ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কায়কোবাদ ওসমানী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই বিষয়টি সত্য নয়। যেহেতু আমি ইনস্পায়ার চট্টগ্রাম-এর একজন উপদেষ্টা সেই সুবাদে আমি এই কোমলমতি মেয়েদের দেখতে গিয়েছিলাম। রাজনৈতিক কোনো সংবর্ধনা সেটা ছিল না। সেখানে তারা আমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি সংগঠনের পদ পেয়েছি তার মানে এই নয় যে, আমাকে সংবর্ধনা দিতে হবে। আমি তখনই সংবর্ধনার আশা করতে পারবো যখন আমি মানুষের জন্য কিছু করতে পারবো। পদ পেলেই কি সংবর্ধনা নিতে হবে? আমি রাজনীতি করি ভালোবাসার জায়গা থেকে, পদ ব্যবহার করে ফায়দা লুটার জন্য নয়। আর এই করোনাকালে হাজার হাজার নেতাকর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলে আমি সংবর্ধনা নেওয়ার পক্ষে নই।’
