দুর্নীতির ছোবলে বিধ্বস্ত কর্ণফুলী গ্যাস

শরীফুল রুকন : গ্রাহকদের কাছ থেকে ৭৯৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বেশি পাওনা আছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল)। এই বকেয়া টাকা আদায়ের চেষ্টা দূরে থাক, আরও কোটি কোটি টাকার বিল গোপন ও পাওনা টাকা আদায় সংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, কেজিডিসিএলের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে জালিয়াতি করে একজন সাবেক মন্ত্রীর ছেলের নামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া এবং স্থানান্তরের অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্য দিয়ে পকেট ভারি করছেন কেজিডিসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সর্বশেষ দেশের ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবার শীর্ষে থাকা আবুল খায়ের গ্রুপের ১১ কোটি টাকার বিল গোপন ও এ সংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব করার ঘটনা ঘটেছে কেজিডিসিএলে। যদিও এ ঘটনায় জড়িতদের রক্ষার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন কেজিডিসিএলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১ কোটি টাকার বিল গোপন ও নথি গায়েবের চাঞ্চল্যকর এ তথ্যটি গত বছরের মে মাসের দিকে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল জানতে পারে। এরপর ১০ জুন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভায় সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চান, আবুল খায়ের গ্রুপের পাওনা ১১ কোটি টাকা আদায় ও নথি গায়েবের সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?

তখন কেজিডিসিএল’র তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, আবুল খায়ের গ্রুপকে কয়েকটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। তবে নথি গায়েবের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। পরে সভায় সিনিয়র সচিব সিদ্ধান্ত দেন, আবুল খায়ের গ্রুপের নিকট পাওনা টাকা দ্রুত আদায় করতে হবে। এছাড়া নথি গায়েব ও বিল গোপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এরপর ২৬ জুলাই মাসিক সমন্বয় সভায় খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, বকেয়া পরিশোধের জন্য আবুল খায়ের গ্রুপকে শেষবারের মত একটি তারিখ দেওয়া হয়েছে। উক্ত তারিখে বকেয়া পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। আবুল খায়ের গ্রুপের বিল গোপন ও নথি গায়েবের ঘটনায় পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটি গঠনের পর তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

২৬ আগস্ট পরবর্তী মাসিক সমন্বয় সভায় কেজিডিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের বৈঠক হয়েছে। তিনি কিস্তিতে বিল পরিশোধ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

২৭ সেপ্টেম্বর মাসিক সমন্বয় সভায় খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবেন বলেছেন। সেদিন সভায় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবিএম আবদুল ফাত্তাহ্ জানান, আবুল খায়ের গ্রুপের কাছ থেকে পাওনা আদায় সংক্রান্ত নথি গায়েব ও বিল গোপনের বিষয়ে পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ২৪ সেপ্টেম্বর দাখিল করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি কেজিডিসিএলে পাঠানো হবে। এ সময় তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান।

২৭ অক্টোবর মাসিক সমন্বয় সভায় সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান জানান, আবুল খায়ের গ্রুপের বকেয়া আদায় ও পাওনা আদায় সংক্রান্ত নথি গায়েবের ও বিল গোপনের বিষয়ে কেজিডিসিএল বোর্ড সভায় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে কেজিডিসিএল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তখন বিষয়টি সমন্বয় সভার এজেন্ডা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সবাই একমত পোষণ করেন।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কেজিডিসিএলে বড় প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার বকেয়া বিল নিয়ে নয়-ছয় করার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। বিল গোপন করার এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ আছে। সর্বশেষ আবুল খায়ের গ্রুপের ১১ কোটি টাকার বিল কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনটিও ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে।

আবুল খায়ের গ্রুপের বিলের নথি গায়েবের বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও কোম্পানী সচিব নুরুল আবচার সিকদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তদন্ত এখনো চলছে। এ বিষয়ে প্রশাসন বিভাগ ভালো জানবে। আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।’

নথি গায়েবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ফিরোজ খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে পেট্রোবাংলার নিষেধ আছে।’ যদিও পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলতে তাদের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

এরপরও রহস্যজনক কারণে আবুল খায়ের গ্রুপের কাছ থেকে ১১ কোটি টাকা বকেয়া সংক্রান্ত নথি গায়েব ও বিল গোপনের বিষয়ে কেজিডিসিএল’র কর্মকর্তারা কোনো কথা বলতে চান না। জনসংযোগ, প্রশাসন ও ফিন্যান্স বিভাগের কর্মকর্তারা একজন আরেকজনকে দেখিয়ে দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিষয়টি।

এমনকি এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ২২ ডিসেম্বর সকালে ও বিকেলে দুই দফা কেজিডিসিএলের কার্যালয়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী প্রভঞ্জন বিশ্বাসের সাক্ষাত চেয়েও অনুমতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া ২২ ডিসেম্বর থেকে অসংখ্যবার ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি প্রকৌশলী প্রভঞ্জন বিশ্বাস; কোনো কোনো সময় কল কেটে দিয়েছেন। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ম্যাসেজ পাঠিয়ে নথি গায়েবের সর্বশেষ অবস্থা জানানোর অনুরোধ করা হয়। ম্যাসেজটি ‘সিন’ করলেও জবাব দেননি কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী প্রভঞ্জন বিশ্বাস।

শেষ পর্যন্ত নথি গায়েবের ঘটনা ও বকেয়া বিলের বিষয়ে তথ্য চেয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর তথ্য অধিকার আইনে কেজিডিসিএলের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করা হয় একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে। তবে এ রিপোর্ট প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত জবাব আসেনি।

অন্যদিকে ১১ কোটি টাকা পাওনা সংক্রান্ত নথি গায়েব ও বিল গোপনের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল খায়ের গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সায়েদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কিছু জানার থাকলে আমাদের ম্যানেজার খোরশেদুল আলম ফারুকের (প্রতিষ্ঠানটির হয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যক্তি) সঙ্গে কথা বলুন।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবস্থাপক খোরশেদুল আলম ফারুক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইছেন কেন? আমি তো এখানে একটি চাকরি করি মাত্র। যার নামে বিল হয়েছে, তার কাছে জানতে চান।’ বিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের তথ্য উল্লেখ আছে জানিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের নাম্বার দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়; কিন্তু নাম্বার দিতে রাজী হননি আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মকর্তা খোরশেদুল আলম ফারুক।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে কেজিডিসিএলের হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুন পর্যন্ত হিসেবে কেজিডিসিলের মোট গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ২ হাজার ২৪৫। এর মধ্যে গৃহস্থালী শ্রেণীতে সংযোগ ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫টি। এছাড়া বিদ্যুৎ শ্রেণীতে ৫, সার কারখানা শ্রেণীতে ৪, শিল্প শ্রেণীতে ১ হাজার ১২৭, কেপটিভ পাওয়ার শ্রেণীতে ১৯০, বাণিজ্যিক শ্রেণীতে ২ হাজার ৮৬২, চা-বাগান শ্রেণীতে ২ ও সিএনজি শ্রেণীতে ৭০টি সংযোগ দিয়েছে কেজিডিসিএল।

এসব গ্রাহকের কাছ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত কেজিডিসিএলের বকেয়া পাওনার পরিমাণ ছিল ৭৯৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বকেয়া পরে আছে ১৫৫ কোটি ৭৯ লাখ, সরকারি ক্যাপটিভ পাওয়ারগুলোর কাছে ৪৮ কোটি ৫৯ লাখ, সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ১৩৫ কোটি ২১ লাখ, সরকারি সিএনজি ২৫ কোটি ৬৯ লাখ এবং সরকারি গৃহস্থালিতে ৩১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গ্যাস বিক্রয়জনিত বকেয়া পাওনা আছে ২৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাওনা ছিল ৫২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই টাকা আদায়ে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এপ্রিলের পর থেকে বকেয়ার পরিমাণ আরও অনেক বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু এপ্রিলের পর থেকে পাওনা টাকার হিসাব কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে তথ্য নিতে ২২ ডিসেম্বর কেজিডিসিএলের জনসংযোগ বিভাগে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার কোম্পানী সচিবের। এরপর কেজিডিসিএলের কোম্পানী সচিব নুরুল আবচার সিকদারের কার্যালয়ে গেলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব তথ্য আমার কাছে থাকে না, হিসাব বিভাগে থাকে।’ যদিও কোম্পানী সচিব নুরুল আবচার সিকদারকে কেজিডিসিএল’র পক্ষ থেকে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে; বিষয়টি গত ৭ সেপ্টেম্বর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ফিরোজ খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) জানানোও হয়েছিল।

এরপর বকেয়া টাকার তথ্য চাইতে হিসাব বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক এ কে এম সালেহ উদ্দিনের কার্যালয়ে গেলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব বিষয় রাজস্ব ও আইটি শাখায় থাকবে।’ এ তথ্য জানার পর কেজিডিসিএলের জোন-২ এর ব্যবস্থাপক (রাজস্ব) মো. শাহ জামানের অফিসে গেলে তিনি জানান, ‘তার কাছে বকেয়া সংক্রান্ত তথ্য নেই।’

অন্যদিকে একইদিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রভঞ্জন বিশ্বাস ব্যস্ত আছেন জানিয়ে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা দেখা করার সুযোগ দেননি। সেদিন কেজিডিসিএল ভবনের প্রথম থেকে ৮ম তলা পর্যন্ত ছুটোছুটি করলেও দায়িত্বশীল কেউ বক্তব্য দেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে কেজিডিসিএলের একজন কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত ৮শ’ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আছে। বকেয়া থাকা গ্রাহকদের অনেকেই প্রভাবশালী। তারা ক্ষুব্ধ হবেন ভেবে তাদের নাম প্রকাশ করতে চান না কর্মকর্তারা।

এদিকে ১১ কোটি টাকা পাওয়ার পরও না দেওয়া এবং বিল গোপন-নথি গায়েবের ঘটনার পরও আবুল খায়ের গ্রুপের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি কেজিডিসিএল। অথচ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৬ লাখ টাকা বকেয়া থাকায় করোনা চিকিৎসায় অগ্রভাগে থাকা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তখন হাসপাতালে ভর্তি থাকা দুই শতাধিক রোগীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি কেজিডিসিএলকে বিভাগীয় হিসাব অফিসের ইস্যু করা ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখের একটি অগ্রিম চেক পাঠায় জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কেজিডিসিএল অগ্রিম চেক গ্রহণের নিয়ম নেই জানিয়ে পুনরায় গ্যাস সংযোগ দেয়নি। পরে বকেয়া পরিশোধ হওয়ার একদিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্যাস পায় সরকারি হাসপাতালটি।

জালিয়াতি করে সাবেক মন্ত্রীর ছেলের নামে ২২ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ

নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন সানোয়ারা আবাসিক এলাকায় জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমানের নামে ২২টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া এবং স্থানান্তরের অভিযোগে অভিযোগ উঠেছে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সরকারি নির্দেশনায় আবাসিক খাতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এক গ্রাহকের নামে বরাদ্দ সংযোগ অন্য গ্রাহককে দেওয়ার বিধান নেই।

এরপরও নগরের হালিশহরের বসিন্দা এমএ সালামের নামে বরাদ্দ হওয়া ১৮টি দ্বৈত চুলার সংযোগ থেকে ১২টি চুলা সানোয়ারা আবাসিক এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে মুজিবুর রহমানের নামে। এছাড়া সানোয়ারা আবাসিক এলাকায় মুজিবুর রহমানের নামে আরও ১০টি সংযোগ দেওয়া হয়। কেজিডিসিএলের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

২০১৬ সালের ২ মার্চ থেকে ২০১৭ সালের ২ অগাস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও সার্ভিসেস) মো. সরোয়ার হোসেনসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও সার্ভিসেস) মো. সরোয়ার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মুজিব সাহেবের নামে কোন সংযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। ফাইল দেখে জানাতে পারব।’ সাবেক মন্ত্রীপুত্র মুজিবুর রহমানের নামে সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অফিসিয়াল কাগজপত্রে আপনার স্বাক্ষর আছে জানালে তিনি বলেন, ‘সারাদিন তো অনেক ফাইলে আমাকে স্বাক্ষর করতে হয়। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একইদিন নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমানকে ফোন করা হলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়ার বিষয়টি জানাতেই তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে কল কেটে দেন; পরবর্তীতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার অভিযোগটি খতিয়ে দেখে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

নিয়োগ কেলেঙ্কারি

৯ বছর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ২০ জন কর্মকর্তার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২০১১ সালে ৩৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কেজিডিসিএলে। নিয়োগকৃতদের মধ্যে মাত্র ছয়জন লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন। অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৩২ কর্মকর্তার মধ্যে অনেকের আবেদনের যোগ্যতাও ছিল না বলে অভিযোগ আছে। কেউ আবার জাল সনদ দিয়েও চাকরি নিয়েছেন।

এসব অভিযোগ তদন্তে নেমে নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার খাতা-নম্বরশিট খুঁজে পায়নি দুদক। এমনকি নিয়োগ কমিটিতে কারা ছিলেন সেই তালিকাও দুদক পায়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা পেট্রোবাংলাও এ ব্যাপারে দুদককে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর কাছে লিখিত পরীক্ষার বিস্তারিত রিপোর্ট দুদক চাইলেও তারাও তা দিতে পারেনি। জাল-জালিয়াতি ধামাচাপা দিতেই পরিকল্পিতভাবে এসব নথিপত্র গায়েব করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ আছে, ২০১১ সালে নিয়োগ পাওয়াদের একজন মহিউদ্দীন চৌধুরী। নিয়োগের সময় ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অনার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। অথচ অনার্স পাস বলে সনদ জমা দিয়েছিলেন মহিউদ্দীন চৌধুরী। ২০১৬ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তার বাবা আইয়ুব খান চৌধুরী তখন কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। এছাড়া ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি; আইয়ুব খান চৌধুরী এখন কেজিডিসিএলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক। আইয়ুব খানের আরেক ছেলে আশেক উল্লাহ চৌধুরী ২০১৬ সালে উপ-ব্যবস্থাপক পদে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে দুদক তথ্য পেয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক আইয়ুব খান চৌধুরীর ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তখন সবুজ নামের একজন ফোন ধরে এ প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে নেন এবং অপেক্ষায় থাকতে বলেন। কিছুক্ষণ পর সবুজ বলেন, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন। এখন কথা বলতে পারবেন না।’

এদিকে অনিয়মের মাধ্যমে ৩২ কর্মকর্তাকে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শেষে ২০১৯ সালের শেষে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়। এ বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি কী, জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রামের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

পদোন্নতিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি

২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি কেজিডিসিএলে কর্মরত প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদানের লক্ষ্যে ও যোগ্যতা মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দুদকের ছাড়পত্র গ্রহণের জন্য অনুমতি চেয়ে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক প্রশাসন বরাবরে চিঠি দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমেদ মজুমদার। ওই চিঠিতে ২০১১ সালের নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৮ জনসহ মোট ১২৮ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার একটি তালিকা চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। চিঠির পাওয়ার পরও দুদকের কাছে কোনো তথ্য চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি পেট্রোবাংলা।

এরপর গত ২০ আগস্ট মধ্যরাতে ২০১১ সালের নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৮ জনসহ ৫৭ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে পরিপত্র জারি করেন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) প্রকৌশলী সারোয়ার হোসেন। এক্ষেত্রে পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধির তোয়াক্কা করা হয়নি, নেওয়া হয়নি প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদারের কাছ থেকে অনুমতি। পদোন্নতি পাওয়া অনেকের নিয়োগের নথিও নেই বর্তমানে।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিতে অসম্মতি জানানোয় বেশ কয়েকবার নিজ দফতরে লাঞ্ছিত হয়েছেন প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার। মূলত কেজিডিসিএলের শীর্ষ তিন কর্মকর্তা জোর ও প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন। পদোন্নতির নেপথ্যে পেট্রোবাংলা পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক আইয়ুব খান চৌধুরী, কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফিরোজ খান এবং কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন দক্ষিণ) প্রকৌশলী আমিনুর রহমান ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে যে ৫৭ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তাদের পূর্ণাঙ্গ নথি চেয়ে গত ২৯ অক্টোবর চিঠি দেয় দুদক। এছাড়া পদোন্নতির সময় মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সারোয়ার হোসেন, ব্যবস্থাপক সুলতান আহমেদকে গত ২৪ নভেম্বর ৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদক কর্মকর্তারা। পরদিন ২৫ নভেম্বর কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ডিভিশন) মো. ফিরোজ খান ও উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. লুৎফুল করিম চৌধুরীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে অনার্স পাস না করে কেজিডিসিএলের সাবেক কর্মকর্তা আইয়ুব খানের ছেলে মহিউদ্দিন চৌধুরী জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি ২০১৭ সালে উপ-ব্যবস্থাপক হন। ২০২০ সালের ২০ আগস্ট ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতিও পান তিনি। অথচ কেজিডিসিএলে মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ওই ব্যাচের পদোন্নতি পাওয়া অনেকেরই কোনো নথিপত্র ছিল না। আইয়ুব খানের আরেক ছেলে আশেক উল্লাহ চৌধুরী ২০১৬ সালে উপ-ব্যবস্থাপক পদে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনিও গত ২০ আগস্ট ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এ বিষয়ক নথিপত্রগুলো দুদক সংগ্রহ করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পদোন্নতির সময় মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সারোয়ার হোসেনের কার্যালয়ে গত ২২ ডিসেম্বর যান এ প্রতিবেদক। কিন্তু তিনি সাক্ষাত দেননি। নিজের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকৌশলী মো. সারোয়ার হোসেন জানিয়ে দেন, ‘গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই।’

এক কর্মকর্তার অ্যাকাউন্টে ‘টাকার পাহাড়’

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) লুৎফুল করিম চৌধুরী ও তার স্ত্রী ফারহানা রশিদের নামে ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লুৎফুল করিমের বিরুদ্ধে ২০১৮ সাল থেকেই অনুসন্ধান করে আসছে দুদক। ইতিমধ্যে বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও এবি ব্যাংকে লুৎফুল করিম দম্পতির অ্যাকাউন্টে এক কোটি তিন লাখ ২৭ হাজার টাকার সন্ধান পেয়েছে দুদক।

১৯৮৫ সালে লুৎফুল করিম চৌধুরী বিক্রয় সহকারী পদে কেজিডিসিএলে যোগ দেন। এই পদের বেতন গ্রেড ১২তম। বেতন স্কেল-৯ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা। উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পান ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে ২০১৮ সালের ১০ জুন থেকে তিনি দায়িত্বে আছেন। এ পদের বেতন স্কেল ৫০ হাজার ৭১ হাজার ২০০ টাকা।

এমন অবস্থায় লুৎফুল করিম ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এত টাকা দেখে অবাক সংশ্লিষ্টরা। দুদক সূত্রে জানা গেছে, কৃষি ব্যাংকের ষোলশহর শাখায় ৫ বছর মেয়াদি ২৭ লাখ টাকার এফডিআর আছে লুৎফুল করিম চৌধুরীর। এটি ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর খোলা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তার হিসাব নম্বরে (২৯৩১০৩১০০৬০৫০১) ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৪ টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষি ব্যাংকে ৪০ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৪ টাকা আছে।

এ ছাড়া বেসিক ব্যাংকের ষোলশহর শাখায় লুৎফুল করিম চৌধুরীর নামে তিন বছর মেয়াদি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। এ ছাড়া হিসাব নম্বরে (২৪১৪০১০০১২৩৯৯) ৩ লাখ ৩ হাজার ৩৯৪ টাকাসহ মোট ২৩ লাখ ৩ হাজার ৩৯৪ টাকা রয়েছে লুৎফুল করিম চৌধুরীর।

নগরের জিইসির ও আর নিজাম রোড শাখায় স্ত্রী ফারহানা রশিদের নামে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র আছে ৪০ লাখ টাকার; ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট হিসাবটি (এফএসপি রেজি: ১২১/৮) খোলা হয়। যদিও ফারহানার আয়ের বৈধ কোনো উৎস নেই।

২০২০ সালের ৩০ জুন লুৎফুল করিম চৌধুরী তার আয়কর নথিতে নগদ ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৮৮ টাকা দেখান। তার নামে নগরীর কল্পলোক আবাসিক এলাকায় অকৃষির ৪ কাঠার একটি প্লটও (নম্বর-এ/৭৫) রয়েছে। ২০০৬ সালে চার কাঠার প্লটটি বরাদ্দ পান তিনি। তখন কাঠাপ্রতি এর মূল্য ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে চার কাঠার দাম ১৫ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) লুৎফুল করিম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার কাছে যেসব টাকা আছে সব বৈধ উপায়ে আয় করেছি। কোন অবৈধ টাকা আমার কাছে নেই।’ ব্যাংকে থাকা টাকার সঙ্গে আয়কর নথির মিল না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র দেখে এ বিষয়ে বলতে পারব।’

কেজিডিসিএলে দুর্নীতির যত উৎস

ঘুষ বাণিজ্য, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের কারণে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কেজিডিসিএল। সেবাধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ অনেক পুরনো।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, কেজিডিসিএলে ভয়াবহ দুর্নীতি হয় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়ার মাধ্যমে। অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো হয়। বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্পশ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়া হয়।

সংস্থার অসাধু কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে মিটার টেম্পারিং করে গ্রাহকের প্রকৃত বিল গোপন করে সরকারকে ঠকিয়ে নিজেরা লাভবান হন। এ ছাড়া গ্রাহকদের প্রকৃত বিল গোপন করা, সংযোগ নীতিমালা অনুসরণ না করার মতো বিষয়গুলো তো আছেই।

এমন অবস্থায় প্রিপেইড মিটার টেম্পারিং রোধে ডিস্টিবিউশন এবং গ্রাহক উভয় ক্ষেত্রে প্রি পেইড মিটার চালু করা উচিত বলে মন্তব্য করেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন। তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী গ্যাসে দুর্নীতি প্রতিরোধে মোবাইল কোর্টের আদলে আকস্মিক পরিদর্শন করতে হবে।’

কেজিডিসিএলে দৃশ্যমান দুদকের তৎপরতা, অদৃশ্য শাস্তি

২০১১ সালে ৩৮ জনকে নিয়োগ ও সর্বশেষ ৫৭ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়ে অনিয়মের ঘটনায় দুদককে বেশ তৎপর দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথি তলব করতেও দেখা গেছে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে। অনুসন্ধানে যথারীতি অভিযোগগুলোর সত্যতাও পায় দুদক। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে অভিযুক্তরা এখনো আইনের আওতায় আসেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া ২০১৭ সালে ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের জিইসি এলাকার ইউনেসকো সেন্টারের পাশে ২৭ কাঠা জমি কিনেছিল কেজিডিসিএল। অথচ ওই সময়ে জমিটির মৌজা দর হিসেবে দাম পড়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা। ওই সময় কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন বর্তমানে পেট্রোবাংলার পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক আইয়ুব খান চৌধুরী। জমিটি কেনার ক্ষেত্রে এমডির বিরুদ্ধে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে। তার এমন কর্মকাণ্ডে পাশে না থাকায় কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) মো. আবু জাফর এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক আবদুল হক মজুমদারকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করতে আইয়ুব খান চৌধুরী বাধ্য করেন বলে অভিযোগ আছে। অভিযোগের বিষয়ে আইয়ুব খান চৌধুরী বলেন, ‘অভিযোগটি মিথ্যা, বানোয়াট। জমিটি এখন ৩০০ কোটি টাকা দিয়েও পাওয়া যাবে না।’

এদিকে জমি কেনায় টাকা লোপাটের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শেষ করেছে দুদক। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে মামলার জন্য এটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

কেজিডিসিএলে নিয়োগ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ তদন্ত করছেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অনুসন্ধানের স্বার্থে এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব না। তবে একটুকু বলতে পারি, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে যেসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে তা ঊর্ধ্বতন স্যারদের জানিয়েছি। কিছুদিনের মধ্যে আশা করি রেজাল্ট দেখতে পাবেন।’

এদিকে কেজিডিএলের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক আনিস উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। তদন্তে নেমে কামরুন নাহারের নামে ঢাকার বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট, উত্তরায় পাঁচ কাঠার প্লট, সঞ্চয়পত্রসহ ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৪ টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছেন দুদকের তদন্তকারীরা। এ বিষয়ে দুদক প্রধান কার্যালয়ের একজন সহকারী পরিচালক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আনিস ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুইটি মামলা দায়ের হতে পারে।’

অন্যদিকে সদ্য অবসরে যাওয়া কেজিডিসিএলের উপব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও বিক্রয় সহকারী মাকসুদুর রহমান হাসনুর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে। ২০১৯ সালে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। কিন্তু গত বছর তাদেরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুদক সচিব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অর্ধকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১১ সালে জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও তার স্ত্রী সানজিদা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই মামলাটি আমি তদন্ত করে ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জসিমের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল, সেগুলোর সত্যতা না পাওয়ার কারণে ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ওই অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

একই বিষয়ে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দুদক কাউকেই ছাড় দেয় না। অনুসন্ধানে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া গেলেই কেবল অব্যাহতি দেওয়া হয়।’

সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী গ্যাসে ভয়াবহ দুর্নীতি চলছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস চুরি এবং জায়গা কেনায় দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের পাহাড় জমেছে সেখানে। এ অবস্থায় দুদকের দায়িত্ব হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের ধরে আইনের আওতায় আনা। দুদক ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধ।’

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্নীতি সমাজের সব ভালো অর্জন ধ্বংস করে দেয়। এ কারণে কর্ণফুলী গ্যাসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ্ধতিগত দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে আমরা ব্যবস্থা নিই, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাই। কিন্তু অনেক সময় এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না। যদিও সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। এতটুকু বলবো, ঘুষ, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা দুদকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’