
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত ও জসিম উদ্দিন : পরিবেশ আইন অনুযায়ী শামুক-ঝিনুক আহরণ ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা— অবাধে শামুক-ঝিনুক আহরণ ও বিক্রি চলছেই।
কক্সবাজারের সাগর তীরে গড়ে উঠা ঝিনুক মার্কেটের দোকানিরা বিক্রয় নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুকের অলংকার ও পণ্য সামগ্রীর রমরমা বাণিজ্য করছেন। আর দোকানে এসব শামুক-ঝিনুক বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে খোদ জেলা প্রশাসন!
দোকানিদের মতে, সাগরে সারা বছরই শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়। তবে শীত মৌসুমে এবং সাগর উত্তাল থাকলে বড় ও মূল্যবান শামুক-ঝিনুক বেশি মেলে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতে শামুক-ঝিনুকের সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে কয়েকগুণ, তাই এই সময়ে আহরণ, বিক্রিও হয় বেশি।
যদিও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর তফসিল-২ এর ৬ ধারায় প্রবালের ৩২টি ও শামুক-ঝিনুকের ১৩৭টি প্রজাতিকে শিকার ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনকে আমলে নিচ্ছেন না ব্যবসায়ী, প্রশাসন কেউই।
অভিযোগ আছে, খোদ প্রশাসনই এ অবৈধ কর্মকাণ্ডকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বৈধতা দিয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন ও প্রটোকল শাখার পক্ষ থেকে শতশত দোকানিকে এ সকল শামুক-ঝিনুক, শৈবাল ও প্রবাল বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়ার সুবাধে এসব ঝিনুক বিক্রির দোকানের অনুমোদন দিয়ে আসছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক।
জানা যায়, কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে ২৬৪টি এবং লাবণী পয়েন্টে ২০২টি ঝিনুকের দোকানের ‘অনুমোদন কার্ড’ ইস্যু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন ও প্রটোকল শাখা। এই পরিসংখ্যানের বাইরে আরও শতাধিক দোকান রয়েছে যেখানে অনুমোদন কার্ড ছাড়াই বিক্রি করা হচ্ছে শামুক-ঝিনুক।
পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের আইন বহির্ভূত এ কর্মকাণ্ড বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
যদিও নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক আহরণসহ নানা কারণে কক্সবাজার, সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত বিপর্যয় হওয়ায় ২০০৫ সালে এলাকাগুলোকে পরিবেশ আইনে ‘পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করেই হাত গুটিয়ে বসে আছে পরিবেশ অধিদপ্তর। শামুক-ঝিনুকের সামগ্রী তৈরি এবং বিক্রির জন্য নির্বিচারে আহরণের কারণে সৈকত থেকে শামুক-ঝিনুকের প্রায় ৮০ শতাংশ আবাসস্থল হারিয়ে গেছে।

পরিবেশবাদী সেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্যা ন্যাচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ.ন.ম.মোয়াজ্জেম হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে শতশত দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুক, শৈবাল ও প্রবাল। বেশিরভাগ দোকানি গভীর সমুদ্র ও মাটির নিচ থেকে জীবন্ত অবস্থায় এসব তুলে এনে বিক্রি করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এসব দেখার পরও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে না এসে উল্টো এসব বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। সৈকতে শৈবাল, প্রবাল ও শামুক-ঝিনুক হত্যা করে বিক্রির লাইসেন্স দেয়া কি আইন লঙ্ঘন নয়?’ অবিলম্বে এসব ঝিনুক-শামুকের দোকান বন্ধ ও লাইসেন্স বাতিল করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাউসার আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যেখানে পরিবেশ আইনে শামুক-ঝিনুক ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ সেখানে জেলা প্রশাসন কোন যুক্তিতে এসব বিক্রির জন্য দোকানের অনুমোদন দিলো তা আমি বুঝতে পারছি না। আমরা শুধু এসব প্রাণী ধরাকেই অপরাধ মনে করি। কিন্তু এসব যে বিক্রির উদ্দেশ্যে ধরা হচ্ছে এবং প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে সেটা কারো নজরে আসছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সমুদ্র ও উপকূল রক্ষা করতে চাইলে এসব রক্ষায় আমাদের সবার একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। নয়তো বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত অচিরেই হারিয়ে যাবে।’
এদিকে, কক্সবাজার ঝিনুক মার্কেটের দোকানি মো. দুলাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিক্রি করা বেশিরভাগ শামুক-ঝিনুকই আমরা বাইরের দেশ থেকে আমদানি করে থাকি। বর্তমানে জীবন্ত শামুক-ঝিনুক কম পাওয়া গেলেও সমুদ্র থেকে যে এসব ধরা হচ্ছে এবং সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে তা অস্বীকার করা যাবে না।’ প্রশাসনের দেয়া অনুমতি বা লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছু বলতে রাজী হননি এই দোকানি।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলার উপ-পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিক্রি নিষিদ্ধ এসব বণ্যপ্রাণী বিক্রির অনুমোদন দেয়ার কথা নয়। কোন যুক্তিতে বা কিসের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন এই অনুমোদন দিয়েছে সেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। তবে কেন অনুমতি দিয়েছে সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি আসলেই দোকানিরা এসব শামুক-ঝিনুক ধরে এনে বিক্রি করে থাকে তাহলে অবশ্যই তারা আইনের আওতায় আসবে। কক্সবাজারবাসীর প্রতি অনুরোধ থাকবে এধরনের কোনো ঘটনার তথ্য থাকলে সাথে সাথে যেন আমাদের জানানো হয়।’

এ বিষয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল ফোরকান আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শুধু ঝিনুক শামুকের দোকান নয়, কক্সবাজার সৈকতের সব দোকান অবৈধ। জেলা প্রশাসন কোন আইনে এসব দোকানের বৈধতার লাইসেন্স দিয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘গরীবদের নাম দিয়ে সেখানে কাদেরকে এসব দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, সে খবর অজানা নয়। এখন যদি আমি হুট করে তাদের এসব স্থাপানা উচ্ছেদ করতে উচ্ছেদ যাই, তাহলে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হতে পারে। তবে আমি এসব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য ধীরে ধীরে এগুচ্ছি। সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা একদিন আমি উচ্ছেদ করবই।’
এদিকে শামুক-ঝিনুক বিক্রির অনুমোদন দেয়ার কথা একুশে পত্রিকার কাছে স্বীকার করেছেন কক্সবাজার পর্যটন ও প্রটোকল শাখার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সৈকতের ৫ শতাধিক ঝিনুক-শামুকের দোকানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব দোকান থেকে বাৎসরিক ফি আদায় করা হয়। লাবনী পয়েন্ট ও কলাতলীর দোকানগুলো থেকে ৮ হাজার টাকা আর সুগন্ধ্যা পয়েন্ট থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করা হয়।’
পরিবেশ আইনে নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক বিক্রির বৈধতা কক্সবাজার জেলা প্রশাসন দিতে পারে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে বিভিন্ন ব্যক্তির আবদার এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল দোকানিদের আবেদনের ভিত্তিতেই এসব শামুক-ঝিনুক বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে।’
এদিকে, নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক বিক্রির দোকান পরিচালনার অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে জানতে সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেনের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। বক্তব্য জানার বিষয়টি উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও জেলা প্রশাসক সাড়া দেননি।
