‘নাম-ছাড়পত্র’ জটিলতায় আটকে আছে নাভানার মানবিক উদ্যোগ!


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : ফিল্ড হাসপাতালের সফলতায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলাসহ দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবদান রাখতে সহসা একটি ইউনিক হাসপাতাল গড়ার ঘোষণা দিয়েছিল নাভানা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ‘নাম-ছাড়পত্র’ সংক্রান্ত জটিলতায় থমকে আছে নাভানা গ্রুপের এই মানবিক উদ্যোগ।

অবশ্য বিপত্তিটা বাঁধিয়েছে খোদ নাভানা গ্রুপই। তারা চাইছে হাসপাতালটি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যের নামে করতে। কিন্তু এই পরিবারটির কোনো সদস্যের নামে করতে হলে নাম ছাড়পত্র ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারি কিছু নিয়মকানুন ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর সেই বাধ্যবাধকতা ও আনুষ্ঠানিকতার গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে উদ্যোগটি।

আর এক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নাভানা গ্রুপের ইচ্ছা ও উদ্যোগ নিয়ে। সচেতন মহল বলছে, জাতির করুণ পরিস্থিতিতে মানবিক দ্যুতি ছড়িয়ে অসুস্থ, অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেয়ে সরকারকে খুশি করাই নাভানা গ্রুপের লক্ষ্য। সেই কারণে চট্টগ্রামবাসীকে আশা জাগিয়েও ইচ্ছে করে ‘নামছাড়পত্র’ জটিলতায় জড়িয়ে হাসপাতাল গড়ার বিষয়টি অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। এটা নাভানা গ্রুপের ‘গিভেন টেক’পলিসি কিংবা একধরনের দুরভিসন্ধি বলেও অনেকেই মত প্রকাশ করেন।

সচেতন মহলের মতে, বঙ্গবন্ধু পরিবারের নামে দেশে অনেক কিছু হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কারণ এই পরিবারটি না হলে বাংলাদেশ নামক স্পর্ধিত ঠিকানার জন্ম হত না। কিন্তু জাতির স্পর্শকাতর, করুণ সময়ে নামের ইচ্ছেপূরণের নামে বিলম্বিত গল্পে মানুষের সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি বিলম্বিত হোক তা নিশ্চয়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার পরিবার চায় না। নামের চেয়ে এই দেশের মানুষের সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এই বিষয়টি নাভানা গ্রুপের বুঝা উচিত।

অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়, শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নামে হাসপাতালের নামকরণ করতে চাইছেন জানিয়ে নাভানা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আরফাদুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হাসপাতাল চালু করতে বিভিন্ন অনুমতির প্রয়োজন, আর আমরা সেই অনুমতির অপেক্ষায় আছি। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো একজন সদস্যের নামে আমরা হাসপাতালটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্টের অনুমতি প্রয়োজন আছে। নামের জন্যও আবেদন করা হয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্ট বন্ধ থাকায় সেই অনুমতির অগ্রগতি হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমতিরও একটা বিষয় আছে। আর একটি কারখানার মাঝখানে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য লেবার অফিসের অনুমতি লাগবে। তবে নাম ঠিক না হলে এসব বিভাগ থেকেও অনুমতি পাওয়া যায় না। এই মুহূর্তে আমরা নামের অনুমতির অপেক্ষায় আছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া সহজ কিন্তু ফিল্ড হাসপাতাল এবং পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের মধ্যে কিন্তু বড় পার্থক্য রয়েছে। আমাদের ইচ্ছা আছে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীতে এই হাসপাতালের উদ্বোধন করার। তবে এসব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমরা আটকে আছি।’

নাভানা গ্রুপের সহকারী ব্যবস্থাপক আফজাল নাজিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা এমন কোনো হাসপাতাল করবো না যেটা করার কয়েকদিন পর মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। সবকিছু গুছিয়ে করার জন্য যদি দুমাস দেরিও হয় এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না। তবে আমরা প্রতিদিনই অনুমোদনের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। পিএমও থেকে আমাদেরকে বলা হচ্ছে ‘গো স্লো’।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নাভানা গ্রুপের হাসপাতালের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে বেশ কয়েকজন যোগাযোগ করেছে। তবে হাসপাতালের কোনো আবেদন আমার কাছে আসেনি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ছাড়াও আরো দুটি মাধ্যমে এই আবেদন করা যায়। হতে পারে তারা সেই মাধ্যমে এগিয়েছে। যার কারণে আমার এই বিষয়ে তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা ডা. বিদ্যুত বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে দেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল করতে এগিয়ে এসেছিল নাভানা গ্রুপ। পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের যে প্রতিশ্রুতি নাভানা গ্রুপ দিয়েছে তা অচিরেই শুরু হবে এই প্রত্যাশাই আমি করছি। যেহেতু করোনার দ্বিতীয় ধাপ চলছে, তাই তাড়াতাড়ি এই হাসপাতালটি নির্মাণ হওয়া উচিত। যত দ্রুত হাসপাতালটি হবে সাধারণ মানুষ তত বেশি উপকৃত হবে।’

এর আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি হাসপাতাল নির্মাণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেদের কারখানার ভবন দিয়ে সহযোগিতার এগিয়ে এসেছিল নাভানা গ্রপ।

মাত্র ২১ দিনে প্রস্তুত হাসপাতালটি দীর্ঘ চার মাস ১০ দিন সেবা দেওয়ার পর গত ৩১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ফিল্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বে রোগীদের ন্যূনতম ও নামমাত্র খরচে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার জন্য অচিরে একটি আনপ্যারালাল সেবার হাসপাতাল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এদিকে, ফিল্ড হাসপাতালের আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত থাকার পাশাপাশি অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে দীর্ঘ চারমাস ধরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি খুবই স্পর্শকাতর হয়। এছাড়া ব্যবহার না থাকার কারণে এসব নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে খুব বেশি।

তাছাড়া বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও সাধারণ মানুষের অনুদানের টাকায় কেনা হয়েছিল এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতির বিশাল একটি অংশ। প্রথমদিকে নাভানা কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের নভেম্বর মাসে হাসপাতালটি চালু করার কথা বলেছিল।

একুশে/জেআইএস/এটি