
নুরুল আবছার : বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিম। এলাকার সবাই জানেন সম্মুখসমরে জীবনবাজি রেখে তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা। যুদ্ধদিনের গল্প বলতে গিয়ে এখনো চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তাঁর।
কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি মো. আজিমের। সনদ হারিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছেন তিনি। ফলে বঞ্চিত হয়েছেন রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান থেকেও।
বর্তমানে অন্যের জমিতে চাষ ও দিনমজুরি করে সংসার চালান এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। আর্থিক টানাপোড়েনে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারেননি। তাতেও তার দুঃখ নেই তাঁর। জীবনের পড়ন্তবেলায় চাওয়ার নেই তেমন কিছু। শুধু চান, মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ‘আনন্দ’। আর সেই ‘আনন্দ’ সঙ্গী করেই মরতে চান তিনি।
এজন্য তথ্যপ্রমাণসহ মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে বছরের পর বছর ঘুরছেন তিনি।
২০১২ সালে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এম এ সামাদ সরকার স্বাক্ষরিত ১৪৫১৭ (খ) নং সনদে আজিমকে মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।’ কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় নথিতে নেই তাঁর নাম।
এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, তালিকাভুক্তি ও যাচাইবাছাই ফরম পূরণ করে আবেদন করেন তিনি। আবেদনটি উপজেলা যাচাইবাছাই কমিটির চেয়ারম্যান, জেলা যাচাইবাছাই কমিটির চেয়ারম্যান, জেলা কমান্ডার বরাবরে পাঠান। এমনকি রাঙ্গুনিয়ার স্থানীয় সাংসদ তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি বরাবরও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু স্বীকৃতিটা মিলছেই না।
‘৭১ এর রণাঙ্গনের যোদ্ধা আজিম একুশে পত্রিকাকে জানান, দীর্ঘ সময় ধরেই মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। চার বছর আগে তিনি পূনরায় আবেদন করেন। কিন্তু সেটি আর পরে যাচাইবাছাই হয়নি। যাচাইবাছাই হলে রাঙ্গুনিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সত্যতা তুলে ধরতেন।
মো. আজিম বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু বুক ফেটে এখন কান্না আসে, যখন দেখি একই সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা অন্যান্য সহযোদ্ধারা আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান-স্বীকৃতি পাচ্ছে। অথচ আমি এ সম্মান থেকে বঞ্চিত।
১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। ১নং সেক্টর কমান্ডার মেজর মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন নুরুল হক। ভারতের দেমাগ্রীতে আশোক মিত্র কারবারির অধীনে এক মাস ১৫ দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণকালে তাঁর সাথে ছিলেন নিজ এলাকা সরফভাটার মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম, মুক্তিযোদ্ধা হাজী আব্দুর রশিদ, মুক্তিযোদ্ধা নজু মিয়াসহ অনেকে।
তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজ এলাকার সহযোদ্ধা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আজিম, মুক্তিযোদ্ধা আহমদ মিঞা, মুক্তিযোদ্ধা মরহুম হাছান আহমদ। যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর চন্দ্রঘোনা কেপিএম ক্যাম্পে আশোক মিত্র কারবারির কাছে রাইফেল জমা দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজিমের যুদ্ধদিনের সহযোদ্ধা উপজেলার শিলক ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আজিম আমাদের সাথেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। ভারতে প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। সনদ হারিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সাংসদ ড. হাছান মাহমুদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরও আবেদন করেন। কিন্তু কোন গতি হয়নি। এই বয়সে এসে দিনমজুরি করে সংসার চালান তিনি, যা দেখতে খুব খারাপ দেখায়।’
এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদুর রহমান বলেন একুশে পত্রিকাকে বলেন,‘যদি সনদ হারিয়ে যায় সেক্ষেত্রে উনার গেজেট নাম্বার বা লাল মুক্তিবার্তায় নাম্বার থাকলে তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বা উপজেলায় আবেদন করতে পারেন। তখন আমরা বিষয়টি যাচাইবাছাই করে দেখব।
ইউএনও বলেন, ‘সনদ হারিয়ে গেলেও উনার গেজেট নাম্বার বা লাল মুক্তিবার্তা নাম্বার থাকার কথা। যদি গেজেট নাম্বার না জানেন তাহলে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে অথবা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে সেটা যাচাই করে নিতে হবে। আর উনি চাইলে আমার সাথে কাগজপত্র নিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন সেক্ষেত্রে আমার কোনো করণীয় থাকলে সেটা আমি দেখব। আমার করণীয় কিছু না থাকলেও উনার কাগজপত্র দেখে কোথায় যাবেন, কী করবেন সেই বিষয়ে অন্তর গাইডলাইন দিতে পারব।’
সরেজমিনে সরফভাটা ইউনিয়নের মীরেরখীল গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মো. আজিম একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছেন। কিন্তু এমন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কেন স্বীকৃতি দিল না সরকার-তা খুব দুঃখজনক।
মো. আজিমের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের মীরেরখীল গ্রামে। তাঁর দুই ছেলে দুই মেয়ে রয়েছে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলেও বিয়েতে খরচ করা সেই ঋণের বোঝা এখনও কাঁধে চড়ে আছে আজিমের। বর্তমান দুই ছেলেসহ মোট চার সদস্যের পরিবার মো. আজিমের।
