
নুরুল আবছার : একসময়ে কৃষ্ণখাল দিয়ে চাকতাই থেকে নৌকাযোগে মালামাল আনা-নেওয়া করতো এলাকাবাসী। কৃষিক্ষেত বাঁচাতে কৃষকরাও পানি সরবাহ করতো সেখান থেকে। মাছেরও কিছু চাহিদাও পূরণ হতো এ খালের মাছ দিয়ে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই খাল এখন মরাখালে পরিণত হয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর মদুনাঘাট অংশ থেকে মোহরা-হাটহাজারী হয়ে উত্তর মোহরা ছায়াচর পর্যন্ত বিস্তৃত, প্রবাহমান এ কৃষ্ণখাল সংস্কারহীনতা, কালপাড়ে অবৈধ দখলের মাধ্যমে বসতঘর নির্মাণসহ খালটি৷ বর্তমান নানা সমস্যায় জর্জরিত।
মঙ্গলবার (১ডিসেম্বর) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, খালের দু’পাশ ধরে গড়ে উঠা একাধিক ভবনের দেওয়াল খালের একপাশের উপর ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া অপর অংশেও দেখা গেছে বিভিন্ন জাতের সবুজ ঘাসের সমারোহ।
ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সামান্য বৃষ্টিতেও অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হচ্ছে স্থানীয় লোকজনের।
কৃষ্ণখাল ছাড়াও মোহরা ওয়ার্ডের উত্তরাংশ ও দক্ষিণাংশে সানাইয়া খাল, বামনশাহী খাল, বালুখালী খালসহ তিনটি প্রধান খাল রয়েছে। সবগুলোতে কমবেশি একই চিত্র দেখা গেছে। বিশেষত কৃষ্ণ খাল বর্তমানে অবৈধ স্থাপনাসহ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে আছে। মৌজা ম্যাপের আলোকে এবং বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্থ ও গভীরতা নিরূপণে এ খালে প্রয়োজনীয় খনন, দখলমুক্তকরণ এবং পুনর্দখল ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
পূর্ব মোহরার গোলাপের দোকান এলাকায় ব্রিজের নিচে অপরিকল্পিতভাবে দুইটি গ্যাস সঞ্চালন পাইপ স্থাপনের কারণে পানিতে ভেসে আসা ময়লা আটকে যাচ্ছে পাইপে। ফলে আবর্জনা আটকে যাওয়ায় ব্রিজের একপাশ পরিণত হয়েছে ময়লার বিশাল স্তুপে।
সরেজমিন আরও দেখা যায়, জোয়ার শেষ হয়ে গেলেও দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত ফুলে-ফেঁপে থাকে এ খালের পানি। আগেকার সময় জোয়ার শেষ হলে পানি হাঁটুর নিচে নেমে আসতো বলে জানায় এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা।
৫ হাজার ৬শ’ ১৬ কোটি ৪৯ লক্ষ ৯০ হাজার টাকায় ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করেছিলো চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৮ সালে গৃহীত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে কৃষ্ণখালের কিছু অংশে বেড়ে উঠা ঘাস ও ময়লা পরিষ্কার করা হয়। খালের পুনঃখনন বা সম্প্রসারণ থেকে যায় অধরা। ফলে বর্ষা মওসুম বা সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটু পরিমাণ পানিতে ভরে যায় খালের আশপাশ।
মো. শাহজাহান নামের স্থানীয় একজন বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে জানান, যখন পুরাতন ব্রিজ ছিলো, তখন গ্যাস সঞ্চালন পাইপ উপরে থাকায় নৌকা আসা-যাওয়া করতো, বাঁশের চালি আসতো, তখন খাল পরিস্কার ছিলো। মানুষজন মাছ শিকার করতো। পরবর্তীতে নতুন ব্রিজ করার সময় গ্যাস সঞ্চালন পাইপ আগের মতো উঁচু করে দেওয়া হয়নি বিধায় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিজের অপরপাশে ওয়াসার নতুন পাইপ দেওয়া হলেও পুরাতন পাইপটি সরানো হয়নি। উঁচু করে দিলে খালের এই পরিণতি হতো না বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. জসিম বলেন, অক্সিজেন এলাকা থেকে অনন্যা আবাসিক হয়ে কলকারখানার বর্জ আসে এই খালে। বর্জমিশ্রিত পানির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। নাক চেপে ধরে হাঁটাচলা করতে হয়। এসময় প্রথমত অতিদ্রুত ব্রিজ সংষ্কার আর দ্বিতীয়ত খাল খননের ব্যবস্থা না করলে এ সমস্যা সমাধান হবে না বলেও জানান তিনি।
এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জলাশয়-জলাধার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক অ্যাডভোকেট রেহেনা বেগম রানু বলেন, আমরা যেমন মানুষের চেহারায় এসিড ছুঁড়ে দগ্ধ করার পর যখন চেহারার অবয়ব আগের মতো থাকে না খালের মধ্যে বিল্ডিং হলো সেই রকম; তার চেহারাটা আর থাকে না, নষ্ট হয়ে যায়। এসিড দিয়ে একটা মানুষকে বার্ণ করা হয় আর খাল দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করাটা এসিড ছুড়ে মারার চেয়েও ভয়ঙ্কর অপরাধ।
খালের উপর এধরণের অমানবিক অত্যাচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খাল-নদী ) যখন মানুষ দখল করে বিল্ডিং বা ব্যবসাবাণিজ্য করে যারা খালের মৃত্যু ঘটায় তাদের মৃত্যদণ্ড হওয়া উচিত, ফাঁসিতে ঝুলানো উচিত। কারণ একজন মানুষ যখন আরেকজনকে হত্যা করে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। এখন ধর্ষণের জন্যও মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। খাল-নদী হত্যা করা মানে লক্ষ কোটি মানুষকে হত্যা করা। যারা লক্ষকোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিলি খেলে তাদেরকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।

কৃষ্ণখালের বেহাল দশায় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নগরীর বেশিরভাগ ব্রিজেই ওয়াসা আর গ্যাসের পাইপগুলাতে ময়লা আটকে যাওয়ায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। খাল পরিষ্কারের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে তা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দেব আমরা। কলকারখার বর্জমিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসার বিষয়টি আমরা মনিটরিং করছি। এজন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করবো।’
এই প্রসঙ্গে সিডিএ’র প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া মিডিয়ায় কথা বলা নিষেধ আছে বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণখালের অবৈধ দখলপূর্বক ভবন নির্মান,পুনর্দখল ও সংস্কারহীনতা সম্পর্কে জানার জন্য সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষকে ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরবর্তীতে বারবার ফোন করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
